বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 5:04 am
January 16, 2026 5:04 am

জামায়াতের ‘পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা’ প্রস্তাব: নারীকে ঘরে ফেরানোর নতুন ফতোয়া?

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

গত কয়েক দিনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান প্রকাশ্যে বলেছেন যে তারা ক্ষমতায় এলে মহিলা কর্মীদের অফিস-আদালতে কাজের সময় আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করবে; তাঁর এই বক্তব্য দ্রুত সামাজিক ও গণমাধ্যমে বিতর্ক খাড়া করেছে। এই বক্তব্য এবং এর প্রতিক্রিয়া আমাদের রাজনীতিতে, নারীর অধিকার সংরক্ষণে এবং সমাজব্যবস্থার লুকিয়ে থাকা পুরুষতান্ত্রিক উদ্দেশ্যগুলোকে বুঝতে সাহায্য করে।

“একটি পশ্চাৎপদ সমাজ তৈরির রূপরেখা, যেখানে নারী কেবল সংসারের দায়িত্ব পালন করবে, আর পুরুষ রাষ্ট্র ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।“

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মধ্যরাতে তাঁদের সাহস, স্লোগান আর দৃঢ় উপস্থিতিতে রাজপথ কেঁপে উঠেছিল। সেই সময়ের নারী ছিল পরিবর্তনের প্রতীক, মুক্তির প্রতিজ্ঞা। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেই নারীই আজ নানা প্রতিকূলতার মুখে—সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে।

গত এক বছরে নারীদের খেলাধুলা, পোশাক, চলাফেরা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত বারবার টার্গেট করা হয়েছে। নারীর শরীর, পোশাক বা মত—সবকিছুই যেন সমাজের একাংশের কটাক্ষের কেন্দ্রবিন্দু। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নারীর মূল্যায়ন বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়নি। আর রাজনীতির অঙ্গনেও নারীরা যেন ক্রমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনাগুলো থেকে শুরু করে ‘জুলাই সনদ’—সবখানেই নারী ছিলেন অনুপস্থিত। অথচ দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী; তাঁদের প্রতিনিধি না থাকা মানে রাষ্ট্রের অর্ধেক কণ্ঠকে নীরব করে দেওয়া।

পাঁচ ঘণ্টার কর্মঘণ্টা: সহানুভূতির আড়ালে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি

এই প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে—তাঁরা ক্ষমতায় গেলে নারীদের অফিসের সময় আট ঘণ্টা থেকে কমিয়ে পাঁচ ঘণ্টা করবেন, যাতে তাঁরা বাসায় ফিরে “সন্তানের হক আদায়”করতে পারেন।

শব্দগুলো শুনতে যতই মায়াময় লাগুক, এর অন্তরালে আছে নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করার এক রাজনৈতিক কৌশল। এটি আসলে ঘরে ফেরানোর পুরোনো দর্শনের নতুন সংস্করণ—যেখানে নারীকে আবার গৃহপরিসরে আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বক্তার যুক্তি অনুসারে, সন্তান লালনপালনের দায়িত্ব নারীরই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—পিতা কি সেই দায়িত্ব থেকে মুক্ত? যদি সন্তানের হক আদায় করাই মূল লক্ষ্য হয়, তবে পিতার জন্য কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব কেন দেওয়া হয়নি? এই একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি নারীর প্রতি তথাকথিত সহানুভূতির আবরণে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তারই প্রতিফলন।

নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা

এই দেশের নারীরা আজও কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ নন। অফিস, কারখানা, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাঁদের নিরাপত্তা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। গণপরিবহনে, রাস্তায় বা কর্মস্থলে নারীদের হয়রানি ও সহিংসতার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। পোশাক, মত বা অবস্থানের ভিত্তিতে তাঁদের টার্গেট করা হচ্ছে। এই বাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক নেতা যদি নারীর কাজের সময় কমানোর কথা বলেন, তবে সেটি সমস্যার সমাধান নয়; বরং বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।

“রাষ্ট্রের দায়িত্ব নারীর স্বাধীনতা সীমিত করা নয়, বরং তাঁর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।“

রাজনীতির প্রকৃত উদ্দেশ্য

জামায়াতের এই প্রস্তাবকে কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল—নারীকে জনজীবন ও রাজনীতির মূলধারা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা। নারী কর্মী, নেতা বা ভোটার—যত কম দৃশ্যমান হবেন, পুরুষকেন্দ্রিক রাজনীতির ক্ষমতা ততই অক্ষুণ্ণ থাকবে।

এই প্রক্রিয়ায় নারীকে ধীরে ধীরে অদৃশ্য করে ফেলা হচ্ছে, যা কেবল নারী অধিকার নয়, গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক। যেখানে রাষ্ট্র গঠনের প্রতিটি ধাপে নারীর কণ্ঠ অপরিহার্য, সেখানে তাঁদের অংশগ্রহণ সীমিত করা মানে গণতান্ত্রিক ন্যায্যতা ক্ষুণ্ণ করা। নারীকে জনজীবন থেকে সরিয়ে দিয়ে কোনো রাষ্ট্রই টেকসই উন্নয়ন বা ন্যায়বিচারের পথে এগোতে পারে না।

ইতিহাসের শিক্ষা

আমাদের ইতিহাসে নারীর মুক্তি কোনো দান নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল। বেগম রোকেয়া অন্ধকার যুগে মেয়েদের শিক্ষা ও আত্মমর্যাদার আলো জ্বালিয়েছিলেন। সুফিয়া কামাল নারীর সামাজিক স্বীকৃতির জন্য কলম ও কণ্ঠে লড়েছেন। আজ সেই সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে ভেঙে নারীর কর্মঘণ্টা সীমিত করার কথা বলা মানে অর্জনের পেছনে যাওয়া।

“রোকেয়া নারীদের ঘরের দেয়াল ভেঙে বাইরে এনেছিলেন; আর জামায়াত সেই দেয়াল আবার তোলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।“

অর্থনীতি ও বাস্তবতা

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীরা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন, তা রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখে। এই নারীদের কর্মঘণ্টা কমানো মানে তাঁদের আয়ের পথ সংকুচিত করা, কর্মজীবনের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা এবং অর্থনীতিকে দুর্বল করা। যদি ইনসাফের নামে এই বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়া হয়, তবে সেটি ইসলামি ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

জামায়াতের প্রতি প্রশ্ন

জামায়াত যদি সত্যিই ইসলামী ন্যায়বিচারের কথা বলে, তবে কেন তারা নারীর বেতন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে কোনো অবস্থান নেয় না? তাঁদের দলের কাঠামোতে কেন নারীর নেতৃত্ব নেই? যদি তাঁদের লক্ষ্য হয় নারীকে সম্মান দেওয়া, তবে সেই সম্মান দিতে হবে সুযোগ, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার দিয়ে—নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতা দিয়ে নয়। নারীর মর্যাদা মানে তাঁকে ঘরে পাঠানো নয়; বরং রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

প্রকৃত সমাধান

নারীর কর্মঘণ্টা কমিয়ে নয়, তাঁর কর্মপরিবেশ উন্নত করেই ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

প্রকৃত সমাধান হবে—

  1. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা ও জরুরি সহায়তা সেবা চালু করা।
  2. সমান বেতন ও সুযোগ: নারী-পুরুষ সমান কাজের জন্য সমান পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগে কঠোরতা।
  3. পরিবারে ভারসাম্য: পিতৃত্বকালীন ছুটি ও ডে-কেয়ার সুবিধা বাধ্যতামূলক করা, যাতে দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়।
  4. রাজনীতিতে নারীর কণ্ঠ: দলীয় ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা।

“এই পদক্ষেপগুলোই প্রকৃত ইসলামী ন্যায়ের প্রতিফলন—যেখানে নারীকে বন্দি নয়, সহযোগী হিসেবে দেখা হয়।“

উপসংহার

বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অধিকার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সেই সমতা কেবল কাগজে নয়, জীবনের বাস্তবতায় প্রতিফলিত হতে হবে। জামায়াতের প্রস্তাব সেই পথের বিপরীতে—এটি নারীকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার এক রাজনৈতিক প্রচেষ্টা।

নারীর “পাঁচ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা” নয়, দরকার আট ঘণ্টা সমান মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের সুযোগ। নারী দুর্বল নন; তিনি রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির নির্মাতা। যদি জামায়াত সত্যিই ন্যায়বিচারের রাজনীতি চায়, তবে তাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নারীকে ঘরে ফেরানো নয়, বরং রাষ্ট্রের কেন্দ্রস্থলে তাঁর জায়গা নিশ্চিত করা।

“এই ইনসাফই ইসলামের প্রকৃত অর্থ—ন্যায়, সমতা ও মর্যাদা।“

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *