শীতের সময়ে পড়ছে রমজান ২০২৬। ফলে অনেক অঞ্চলে রোজার সময় তুলনামূলক কম হওয়ায় শারীরিক দিক থেকে রোজা রাখা কিছুটা সহজ হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে চিকিৎসকদের মতে, একটি বড় সমস্যা প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হলো ঘুমের অনিয়ম ও ঘাটতি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোহাম্মদ বিন জায়েদ সিটির এনএমসি রয়্যাল ফ্যামিলি মেডিকেল সেন্টারের ফ্যামিলি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাহেজাবিন মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ বলেন, রমজান মাসে অনেক রোগী ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মনমরা ভাব এবং মনোযোগ কমে যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে আসেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর মূল কারণ রোজা নয়, বরং অনিয়মিত ঘুম।
তার মতে, কিছু বাস্তবসম্মত অভ্যাস গড়ে তুললে পুরো মাসজুড়ে শক্তি ধরে রাখা এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব।
ধীরে ধীরে ঘুমের সময় বদলানোর পরামর্শ
রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ করে ঘুমের সময়সূচি বদলে ফেলতে নিষেধ করেছেন চিকিৎসকরা। ডা. মাহেজাবিন বলেন, মানুষের শরীর একটি স্বাভাবিক জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম অনুযায়ী চলে। হঠাৎ ঘুমের সময় বদলে গেলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও মেজাজের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, রমজান শুরুর কয়েক দিন আগে থেকেই প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট করে ঘুম ও জাগরণের সময় এগিয়ে আনা উচিত। এতে শরীর স্বাভাবিকভাবেই সেহরির সময় জেগে ওঠার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।
একটানা অন্তত ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা একই সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। দিনের বেলা প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত ঘুম বা ছোট বিরতি নেওয়া যেতে পারে, তবে রাতের এই মূল ঘুম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য, বিপাকক্রিয়া ও শারীরিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
আলো, খাবার ও স্ক্রিন ব্যবহারের প্রভাব
ঘুমের মান ভালো রাখতে আলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সকালে উজ্জ্বল আলো শরীরকে সজাগ করে, আর রাতে কম আলো মেলাটোনিন নিঃসরণে সহায়তা করে, যা ঘুম আনতে সাহায্য করে।
ভারী খাবার, গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত উত্তেজনামূলক কাজ কমিয়ে দিলে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ঘুম ভেঙে ভেঙে হলেও একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মোট ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
ঘুমের অভাবে শরীর ও মনের ক্ষতি
আবুধাবির বুরজিল মেডিকেল সিটির পালমোনোলজি ও স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. হুমাম শাকাকি বলেন, রমজানে অনেকেই খাবারের দিকে বেশি গুরুত্ব দেন, কিন্তু ঘুমকে অবহেলা করেন।
তার ভাষায়, ভালো খাবার খেলেও পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ক্লান্তি কাটে না। অনিয়মিত ঘুম শরীরের জৈবঘড়িকে বিভ্রান্ত করে, ফলে শক্তি, মেজাজ ও ক্ষুধার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ঘুমের ঘাটতি থাকলে মনোযোগ কমে যায়, ধৈর্য কমে, বিরক্তি বাড়ে এবং মানসিক অবসাদও দেখা দিতে পারে। শারীরিকভাবে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কার্যকর ঘুমের রুটিন
চিকিৎসকদের মতে, একটি কার্যকর রমজান রুটিন হতে পারে—তারাবির পর মূল ঘুম, সেহরির জন্য জাগা, প্রয়োজনে আবার কিছুক্ষণ ঘুম এবং দিনের বেলায় স্বল্প সময়ের ঘুম।
ডা. মাহেজাবিন বলেন, সঠিকভাবে নেওয়া হলে দিনের ছোট ঘুম মনোযোগ, মেজাজ ও শক্তি বাড়াতে সহায়তা করে। বিশেষ করে বিকেলের দিকে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ‘পাওয়ার ন্যাপ’ উপকারী। তবে সন্ধ্যার দিকে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে।
আগে থেকেই প্রস্তুতি নিন
ডা. শাকাকি পরামর্শ দেন, রমজানের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই ঘুমের সময়সূচিতে ছোট ছোট পরিবর্তন আনা উচিত। এতে শরীর সহজে মানিয়ে নিতে পারে।
তার মতে, ঘুমের বিষয়ে সচেতন হলে রোজা রাখা সহজ মনে হয়, শক্তি স্থিতিশীল থাকে এবং মানুষ আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দিকগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
ঘুমের ক্ষেত্রে যেসব ভুল এড়ানো জরুরি
চিকিৎসকদের মতে, রমজানে কিছু সাধারণ অভ্যাস ঘুমের বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়—
১. গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া বা মোবাইল স্ক্রল করা
২. ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার, যা নীল আলোয়ের কারণে ঘুমের হরমোন কমিয়ে দেয়
৩. গভীর রাতে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা ঝাল খাবার খাওয়া
৪. ঘুমের কাছাকাছি সময়ে ক্যাফেইন, নিকোটিন বা এনার্জি ড্রিংক গ্রহণ
এ ছাড়া ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।









