২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে সহিংসতার ঘটনা সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। অভিযোগ উঠেছে যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)–সমর্থিত গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি–এর বহু নেতা ও কর্মী। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা কেবল একটি দলের ওপর আঘাত নয়; এটি আইনের শাসন ও সাংবিধানিক অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত।
রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বনাম রাজনৈতিক প্রতিশোধ
নির্বাচন একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া। সেখানে জয়-পরাজয় থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ভাঙচুর, আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী। জামায়াতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তাদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আহতদের চিকিৎসা নিতে হয়েছে এবং অনেকে নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে। যদি এই অভিযোগগুলো সত্য হয়, তবে তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার প্রমাণ নয়—বরং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা: অভিযোগ ও আতঙ্ক
বিভিন্ন জেলায় জামায়াতের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে—নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর তাদের স্থানীয় কার্যালয় ভাঙচুর, নেতা-কর্মীদের বাড়িতে হামলা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। আহতদের অনেকেই চিকিৎসাধীন। স্থানীয় জামায়াত নেতারা বলছেন, “নির্বাচনে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা গণতন্ত্রের ভাষা নয়।” তাদের দাবি, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ হলেও সহিংসতা অব্যাহত থাকা প্রমাণ করে যে এটি পরিকল্পিত ভয় প্রদর্শনের অংশ।
অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ে কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা বা অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস থেকে এমন সহিংসতা ঘটতে পারে—যা দলীয় অবস্থানের সঙ্গে সবসময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কেন জামায়াত টার্গেট?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নির্বাচনে বিভিন্ন আসনে প্রার্থী সমন্বয় ও ভোট কৌশল নিয়ে বিরোধের জের থাকতে পারে। নির্বাচনের সময়কার সহযোগিতা যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না দেয়, তাহলে তা পরবর্তীতে মাঠপর্যায়ে উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা অনেক সময় সহিংস রূপ নেয়। এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সংগঠিত ও আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে জামায়াতের কর্মীরা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
সংবিধান ও নাগরিক অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে রাজনৈতিক দল গঠন, মত প্রকাশ এবং শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়ার অধিকার প্রদান করেছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হামলার শিকার হলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তা প্রতিরোধ করা এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং যুক্তি ও নীতির মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয়। সহিংসতা কখনো রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ নয়; বরং তা দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
মানবাধিকার দৃষ্টিকোণ
মানবাধিকার আইনের দৃষ্টিতে রাজনৈতিক সহিংসতা একটি গুরুতর অপরাধ। এটি নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ। যদি কোনো দল বা তার সমর্থকেরা নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে অন্য দলের কর্মীদের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে তা আইনের চোখে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও দ্রুত পদক্ষেপ এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকট
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনো কখনো সংঘাতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু সময় এসেছে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার। গণতন্ত্র কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জয় নয়; বরং সংখ্যালঘু মতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গণতন্ত্রের মূল শর্ত। যে সমাজে বিরোধী মতের নিরাপত্তা নেই, সেখানে প্রকৃত গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না।
প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রত্যাশা
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন—আইনি প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ ও কার্যকর হবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচারিক পদক্ষেপ না হলে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠতে পারে।
করণীয়
১. হামলার ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত।
২. জড়িতদের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার।
৩. রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান।
৪. মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন প্রকাশ।
উপসংহার
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। আজ যদি একটি দল আক্রান্ত হয়, কাল অন্য দলও একই পরিস্থিতির শিকার হতে পারে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আমরা কতটা আইনের শাসন, সহনশীলতা ও মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকতে পারি তার ওপর। সহিংসতার পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের পথই আমাদের বেছে নিতে হবে।
লিখেছেন-
মোঃ আব্দুল কাইয়ুম মজুমদার
ব্যারিস্টার ও মানবাধিকার কর্মী










