প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেছেন, “বিচার বিভাগ কেবল ঐতিহ্যের স্বস্তিতে টিকে থাকতে পারে না; সময়ের সঙ্গে তাকে প্রাসঙ্গিক হতে হয়। আর প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে বিচার বিভাগকে নিয়মিত সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।”
শনিবার (৮ নভেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ৭৫ বছরপূর্তি ও পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে।
“ঐতিহ্য নয়, সময়ের দাবি সংস্কার”
প্রধান বিচারপতি বলেন, “বিচার বিভাগ ঐতিহ্যের স্মৃতি নিয়ে চললেও তাকে সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। গত ১৫ মাসে আমরা বিচারব্যবস্থার স্বায়ত্তশাসন, দক্ষতা বৃদ্ধি ও জনগণের বিচারপ্রাপ্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছি, যা এখনো চলমান।”
তিনি আরও বলেন, “এই সংস্কারের মূল লক্ষ্য প্রশাসনিক নয়, বরং নৈতিক—যাতে প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাকে নয়, মানুষকে সেবা দেয়; কর্তৃত্ব বৈধতার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং বিচার বিভাগ জনগণের আস্থার নৈতিক অভিভাবকে পরিণত হয়।”
মায়ের স্মৃতি ও এক প্রজন্মের শিক্ষা
অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি তার মা জাতীয় অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদের স্মৃতি স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, “আমার মা ছিলেন সেই বিরল প্রজন্মের মানুষ, যাদের বুদ্ধিবৃত্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নৈতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে ছিল। তার জীবন ছিল নারীর একাডেমিক ক্ষমতায়ন ও নৈতিক শুদ্ধতার প্রতীক—যা আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”
জ্ঞান, ইতিহাস ও ন্যায়ের সম্পর্ক
প্রধান বিচারপতি ড. রেফাত আহমেদ বলেন, “ইতিহাসের গভীর বোধ ছাড়া কোনো সংস্কারক প্রজ্ঞাবান হতে পারেন না। আবার কোনো বিচারক তার সভ্যতার শিকড় না বুঝে আইনের যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারেন না। আইন হলো জাতির নৈতিক ইতিহাস, যা ন্যায়ের ভাষায় লেখা হয়—আর ইতিহাস হলো সমাজকে আরও ভালো হওয়ার অনুসন্ধান।”
আলেকজান্দ্রিয়ার পাঠ
নিজের সাম্প্রতিক মিসর সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ছিল সেই সাহসী বিশ্বাসের প্রতীক, যেখানে জ্ঞানের মাধ্যমে ভিন্ন সভ্যতার মানুষ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও একইভাবে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জাতিকে আলোকিত করছে।”
সমাপনী বক্তব্যে বার্তা
অনুষ্ঠানের শেষে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এই হীরক জয়ন্তী শুধু একাডেমিক উদযাপন নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ইতিহাস আমাদের মূল্যায়ন করে অর্জনে নয়, বরং প্রচেষ্টার সততা ও নিষ্ঠার মানদণ্ডে। এই বার্তাই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভবিষ্যতের মূল ভিত্তি।”
অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান এবং সভাপতিত্ব করেন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস।











