মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা আজ আর নিছক নৈতিক অবস্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে এক ধরনের সাহসিকতার পরীক্ষা। যে সমাজে অধিকার চাওয়া মানেই সন্দেহের চোখে পড়া, সেখানে ন্যায়ের ভাষা স্বাভাবিকভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ অধিকার মানে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়—এটি নাগরিকত্বের মৌলিক শর্ত। আমাদের সমস্যাটা এখানে যে, রাষ্ট্র ও সমাজ—দুটোই ধীরে ধীরে অধিকারকে ‘নিয়ন্ত্রণযোগ্য দাবি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলাফল হিসেবে মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে ন্যায্যতা সরে যাচ্ছে, জায়গা নিচ্ছে ভয়, নীরবতা আর আপস।
বাংলাদেশের সংবিধান মানবাধিকারের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার মধ্যকার দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে। কাগজে-কলমে আমরা সমান; বাস্তবে আমরা শ্রেণি, পরিচয়, মত ও ক্ষমতার ভিত্তিতে অসম। এই অসমতাই মানবাধিকার সংকটের মূল। কারণ রাষ্ট্র যখন সবার জন্য সমান আচরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন অধিকার বিশেষ গোষ্ঠীর অনুকূলে ঝুঁকে পড়ে। আর তখনই অধিকার পরিণত হয় বিশেষ সুবিধায়—যা গণতন্ত্রের বিপরীত।
আমরা প্রায়ই বলি, আইন আছে। কিন্তু আইন থাকলেই কি অধিকার রক্ষা হয়? আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগ ন্যায়সঙ্গত ও পক্ষপাতমুক্ত। বাস্তবতা হলো, আইন প্রয়োগের জায়গায় বৈষম্য ও রাজনৈতিক বিবেচনা ঢুকে পড়েছে। এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে আইন হয়ে উঠেছে ভয় দেখানোর হাতিয়ার, আশ্রয়ের জায়গা নয়। মানুষ আদালতে যেতে ভয় পায়, অভিযোগ করতে দ্বিধা করে, কারণ সে জানে—ন্যায় পেতে গেলে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, আর সেই পথে আছে হয়রানি, সময়ক্ষয় ও অনিশ্চয়তা।
মানবাধিকার সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আজ যে ঘটনাটি আমাদের ক্ষুব্ধ করে, কাল সেটাই শিরোনাম থেকে সরে যায়। আমরা ভুলে যাই, নতুন ঘটনায় মন দিই। এই ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতিই অন্যায়ের সবচেয়ে বড় সহযোগী। কারণ রাষ্ট্র ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠী জানে—সময় পেরোলেই ক্ষোভ ঠান্ডা হবে। বিচারহীনতা তাই কেবল অপরাধীদের রক্ষা করে না; এটি সমাজকে ক্লান্ত করে তোলে।
ধর্ম ও মানবাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের সাবধানী হতে হয়—কিন্তু নীরব হতে হয় না। ধর্ম মানুষের বিশ্বাসের জায়গা; রাষ্ট্রের কাজ সেই বিশ্বাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিশ্বাসকে ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা নয়। যখন ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানো হয়, তখন মানবাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা, ভিন্নমতের ওপর চাপ, সামাজিকভাবে ‘গ্রহণযোগ্য’ আচরণের তালিকা—সবই ধর্মের নামে বৈধতা পায়। অথচ প্রকৃত বিশ্বাস কখনোই অন্যের মর্যাদা হরণ শেখায় না।
আমাদের সমাজে নৈতিকতার ধারণা প্রায়ই মানুষের অধিকারকে ছাড়িয়ে যায়। কে কী পরবে, কী বলবে, কাকে ভালোবাসবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সমাজ দিতে চায়। নৈতিক পাহারাদারি যখন সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয়, তখন রাষ্ট্রও অনেক সময় সেই স্রোতে ভাসে। ফলাফল হিসেবে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। মানবাধিকার এখানে ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ ধারণা হিসেবে সমালোচিত হয়, অথচ অধিকার মানেই ব্যক্তির মর্যাদা। ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে কোনো মানবিক সমাজ গড়ে ওঠে না।
যৌন ও লিঙ্গ অধিকারের প্রশ্নে আমাদের সংকট আরও স্পষ্ট। আমরা যৌনতা নিয়ে কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করি, কিন্তু যৌনতার ভিত্তিতে মানুষকে বিচার করতে দ্বিধা করি না। ভিন্ন যৌন অভিমুখ বা লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়, তাদের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ থাকে, সামাজিকভাবে তাদেরকে ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখা হয়। রাষ্ট্র যখন এই জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় স্পষ্ট অবস্থান নেয় না, তখন সমাজের সহিংসতা আরও উৎসাহ পায়। মানবাধিকার এখানে কেবল আইনি প্রশ্ন নয়—এটি বেঁচে থাকার প্রশ্ন।
শ্রমিকের অধিকার নিয়ে কথা বললে আমরা উন্নয়নের গল্প শুনি। কিন্তু উন্নয়ন যদি শ্রমিকের ঘাম আর নিরাপত্তাহীনতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে সেটি টেকসই নয়। ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সংগঠিত হওয়ার অধিকার—এগুলো মানবাধিকারের মৌলিক অংশ। অথচ শ্রমিকের দাবি প্রায়ই ‘উস্কানি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। এই দাগানোর রাজনীতি অধিকারকে অপরাধে রূপান্তর করে।
নারীর অধিকার প্রসঙ্গে আমরা আইন দেখাই, কিন্তু বাস্তবতা দেখলে বোঝা যায়—আইন ও জীবনের ফারাক এখনো বিশাল। ঘরে, রাস্তায়, কর্মক্ষেত্রে—নারী প্রতিদিনই নিরাপত্তার প্রশ্নে আপস করতে বাধ্য হয়। বিচার পেতে দেরি, সামাজিক চাপ, চরিত্রহনন—সব মিলিয়ে নারীর জন্য ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন। মানবাধিকার তখন কেবল নীতিবাক্য হয়ে থাকে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি গণতন্ত্রের শ্বাস-প্রশ্বাস। প্রশ্ন, সমালোচনা ও ভিন্নমত—এই তিনটি না থাকলে সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন ভিন্নমতকে সহ্য করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আইন, সামাজিক চাপ ও অনলাইন নজরদারি—সব মিলিয়ে মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠ রোধ করে রাখে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ এখানে দমন দৃশ্যমান নয়—কিন্তু কার্যকর।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচনায় আমরা প্রায়ই রাষ্ট্রকে এককভাবে দায়ী করি। কিন্তু সমাজের ভূমিকাও কম নয়। আমরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই না, তখন আমরা নীরব সহযোগী হয়ে উঠি। সামাজিক স্বীকৃতি, জনপ্রিয়তা বা নিরাপত্তার বিনিময়ে ন্যায় ত্যাগ করা—এই আপসই অধিকার সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করে। মানবাধিকার কেবল আইনি লড়াই নয়; এটি সামাজিক চর্চা।
বিচারব্যবস্থা মানবাধিকারের শেষ আশ্রয়। কিন্তু সেই আশ্রয় যদি দুর্বল হয়, তবে মানুষ কোথায় যাবে? দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাব, অর্থনৈতিক বৈষম্য—সব মিলিয়ে বিচার প্রাপ্তি কঠিন হয়ে উঠেছে। দ্রুত ও ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এখানে ব্যর্থতা মানে রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতা।
আমাদের রাজনীতি মানবাধিকারকে প্রায়ই কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে—প্রয়োজনে তুলে ধরে, প্রয়োজনে চুপ করে থাকে। এই বাছাই করা নৈতিকতা বিশ্বাসযোগ্য নয়। মানবাধিকার সর্বজনীন—এটি দল, মত বা পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। যখন অধিকারকে রাজনৈতিক সুবিধার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন তার সার্বজনিকতা নষ্ট হয়।
শিক্ষা মানবাধিকারের ভিত্তি। কিন্তু শিক্ষা যদি প্রশ্ন করতে না শেখায়, তবে সেটি কেবল তথ্য জোগাড়ের প্রক্রিয়া। সমালোচনামূলক চিন্তা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা—এই তিনটি ছাড়া মানবাধিকার রক্ষা সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যদি কেবল পরীক্ষায় পাশ করাকে সাফল্য মনে করে, তবে নাগরিকত্বের শিক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়।
ডিজিটাল যুগে মানবাধিকারের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, অনলাইন হয়রানি, নজরদারি—সবই নতুন বাস্তবতা। প্রযুক্তি যদি নাগরিকের স্বাধীনতা বাড়ায়, তবে তা আশীর্বাদ; যদি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়, তবে তা বিপজ্জনক। এখানে ভারসাম্য দরকার—আইন, নীতি ও জবাবদিহি।
মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের কথা বলা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মানে অনুকরণ নয়; মানে ন্যূনতম মানবিকতা। রাষ্ট্র যদি নিজের নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, তবে আন্তর্জাতিক চাপের প্রয়োজন পড়ে না। সম্মান আসে কাজ থেকে, বক্তব্য থেকে নয়।
সবশেষে, মানবাধিকার কোনো একদিনের আন্দোলন নয়। এটি প্রতিদিনের চর্চা। ঘরে, রাস্তায়, অফিসে—যেখানেই আমরা অন্যের মর্যাদা স্বীকার করি, সেখানেই মানবাধিকার বেঁচে থাকে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই চর্চাকে সুরক্ষা দেওয়া, দমন করা নয়।
যে সমাজে অধিকার চাওয়া অপরাধে পরিণত হয়, সে সমাজ টিকে থাকে ভয় দিয়ে। কিন্তু ভয় দীর্ঘস্থায়ী নয়। মানুষ একসময় কথা বলে—কারণ নীরবতারও একটি সীমা আছে। মানবাধিকার সেই সীমার ভাষা। আমরা যদি সত্যিই একটি স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র চাই, তবে অধিকারকে সন্দেহ নয়, আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে। রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে—নাগরিকের স্বাধীনতা তার শক্তি; ভয় নয়।
লিখেছেন- Md Abdur Rahman











