বাংলাদেশে একটি শিশুর জন্ম হওয়ার আগেই তার পরিচয় নির্ধারণ করে দেয় সমাজ। শিশুটি কেমন মানুষ হবে, কী স্বপ্ন দেখবে, কী অর্জন করবে—এসবের আগেই তার কপালে সেঁটে দেওয়া হয় একটি পরিচয়: “বাবা কে?”
যদি সেই প্রশ্নের উত্তর সমাজের প্রচলিত কাঠামোর সঙ্গে না মেলে, তাহলে শাস্তি পায় শুধু মা নয়, শিশুটিও। অথচ শিশুটি তো নিজের জন্মের পরিস্থিতি বেছে নেয়নি।
একজন অবিবাহিত নারী কিংবা স্বামী-পরিত্যক্ত একজন মা—বাংলাদেশের সমাজে তাঁর জীবন যেন এক অন্তহীন বিচারের কাঠগড়া। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ নজরবন্দি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ, প্রতিটি হাসি সন্দেহের চোখে দেখা হয়। সমাজ যেন তাঁর অপরাধ খুঁজে বের করতেই ব্যস্ত।
সমাজের আদালতে নারীর আজীবন বিচার
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো এখনো গভীরভাবে পুরুষতান্ত্রিক। এখানে একজন পুরুষ সংসার ছেড়ে চলে গেলে, দ্বিতীয় বিয়ে করলে কিংবা সন্তানের দায়িত্ব এড়িয়ে গেলেও সমাজ তাকে দ্রুত ক্ষমা করে দেয়। কিন্তু একজন নারী যদি একা সন্তান লালন-পালন করেন, তবে তাঁর চরিত্র, নৈতিকতা, এমনকি মাতৃত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, কর্মক্ষেত্র—সবখানেই তাঁকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়।
“স্বামী কোথায়?”
“বাচ্চার বাবা কে?”
“কী করে এই অবস্থা হলো?”
এই প্রশ্নগুলোর উদ্দেশ্য সত্য জানা নয়; বরং সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
সবচেয়ে বড় শাস্তি পায় শিশুটি
একজন সিঙ্গেল মাদারের সন্তানও সমাজের নির্মমতার শিকার হয়।
স্কুলে ভর্তি হতে গেলে বাবার নাম নিয়ে প্রশ্ন। সহপাঠীদের কৌতূহল। আত্মীয়দের কটূক্তি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপমানের অভিঘাতও বড় হতে থাকে।
শিশুটি এমন এক অপরাধের দায় বহন করে, যার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই।
তার আত্মসম্মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। সমাজ তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে সে নাকি “স্বাভাবিক” পরিবারের সন্তান নয়।
এভাবে আমরা একটি শিশুকে তার জন্মের জন্য শাস্তি দিই—যে জন্মের সিদ্ধান্ত সে কখনোই নেয়নি।
যখন ধর্মের নামে সামাজিক নিপীড়ন বৈধতা পায়
সমস্যা কেবল সামাজিক কুসংস্কারে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় ধর্মীয় ভাষ্য ও ধর্মের নির্বাচিত ব্যাখ্যাও এই বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
কিছু ধর্মীয় বক্তা ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠী একজন সিঙ্গেল মাদারকে শুধুমাত্র একজন মানুষ হিসেবে নয়, বরং “নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক” হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁদের বক্তব্যে সহানুভূতির পরিবর্তে থাকে ঘৃণা, পুনর্বাসনের পরিবর্তে থাকে বর্জনের আহ্বান।
ধর্মের ভাষাকে ব্যবহার করা হয় সামাজিক অপমানকে বৈধতা দেওয়ার জন্য।
ফলে অনেক নারী চিকিৎসা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা আইনি সহায়তা নেওয়ার পরিবর্তে আত্মগোপনে চলে যান। কারণ তাঁরা জানেন—সমাজের বিচার শেষ হবে না।
শরিয়াহর নামে কেমন রাষ্ট্রের কল্পনা?
বাংলাদেশে বিভিন্ন সংগঠন শরিয়াহভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি জানায়। এই দাবির পক্ষে ও বিপক্ষে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে, এবং “শরিয়াহ” বলতে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ ভিন্ন ধারণা বোঝেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়—যদি এমন কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে একজন সিঙ্গেল মাদার এবং তাঁর সন্তানের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা কীভাবে নিশ্চিত হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কেবল কঠোর শাস্তির কথা বলা হলে, স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। কারণ ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, যখন ধর্মের কঠোর ও সংকীর্ণ ব্যাখ্যা রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, তখন নারীরা প্রায়ই বৈষম্য, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ বা নিপীড়নের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
সুতরাং যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা—ধর্মীয় হোক বা ধর্মনিরপেক্ষ—তার মূল্যায়নের মূল মানদণ্ড হওয়া উচিত: সেটি কি নারী ও শিশুর অধিকার, নিরাপত্তা এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষা করতে সক্ষম?
ধর্ম কি ঘৃণা শেখায়, নাকি মানুষ?
প্রতিটি ধর্মেই করুণা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষা রয়েছে। কিন্তু যখন ধর্মকে ক্ষমতা, রাজনীতি কিংবা সামাজিক আধিপত্যের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন সেই মানবিক শিক্ষা আড়ালে চলে যায়।
ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো সহজ; কিন্তু একজন অসহায় মায়ের পাশে দাঁড়ানো কঠিন।
একজন ক্ষুধার্ত শিশুকে খাবার দেওয়ার চেয়ে তার বংশপরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেন অনেকের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ কি ধর্মের বিজয়, নাকি আমাদের মানবিকতার পরাজয়?
আমাদের সমাজ কোন পথে যাবে?
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় নির্ধারিত হয় সে দুর্বল মানুষদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তার মাধ্যমে।
একজন সিঙ্গেল মাদার করুণা চান না; তিনি চান সম্মান, নিরাপত্তা এবং সমান সুযোগ।
একটি শিশু বিশেষ সুবিধা চায় না; সে শুধু চায় তার পরিচয় যেন তার স্বপ্নকে হত্যা না করে।
যে সমাজ একজন মায়ের ব্যক্তিগত জীবনের জন্য তাঁর সন্তানকে শাস্তি দেয়, সেই সমাজ নৈতিকতার নয়, নিষ্ঠুরতার চর্চা করে।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র গড়তে চায়, তবে প্রথমেই আমাদের শিখতে হবে—একজন নারীর মূল্য তাঁর বৈবাহিক অবস্থায় নয়, তাঁর মানবিক মর্যাদায়। আর একটি শিশুর পরিচয় তার বাবার নাম নয়, তার নিজের মানুষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।
যেদিন আমরা এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারব, সেদিনই হয়তো একজন সিঙ্গেল মাদার আর সমাজের আসামি হয়ে নয়, একজন সম্মানিত নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকার ফিরে পাবেন।
লিখেছেন- Swapnil Nuraiya











