গত শুক্রবার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান মানসিক অবস্থা এবং তথাকথিত ‘নৈতিকতার দেয়াল’ নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। একজন সাবেক শিক্ষার্থী তার স্ত্রীকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় পর্দায় ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিলেন। কিন্তু ক্যাম্পাসের একটি নির্দিষ্ট হলের মাঠে খেলা দেখার জন্য তাঁদের যে মূল্য চোকাতে হলো, তা একবিংশ শতাব্দীর একটি প্রগতিশীল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চরম লজ্জাজনক। হল সংসদের শিবির-সমর্থিত সমাজসেবা সম্পাদক এবং তার সহযোগীদের হাতে শুধু ‘নারী’ হওয়ার অপরাধে ওই দম্পতিকে হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, শুনতে হয়েছে বিদ্বেষমূলক প্রশ্ন এবং একপর্যায়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।
এই ঘটনার পেছনে যে মনস্তত্ত্ব কাজ করছে, তা নতুন কিছু নয়। এটি সেই আদিম, পিতৃতান্ত্রিক ও মৌলবাদী মানসিকতা—যা মনে করে পাবলিক স্পেস বা উন্মুক্ত স্থানগুলো কেবল পুরুষদের একচেটিয়া সম্পত্তি। নারীদের আগমন সেখানে কেবল ‘শৃঙ্খলা’র পরিপন্থীই নয়, বরং তাদের উপস্থিতিকে সবসময় একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করা হয়। নিয়মের দোহাই দিয়ে, সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে কিংবা ধর্মীয় জুজু বুড়োদের ভয় দেখিয়ে নারীদের ঘরের চার দেওয়ালে আটকে রাখার এই অপচেষ্টা আমাদের চেনা সমাজ বাস্তবতারই এক নগ্ন প্রতিফলন।
তবে এই অন্ধকারের বিপরীতে যে আলোটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ নারী শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছেন, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। হেনস্তার শিকার হয়ে ঘরে লুকিয়ে কান্নার দিন যে শেষ, তা তাঁরা প্রমাণ করেছেন আজ সকালে। কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের ভিপি সানজানা চৌধুরী রাত্রীর ডাকে সাড়া দিয়ে শত শত নারী শিক্ষার্থী আজ দলবেঁধে সেই শহীদুল্লাহ হলের মাঠেই হাজির হয়েছিলেন। তাঁরা কেবল মাঠে যাননি, বুক চিতিয়ে মাঠের দখল নিয়েছেন এবং সেখানে বসেই ফুটবল খেলা উপভোগ করেছেন।
যাঁরা নারীদের দেখলেই ‘পর্দা’, ‘নিয়ম-শৃঙ্খলা’র খৈ ফোটান, যাঁদের হুজুরতানি আর নৈতিকতার পুলিশিং কেবল নারীর স্বাধীন চলাফেরার ওপর এসেই কঠোর হয়—বোনদের এই সম্মিলিত ও শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ তাঁদের মুখের ওপর এক বিরাট চপেটাঘাত। এই প্রতিবাদ কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল একটি তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক ইশতেহার। এই আন্দোলন স্পষ্ট বার্তা দেয়—বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো মাঠ, কোনো হল বা কোনো প্রাঙ্গণ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শিবিরের লাঠিয়াল বাহিনীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ক্যাম্পাস ছাত্রদের যতটা, ছাত্রীদেরও ঠিক ততটাই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এই নারীরাই কিন্তু চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে স্বৈরাচারের বুলেট-টিয়ারগ্যাসের মুখোমুখি হয়েছিলেন। যে নারীরা একটি রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদের হাত থেকে মুক্ত করতে রাজপথ কাঁপাতে পারে, তারা যে নিজেদের ক্যাম্পাসে নিজেদের হিস্যা ও অধিকার বুঝে নিতেও সমানভাবে পারঙ্গম—আজকের এই প্রতিরোধ তারই অকাট্য প্রমাণ। জুলাইয়ের নারীরা নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে আপস করতে শেখেনি, আর শিখবেও না।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তবুদ্ধি চর্চা, উদারতা এবং সমতার প্রতীক। সেখানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের নামে নারীদের খাঁচাবন্দি করার কিংবা পাবলিক স্পেসে তাঁদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার যেকোনো প্রয়াসকে শুরুতেই রুখে দিতে হবে। শহীদুল্লাহ হলের মাঠে ছাত্রীদের ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো কেবল একটি সৌজন্য ছিল না; এটি ছিল প্রগতিশীল চেতনার কাছে মৌলবাদী ও সংকীর্ণ মানসিকতার নৈতিক পরাজয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে এখন আমাদের জোর দাবি—এই তথাকথিত নৈতিকতার ঠিকাদার সাজু মিয়া ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রক্টরিয়াল বডি যেন সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে। ক্যাম্পাসগুলোতে যদি এই ধরনের ‘পাহাড়াদারি’র সংস্কৃতি চলতে দেওয়া হয়, তবে তা আমাদের সামগ্রিক প্রগতিকে ধূলিসাৎ করে দেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোক সবার জন্য মুক্ত, নিরাপদ এবং বৈষম্যহীন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা এই লড়াকু বোনদের জানাই লাল সালাম। অবরুদ্ধতার দেয়াল ভেঙে জয় হোক প্রগতির।
লিখেছেন: Noorun Nahar











