বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 2:13 am
January 16, 2026 2:13 am

ধর্মের নামে ধর্ষণ, নীরবতার নামে পাপ

Rafia Akther

যখন ধর্মকে ব্যবহার করা হয় নারীর উপর সহিংসতার ঢাল হিসেবে, তখন নীরবতাও হয়ে ওঠে এক গভীর অপরাধ। সমাজের ভেতরের এই ভয় আর ভণ্ডামি না ভাঙলে ন্যায়বিচার অসম্ভব।


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর যে অপরাধটি ঘুরেফিরে সমাজের প্রতিটি স্তরে দেখা যায়, তা হলো ধর্ষণ। শিশুর থেকে বৃদ্ধা—কেউ বাদ যাচ্ছে না। অথচ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, এই অপরাধের পেছনে বারবার ধর্মীয় নৈতিকতার মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একদল মানুষ, যারা নিজেদের ধার্মিক বলে দাবি করে। ধর্মের নাম, শরীয়াহ, পবিত্রতা—সবকিছুই তারা ব্যবহার করছে নারীর শরীর ও সম্মানকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে। সমাজ যখন নীরব থাকে, তখন সেই নীরবতাই পরিণত হয় এক গভীর পাপের মধ্যে।

ধর্মের নামে ধর্ষণ মানে শুধু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা গোঁড়া ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ নয়; বরং এটি এমন এক সামাজিক বাস্তবতা, যেখানে ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নারীর উপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক সহিংসতা। এই সহিংসতার পেছনে থাকে ভয়, ধর্মীয় অপরাধবোধ, আর এক অদ্ভুত ‘পবিত্রতা’ ধারণা, যা নারীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

একটি সমাজ তখনই পচে যায়, যখন অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। বাংলাদেশে এখন ধর্ষণের পর প্রথম প্রশ্ন হয়—“ওই মেয়েটা কী করেছিল?” কেউ বলে, “তার পোশাক ঠিক ছিল না”, কেউ বলে, “সে রাতে বাইরে কেন ছিল?”, কেউ আবার বলে, “ধর্ম মানলে এমন হতো না।” এই প্রশ্নগুলো কেবল ধর্ষণকে বৈধতা দেয় না, বরং অপরাধীকে উৎসাহিত করে।

ধর্মীয় বক্তারা প্রতিদিন টেলিভিশন ও ইউটিউবের পর্দায় মুখ খুলে বলেন—“নারীরা শালীন থাকলে সমাজে ধর্ষণ হবে না।” এই বক্তব্যই প্রমাণ করে, তারা ধর্ষণকে সামাজিক অপরাধ হিসেবে নয়, বরং নারীর দায়িত্ব হিসেবে দেখতে চায়। যেন ধর্ষক নয়, ভুক্তভোগীই অপরাধী। অথচ এই বক্তারাই ধর্মের নামে ‘পবিত্রতা’ শেখান, কিন্তু নিজেদের অন্ধকার ইতিহাসের কথা কখনো বলেন না।

কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি—ধর্মীয় শিক্ষক, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ, কিংবা স্থানীয় ইমামদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী ছিল শিশু বা কিশোরী। কিন্তু এসব ঘটনায় সমাজের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? বেশিরভাগ সময়ই নীরবতা। কারণ, অপরাধী ‘ধর্মীয় মানুষ’, তাই তার বিচার চাইলে সেটা নাকি ধর্মবিরোধিতা! এই ভয়ংকর নীরবতা আমাদের সমাজকে অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছে।

ধর্ম কখনো ধর্ষণের প্রশ্রয় দেয় না, বরং প্রতিটি ধর্মেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান আছে। কিন্তু ধর্মীয় গোঁড়ারা সেই ন্যায়বোধটিকে নিজেদের স্বার্থে বিকৃত করে ফেলেছে। তারা ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীর কণ্ঠরোধ করতে চায়, কারণ নারীর কণ্ঠই তাদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে।

একটা উদাহরণ ভাবুন—যখন কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে অভিযোগ তোলে, তখন কতজন ধর্মীয় নেতা তাকে সমর্থন দেন? বরং অনেকেই বলেন, “এসব ব্যাপার প্রকাশ করা উচিত না, চুপ করে থাকাই ভালো।” এই চুপ করে থাকা, এই ‘সম্মান বাঁচানো’র সংস্কৃতিই ধর্ষকদের বাঁচিয়ে রাখছে। সমাজের চোখে ভুক্তভোগীর সম্মান নষ্ট হয়, কিন্তু ধর্ষকের নয়—এই দ্বিচারিতাই আমাদের ধর্মীয় ও সামাজিক মানসিকতার প্রকৃত মুখ।

মাদ্রাসা, পীরের দরবার, হুজুরদের দীক্ষাকেন্দ্র—এসব জায়গায় ধর্ম শেখানোর নামে যে অনৈতিকতা চলছে, তা ভয়ঙ্কর। শিশুদের বলা হয়, “এটা গোপন রাখো, আল্লাহ দেখছে না।” অথচ এই অপরাধীরা জানে—সমাজ কখনো তাদের বিরুদ্ধে উঠবে না, কারণ তারা ‘আলেম’, ‘ধর্মীয় নেতা’। এই ধর্মীয় প্রভাবের দেয়াল ভেদ করা যেন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্ষণের ঘটনা যখন প্রকাশ পায়, তখন দেখা যায়—একদল মানুষ সেই অপরাধীকে ‘ষড়যন্ত্রের শিকার’ বলে দাবি করছে। যেন ধর্মীয় পোশাক পরলেই মানুষ পবিত্র হয়ে যায়। অথচ ইতিহাসে দেখেছি, ধর্মের নামে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত, সহিংসতা ও নির্যাতন চালানো হয়েছে নারীদের উপর। আজও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চলছে, শুধু পদ্ধতি পাল্টেছে।

আমরা ধর্মীয় দোহাই শুনি, কিন্তু মানবিকতা দেখি না। একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সমাজ তার সঙ্গে একাত্ম হয় না, বরং তার চরিত্র বিশ্লেষণ শুরু হয়। ধর্মের নামে বলা হয়—‘এটা তার নিয়তি’, ‘আল্লাহর পরীক্ষা’। কিন্তু ধর্ষককে কেউ বলে না—‘তুমি আল্লাহর বিধান ভেঙেছ’। এই নীরবতা কেবল ভয় নয়, এটা পাপ।

ধর্মীয় গোঁড়ারা সমাজে এক ধরনের ভয় তৈরি করেছে। এই ভয় মানুষকে সত্য বলা থেকে বিরত রাখে। যেন ধর্ম মানে কেবল ভীত থাকা, চিন্তা না করা, প্রশ্ন না করা। অথচ প্রকৃত ধর্ম প্রশ্নকে ভয় পায় না, বরং উৎসাহ দেয় ন্যায় প্রতিষ্ঠায়।

আজকের বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা সামাজিক সমস্যা নয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ও বটে। কারণ, ক্ষমতাবানদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে অপরাধীরা বেঁচে যায়। ধর্মীয় গোঁড়ারা তাদের পক্ষে যুক্তি খোঁজে, সমাজ আবার ধর্মের ভয়ে মুখ বন্ধ রাখে। এই ত্রিমুখী নীরবতাই ধর্ষণের সংস্কৃতি তৈরি করছে।

ধর্মীয় বক্তাদের অনেকের ভাষণে এখন “নারীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার” বার্তা দেওয়া হয়। তারা বলেন, “নারী যত স্বাধীন হয়, সমাজ তত ধ্বংস হয়।” অথচ এই স্বাধীনতাই নারীকে নিরাপদ করতে পারে। কারণ স্বাধীনতা মানে দায়িত্ববোধ, আত্মসম্মান ও সচেতনতা—যে সমাজ নারীকে এসব থেকে বঞ্চিত রাখে, সেখানে ধর্ষণ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ধর্মের নামে গড়ে ওঠা এই ভয়ভীতির সংস্কৃতি ভাঙা এখন সময়ের দাবি। কারণ, প্রতিটি নীরবতা অপরাধীকে শক্তিশালী করে তোলে। আমরা যদি ধর্মকে সত্যিই শ্রদ্ধা করতে চাই, তবে আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা। ধর্মের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি অপরাধ ঢাকে, তবে সেই ব্যক্তি ধর্মবিরোধী, ভুক্তভোগী নয়।

একজন নারী যখন ন্যায় চায়, তখন তাকে নাস্তিক বলা হয়; যখন সে প্রতিবাদ করে, তখন তাকে লজ্জাহীন বলা হয়। কিন্তু যে সমাজে ন্যায়বিচার চাওয়া লজ্জার, সেখানে ধর্ম কেবল স্লোগান হয়ে গেছে। ধর্ম যদি সত্যিই ন্যায় ও মানবতার শিক্ষা দেয়, তবে নারী যখন অন্যায়ের শিকার, তখন তার পাশে দাঁড়ানোই ধর্মীয় দায়িত্ব।

ধর্ষণকে রোধ করতে হলে শুধু আইন নয়, দরকার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কার। আমাদের মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় বক্তৃতায় নারীকে ‘দুর্বল’ নয়, মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে—‘নারীকে শ্রদ্ধা করা মানে আল্লাহকে শ্রদ্ধা করা।’

আমরা যদি সত্যিই ধর্মবিশ্বাসী হই, তবে আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, অপরাধ ঢেকে রাখা নয়। কারণ, ধর্মের নামে নীরব থাকা মানেই অপরাধে অংশ নেওয়া।

আজ যখন আমি দেখি, ধর্ষণের খবর শুনে সমাজের বড় অংশ কেবল হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, তখন মনে হয়—আমরা কতটা অমানবিক হয়ে গেছি। এক সময় ধর্ম মানে ছিল ন্যায়, এখন ধর্ম মানে ভয়। কিন্তু এই ভয়কে ভাঙতে হবে। কারণ, নীরবতা আমাদের মুক্তি দেয় না; নীরবতা কেবল অপরাধীর পক্ষে কাজ করে।

ধর্মের নামে ধর্ষণ শুধু একজন নারীর শরীরের উপর নয়, এটা পুরো মানবতার উপর আঘাত। আর যারা নীরব থেকে সেই আঘাতকে মেনে নেয়, তারাও সমান অপরাধী।

একটা সমাজ তখনই বদলায়, যখন তার মানুষ সত্যের পাশে দাঁড়ায়, ভয় নয়। ধর্ম তখনই পবিত্র থাকে, যখন তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ হয়। তাই এখন সময় এসেছে ধর্মের মুখোশ খুলে মানবতার মুখ দেখার।

নারীর প্রতি অন্যায় হলে যে সমাজ চুপ থাকে, সেই সমাজ ধ্বংসের পথে হাঁটে। আমাদের উচিত নীরবতা ভাঙা, সাহস দেখানো—কারণ ধর্মের নামে ধর্ষণ যেমন পাপ, তেমনি নীরবতাও এক গভীর পাপ।

 

লেখক: রাফিয়া আখতার — নারী অধিকারকর্মী ও কলাম লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *