বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 2:17 am
January 16, 2026 2:17 am

শরীরের অধিকার, ভালোবাসার স্বাধীনতা: যৌন অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের নীরব যুদ্ধ

Md Abdur Rahman

আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে মানুষ এখনো নিজের শরীর, ভালোবাসা এবং আকাঙ্ক্ষার মালিক নয়। জন্মের পর থেকেই আমাদের শেখানো হয়—তুমি ছেলে, তুমি মেয়ে, তোমার আচরণ এমন হওয়া উচিত, এমন পোশাক পরা উচিত, এমনভাবে ভালোবাসা উচিত। এই ‘উচিত’ শব্দটাই ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আমাদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে চেপে ধরেছে। যৌন অধিকার বা sexual rights—এই শব্দ দুটো আজও অনেকের কানে বিদ্রূপের মতো শোনায়। অথচ এটি মানবাধিকারেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ছাড়া মানুষের মর্যাদা কখনো পূর্ণ হয় না।

বাংলাদেশে যৌনতা নিয়ে কথা বলা এখনো নিষিদ্ধ বিষয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, এমনকি চিকিৎসা ব্যবস্থায়ও এই বিষয়ে একধরনের অস্বস্তি কাজ করে। কিন্তু যৌনতা কোনো অশ্লীলতা নয়; এটি মানুষের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ। আমরা যত বেশি এটিকে লুকাতে চাই, তত বেশি আমরা অজ্ঞতা ও বৈষম্যের ভেতরে মানুষকে ঠেলে দিই।

আমাদের সমাজে যৌন অধিকারের সবচেয়ে বড় বাধা হলো “লজ্জা সংস্কৃতি”—একটি সামাজিক কাঠামো যা মানুষকে নিজের শরীরের বিষয়ে সচেতন নয়, লজ্জিত করে তোলে। একজন মেয়ে যদি নিজের শরীর নিয়ে খোলামেলা কথা বলে, তাকে বলা হয় “বেহায়া”; একজন ছেলে যদি নিজের যৌন পরিচয় নিয়ে খোলাখুলি কথা বলে, তাকে বলা হয় “অস্বাভাবিক”। অথচ মানবাধিকারের মূল ধারণাই হলো, প্রতিটি মানুষ তার শরীর ও যৌন জীবনের বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।

কিন্তু বাংলাদেশে এখনো যৌন শিক্ষা স্কুলের পাঠ্যসূচিতে প্রান্তিকভাবে আসে, সেটাও প্রায়শই ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়। শিক্ষক লজ্জা পান, ছাত্ররা হাসে, প্রশাসন বলে “এতে নষ্ট হবে সমাজের নৈতিকতা”—এভাবেই আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অজ্ঞ রেখে বড় করছি।

যৌন অধিকার নিয়ে কথা বললেই মানুষ ভাবে—এটা শুধু সমকামিতা নিয়ে। কিন্তু আসলে এটি আরও বিস্তৃত একটি ধারণা:
নিজের শরীরের ওপর অধিকার, যৌন সম্পর্কের সম্মতি, নিরাপদ যৌন আচরণ, যৌন নির্যাতন থেকে মুক্তি, এবং ভালোবাসার স্বাধীনতা—এসবই যৌন অধিকারের আওতায় পড়ে।

 

ধর্মীয় ও সামাজিক মানদণ্ড যৌন আচরণকে একধরনের নিয়ন্ত্রণের উপকরণে পরিণত করেছে। একজন নারী যদি যৌন নির্যাতনের শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—“সে কী পরেছিল?” কিন্তু যদি একজন পুরুষ নির্যাতনের শিকার হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে না কিছুই; বরং সমাজ সেটাকে ‘অসম্ভব’ বলে উড়িয়ে দেয়। এই দ্বিচারিতা শুধু ন্যায়ের প্রতি নয়, মানবাধিকারের প্রতিও নির্মম অবমাননা।

যৌন সম্পর্কের মধ্যে সম্মতির গুরুত্ব নিয়ে আমরা এখনো পরিপূর্ণভাবে সচেতন নই। বিয়ের মধ্যেও ধর্ষণ হতে পারে—এই সত্যটা আমাদের সমাজ মানতে চায় না। কারণ বিয়েকে এখনো একধরনের মালিকানা ভাবা হয়—যেখানে একজন পুরুষ স্বামী হিসেবে ‘অধিকার’ পায়, আর নারী হয়ে ওঠে তার শরীরের এক্সটেনশন। অথচ আসল সত্য হলো, যে কোনো যৌন সম্পর্কেই ‘সম্মতি’ই মুখ্য। সম্মতি ছাড়া ভালোবাসা নেই, সম্মতি ছাড়া যৌন সম্পর্কও নেই।

 

বাংলাদেশে LGBTQ+ সম্প্রদায়ের মানুষদের অবস্থা আরও জটিল। তারা সমাজের চোখে প্রায় অদৃশ্য।
তারা স্কুলে অপমানিত হয়, কর্মক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়, পরিবারে প্রত্যাখ্যাত হয়।
তাদের ভালোবাসা সমাজের চোখে অপরাধ, তাদের পরিচয় লজ্জার।

একজন সমকামী পুরুষ যখন নিজের পরিচয় স্বীকার করে, তখন সে কেবল নিজের যৌন প্রবৃত্তির ঘোষণা দেয় না—সে সমাজের সামনে নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এই সমাজে তার জন্য স্থান নেই।
রাষ্ট্রও এখনো তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ভয় পায়।
ফলে এই মানুষগুলোকে বেঁচে থাকতে হয় ছদ্মবেশে, মিথ্যা পরিচয়ে, এবং নিঃশব্দে।

যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের ভালোবাসার স্বাধীনতাকেও ভয় পায়, সে রাষ্ট্র কখনো সত্যিকারের গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

 

যৌন অধিকারকে আমরা প্রায়ই ‘পশ্চিমা ধারণা’ বলে তুচ্ছ করি।
কিন্তু ইতিহাস বলছে—প্রতিটি সভ্য সমাজই তখনই বিকশিত হয়েছে, যখন তারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মানবাধিকারের সংজ্ঞা অনুযায়ী, প্রত্যেক মানুষ তার শরীর, চিন্তা ও ভালোবাসার বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা রাখে।
এটি ধর্ম বা সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে না; এটি মানবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

যে সমাজে মানুষের যৌন স্বাধীনতা নেই, সেখানে নারীর স্বাধীনতা থাকতে পারে না।
কারণ যৌনতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নারীকে নিয়ন্ত্রণ করা—এটাই পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।
এখানে যৌন অধিকার কেবল আনন্দের নয়, এটি ক্ষমতা ও ন্যায়ের প্রশ্ন।

 

আমাদের দেশে যৌনতা নিয়ে আলোচনা হয় মূলত দুইভাবে—
এক, নৈতিক আতঙ্ক তৈরি করে;
দুই, বিনোদনের উপাদান হিসেবে।
ফলে যৌন শিক্ষা কিংবা যৌন অধিকার নিয়ে যে গুরুতর সামাজিক বিষয়গুলো আছে, তা আলোচনায় আসে না।
টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন বা নাটকে নারীকে এখনো পণ্যের মতো ব্যবহার করা হয়, আর ধর্মীয় বক্তারা প্রকাশ্যে বলেন—“নারীর দায়িত্ব পর্দা করা, পুরুষকে উত্তেজিত না করা।”

এই যুক্তিগুলো কেবল নারীর শরীর নয়, তার চিন্তাকেও বন্দি করে ফেলে।
যৌন অধিকার আসলে এই অন্যায্য ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধেই লড়াই—যেখানে একজন নারী, পুরুষ, বা যেকোনো লিঙ্গের মানুষ নিজের শরীর ও ভালোবাসার ওপর নিজস্ব ক্ষমতা ফিরে পায়।

 

যখন রাষ্ট্র কোনো নির্যাতনের ঘটনায় নীরব থাকে, তখন আসলে সে অপরাধীকেই প্রশ্রয় দেয়।
বাংলাদেশে যৌন সহিংসতার মামলা হাজারে হাজার, কিন্তু ন্যায়বিচার হয় অতি সামান্য।
নারীর প্রতি সহিংসতা বা ধর্ষণের বিচার বিলম্বিত হয় বছরের পর বছর।
এদিকে সংবাদমাধ্যমে ঘটনাগুলো এমনভাবে প্রচার করা হয়, যেন ভুক্তভোগীই দায়ী।

এই সংস্কৃতি পরিবর্তন না হলে যৌন অধিকার কখনো বাস্তবে রূপ পাবে না।
আমাদের দরকার আইন নয়—মানুষের মানসিকতা বদলানো।
যে সমাজ নারীর পোশাকে নৈতিকতা খোঁজে, সে সমাজ কোনোদিন মানবিক হতে পারে না।

 

যৌন অধিকার কেবল লিঙ্গভিত্তিক বিষয় নয়। এটি বয়স, শ্রেণি ও ধর্মের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
একজন গার্মেন্টস শ্রমিক নারী যখন মাসিকের সময় বিশ্রাম পায় না, সেটাও যৌন অধিকারের লঙ্ঘন।
একজন কিশোরী যখন বাল্যবিয়েতে বাধ্য হয়, সেটাও যৌন নির্যাতন।
একজন পুরুষ যখন যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে ভয় পায়, সেটাও তার অধিকারের ক্ষয়।

যৌন অধিকার মানে সবার জন্য নিরাপদ পরিবেশ—যেখানে কেউ ভয় বা লজ্জায় নিজের শরীর বা ভালোবাসা লুকাবে না।

 

কিন্তু এই স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বাধা আসে সমাজ থেকে।
অনেকে বলে, “আমাদের সংস্কৃতিতে এসব চলে না।”
তবে প্রশ্ন হলো—সংস্কৃতি কাকে বলে?
যে সংস্কৃতি মানুষের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করে, সেটি আসলে সংস্কৃতি নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম।

সংস্কৃতি তখনই টিকে থাকে, যখন তা মানুষের মর্যাদাকে সম্মান করে।
যে সমাজ প্রেমকে লুকাতে শেখায়, ভিন্নতাকে অস্বীকার করে, নারীর শরীরকে দোষারোপ করে—সে সমাজ কেবল ঘৃণা তৈরি করে, ভালোবাসা নয়।

 

যৌন অধিকার মানে কেবল “যৌন সম্পর্কের স্বাধীনতা” নয়, বরং নিজের শরীর ও মনের প্রতি দায়বদ্ধতা।
একজন মানুষ যখন নিজের শরীরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তখনই সে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়।
এই কারণেই যৌন অধিকার মানে কেবল ব্যক্তিগত নয়, সামাজিক ন্যায়ের দাবিও।

যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে নিজের শরীরের মালিক হতে দেয় না, সে রাষ্ট্র কোনোভাবেই স্বাধীন নয়।
যে পরিবার সন্তানকে নিজের মতো করে ভালোবাসতে দেয় না, সে পরিবার ভালোবাসার স্কুল নয়, ভয় শেখার জায়গা।

আমাদের এই ভয় ভাঙতে হবে।
ভালোবাসাকে শত্রু নয়, মানবতার উৎস হিসেবে দেখতে হবে।

 

শেষ কথা:
যৌন অধিকার কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ন্যায়ের অংশ।
যে সমাজ ভালোবাসাকে অপরাধ বানায়, সেই সমাজ একদিন ঘৃণার ভারে ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—আমরা কি আমাদের সন্তানদের এমন এক দেশ দিতে পারব, যেখানে তারা নিজের শরীর ও ভালোবাসার অধিকার নিয়ে গর্বিত হতে পারবে?

মানবাধিকারের চূড়ান্ত রূপ আসলে এখানেই—
যখন মানুষ বলতে পারবে, “আমার শরীর, আমার সম্মতি, আমার স্বাধীনতা।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *