বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

December 1, 2025 3:27 am
December 1, 2025 3:27 am

পুলিশের লাঠির আঘাত: শারীরিক যন্ত্রণা ও মানবাধিকারের লঙ্ঘন

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

বাংলাদেশে নাগরিকরা যখন রাস্তায় দাঁড়ায়, তখন হাতে থাকে শুধুই দাবি, অস্ত্র নয়। শিক্ষকরা গ্রেড উন্নয়ন, বেতন কাঠামো, মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন শুরু করেন, ছাত্ররা স্থাপনা, পরীক্ষা বা শিক্ষার ন্যায্য পরিবেশ রক্ষার জন্য রাস্তায় আসে, সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামে তার জীবন ও জীবিকার জন্য। কিন্তু এই শান্তিপূর্ণ দাবি রাষ্ট্র দেখছে ভীতিপূর্ণ চোখে। প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে লাঠি, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও গুলি বর্ষণ। রাষ্ট্র কি ভুলে গেছে, যে এই মানুষগুলোই তার ভবিষ্যৎ? তাদের হাতে অস্ত্র নেই, আছে কেবল নাগরিক অধিকার আদায়ে সাহস। সেই সাহসকে দমন করার জন্যই লাঠি ও অস্ত্র তুলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

শিক্ষক সম্প্রদায়ের ওপর জলকামান নিক্ষেপের দৃশ্য কয়েক মাস আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমি থমকে গিয়েছিলাম। ভাবছিলাম—যে হাতটি লাঠি ধরেছে, সে কি জানে সে কাকে আঘাত করছে? যাকে আঘাত করছে, সে কোনো সন্ত্রাসী নয়, কোনো অশুভ শক্তি নয়। সে এই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরি করা একজন মানুষ। তার লাঠির আঘাতে যে শিক্ষক পড়ে যাচ্ছেন, তার বেতনে হয়তো নিজের সন্তানের ওষুধও ঠিকঠাক কেনা যায় না। সেই মানুষটিকেই রাষ্ট্র প্রহার করছে। কেন? রাষ্ট্র কি এতটাই অন্ধ হয়ে গেছে? আমার মনে হয়—এ অন্ধত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি নৈতিক অন্ধত্ব। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, প্রতিবাদ দেখলেই লাঠি তোলে, সে রাষ্ট্র মানবিকতার ভিত্তিতে দাঁড়ানো রাষ্ট্র নয়—সেটি ভীত, দুর্বল রাষ্ট্র।

 

সাম্প্রতিক শিক্ষক আন্দোলনে লাঠিচার্জের দৃশ্য, বিসিএস পরীক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলা, সাধারণ কৃষকের বিক্ষোভে জলকামান—এসব ঘটনা আমাদের শুধু ব্যথিত করে না, আমাদের সামনে দাঁড় করায় এক গভীর প্রশ্ন: এই রাষ্ট্রটি কাদের? সংবিধান বলে—রাষ্ট্র জনগণের। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ বলে—রাষ্ট্র ক্ষমতাসীনের। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের প্রথম ভাষা কখনোই সংলাপ নয়, বরং লাঠি। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৮৩ সালের পুলিশ প্রবিধান, এমনকি জাতিসংঘের বলপ্রয়োগ নীতিমালা—সবই বলছে: বল হল সর্বশেষ বিকল্প। কিন্তু বাংলাদেশে বলই প্রথম বিকল্প।

কিন্তু বিস্ময় এখানেই—বাংলাদেশের সংবিধান নিজেই নাগরিককে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মিছিল ও প্রতিবাদের পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে: “প্রতিটি নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে এবং নিরস্ত্র অবস্থায় সমাবেশ ও মিছিল করার অধিকার ভোগ করবে।” অর্থাৎ সংবিধান নাগরিককে শুধু অনুমতিই দেয়নি; বরং তাদের গণতান্ত্রিক দায়িত্ব হিসেবে এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

 

এটি শুধু দেশের সংবিধানের নীতিই নয়—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ (ICCPR, Article 21) একই ভাষায় বলেছে: শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার, এবং রাষ্ট্র শুধুমাত্র অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও অনুপাতমূলক কারণেই এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে।

 

অর্থাৎ, আইনের চোখে আন্দোলন দমন করা নয়; বরং আন্দোলনকে সুরক্ষা দেওয়া—এটাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি উল্টো চিত্র—যেখানে শান্তিপূর্ণ মিছিল বা দাবি-দাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় প্রথমেই দেখা যায় লাঠি, গ্রেনেড, জলকামান বা নির্বিচার গ্রেপ্তার।

এ অবস্থান শুধু সংবিধানবিরোধী নয়, মানবাধিকারবিরুদ্ধও—এমনটা স্পষ্ট করে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার বলছে।

 

শিক্ষকদের আন্দোলনের সময় আমি এক শিক্ষককে বলতে শুনেছিলাম, “আমরা কেন রাস্তায় নামলাম? কারণ অন্য সব দরজা বন্ধ ছিল। এখন আবার পুলিশ আমাদের মুখ বন্ধ করছে।” এই একটি বাক্য আজকের রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ককে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে।

 

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের অস্থিরতা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি দাগ হয়ে থাকবে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ—সবাই বলেছে, তখন যা ঘটেছিল তা ছিল রাষ্ট্রীয় সহিংসতার উন্মুক্ত প্রদর্শনী। জাতিসংঘ বলেছে, মোট নিহত প্রায় ১,৪০০ জন এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে ১১–১৩ শতাংশ শিশু। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে—অসহায় মানুষদের ওপর গুলি, আহতদের ওপর পুনরায় হামলা, সাধারণ পোশাকধারীদের পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে আক্রমণ করতে। একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তখন আমার শরীর কেঁপে উঠেছিল। প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্র কি এতটাই নির্মম হয়ে উঠতে পারে? কোনো সরকার কি এতটা অন্ধত্বে ডুবে যেতে পারে? দুঃখজনক সত্য হলো—হ্যাঁ, পারে। এখানেই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা—রাষ্ট্র চাইলেই পুলিশকে ক্ষমতার অস্ত্র বানাতে পারে।

 

এই সংস্কৃতি নতুন নয়। বিএনপি সরকারের ২০০১–২০০৫ মেয়াদেও একইভাবে পুলিশকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ব্যবহার করা হয়েছিল। এখন আবার ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা একই দৃশ্য দেখেছি। দল বদলেছে, ক্ষমতার বিন্যাস বদলেছে, কিন্তু দমননীতির চেহারা বদলায়নি। এটিই বাংলাদেশের রাষ্ট্র-সংস্কৃতির গভীর রোগ।

 

মানবাধিকারের সবচেয়ে অন্ধকার এলাকা হলো—হেফাজতে মৃত্যু। যে জায়গাটি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবায় তা হলো—একজন মানুষকে গ্রেপ্তার করলেই সে রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ দায়ে চলে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক মানুষ থানায় গিয়ে আর ঘরে ফিরতে পারেন না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রতি বছর ডজন ডজন মানুষ হেফাজতে মৃত্যুর শিকার হয়। কারণ দেখানো হয়—‘হৃদরোগ’, ‘অসুস্থতা’, বা ‘আত্মহত্যা’। অথচ পরিবারগুলো বলছে—মৃতদেহে ছিল আঘাতের চিহ্ন। এটি যেন রাষ্ট্রের অন্ধকার কুসংস্কার—যে মানুষ থানায় যায়, সে অনিরাপদ। আমি বহু পরিবারের কান্না শুনেছি। এক মা আমাকে বলেছিলেন, “আমার ছেলেকে থানায় নিয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম আইন তাকে রক্ষা করবে। কিন্তু পুলিশ তাকে ফিরিয়ে দিল লাশ হয়ে।” কোন রাষ্ট্রে এমন হতে পারে? আইন কি কখনো মৃত্যুদূত হতে পারে?

 

মানবাধিকার কমিশনকে এবার নতুন অধ্যাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু প্রশ্ন অনেক—কমিশন কি সত্যিই স্বাধীন? তারা কি রাজনৈতিক চাপ উপেক্ষা করতে পারবে? তাদের তদন্ত কি আদালত বা সরকার গুরুত্ব দেবে? একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি জানি—ক্ষমতা শুধু কাগজে দিলে হয় না; প্রয়োগে দিতে হয়, স্বাধীনতায় দিতে হয়। বাংলাদেশ কমিশন যদি একটি ঘটনারও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে পারে—যদি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ঘটনাতেও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয়—তবে সেটি হবে নতুন ইতিহাস। কিন্তু আমরা অপেক্ষা করছি। কখন রাষ্ট্র সাহস দেখাবে? কখন রাষ্ট্র ক্ষমতার বিরুদ্ধে সত্যের পাশে দাঁড়াবে?

 

রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—পুলিশ জনগণের নয়, সরকারের বাহিনী হয়ে গেছে। এই সংকট মানুষের আস্থা ধ্বংস করছে। পুলিশ জনগণকে সন্দেহ করে, ভয় করে, দমন করে। কারণ তাদের জবাবদিহি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে, জনগণের কাছে নয়। যে রাষ্ট্রে পুলিশ সরকারের নির্দেশে লাঠি তোলে, আর জনগণের কণ্ঠস্বরকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে—সেই রাষ্ট্রকে মানবিক বলা যায় না। একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি বিশ্বাস করি—পুলিশ যদি নাগরিকের বন্ধু না হয়, রাষ্ট্র কখনোই গণতান্ত্রিক হতে পারে না।

 

রাষ্ট্রকে বদলাতে হবে—গুলির ভাষা থেকে সংলাপে, লাঠির ভাষা থেকে অধিকারবোধে, ভয়ের রাজনীতি থেকে মানবিক রাজনীতিতে। পুলিশকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে হবে, প্রতিটি বলপ্রয়োগের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে, হেফাজতে মৃত্যু রোধে স্বচ্ছতা ও সিসিটিভি ব্যবস্থা চালু করতে হবে, মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, রাষ্ট্রকে ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও নাগরিক-অধিকারের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে।

 

আমি রাষ্ট্রকে ঘৃণা করি না; বরং রাষ্ট্রকে ভালোবাসি বলেই এই কণ্ঠ তুলি। নাগরিক হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে নয়, একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে নয়—বরং একজন মানুষ হিসেবে বলি—রাষ্ট্রের যে রূপ আমরা জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এ দেখেছি, হেফাজতে মৃত্যুতে দেখেছি, শিক্ষক-ছাত্রের ওপর লাঠিচার্জে দেখেছি—সেই রাষ্ট্র মানবিক রাষ্ট্র নয়। আমাদের লড়াই হলো সেই মানবিক রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনা। যেখানে পুলিশ ক্ষমতার নয়—জনগণের। যেখানে লাঠি নয়—অধিকার কথা বলে। যেখানে রাষ্ট্র তার নাগরিককে ভয় পায় না—সম্মান করে। এই স্বপ্নই আমাদের পথ দেখায়, আমাদের শক্তি দেয়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নই আমাদের মানবাধিকারের লড়াই।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *