বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

December 1, 2025 3:27 am
December 1, 2025 3:27 am

মৌলবাদের চোখে নারী এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক কেন?

Rafia Akther

সময়ের সঙ্গে পৃথিবী এগিয়েছে। রাষ্ট্র বদলেছে, আইন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষ বদলেছে—কিন্তু নারীর অবস্থান বদলাতে গিয়ে যেন বারবার এক অদৃশ্য প্রাচীরে ধাক্কা খায়। এই প্রাচীরটি শুধু সামাজিক নয়, এটি রাজনৈতিকও নয়; এর শিকড় আরও গভীরে, আরও অস্বীকারযোগ্য স্থানে—মৌলবাদী চিন্তাশক্তির তলদেশে।

যখনই নারী তার কণ্ঠ তোলে, মৌলবাদীরা সেই কণ্ঠকে ‘অশ্লীলতা’, ‘বিদ্বেষ’, ‘অনৈতিকতা’ কিংবা ‘ধর্মবিরোধিতা’ দিয়ে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। যেন নারীর প্রতিটি মুক্ত নিঃশ্বাসই সমাজের পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খলকে চ্যালেঞ্জ করে। প্রশ্ন জাগে—আজও মৌলবাদের চোখে নারী দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক কেন? কেন এখনো তারা নারীর স্বাধীনতাকে ভয় পায়?

এই প্রশ্নগুলো কেবল বিতর্কের নয়; এগুলো আমাদের সমাজব্যবস্থার নৈতিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার মৌলিক প্রশ্ন।

ইতিহাসের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা নারীর সংগ্রাম

নারীর প্রতি বৈষম্যের ইতিহাস নতুন নয়। ধর্মীয়, সামাজিক, পারিবারিক—সব কাঠামোই নারীর অগ্রগতি ঠেকাতে সূক্ষ্ম দেয়াল তৈরি করেছে। কিন্তু মৌলবাদের দৃষ্টিভঙ্গি এই দেয়ালটিকে আরও কঠোর, আরও পুরুষতান্ত্রিক করে তোলে।

মৌলবাদ কখনোই নারীকে মানবিক সত্তা হিসেবে দেখে না; দেখে একটি ‘ঝুঁকি’।
কেন?
কারণ নারী যদি স্বাধীন হয়, সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হয়, কিংবা নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্মাণ করতে চায়, তবে মৌলবাদীরা যে ক্ষমতার স্থাপত্য বহু বছর ধরে বজায় রেখেছে, তা ধসে পড়ে।

নারী তখন আর ‘নির্দেশগ্রহণকারী’ থাকে না—সে হয়ে ওঠে ‘নির্দেশদাতা’।
এই পরিবর্তনটাই মৌলবাদের আতঙ্ক।

ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে নারীর অধিকার ছেঁটে ফেলা

যে দেশে ধর্মীয় বক্তারা রাতের বেলায় নারীর পোশাক, চলাফেরা, কণ্ঠস্বাধীনতা এবং সামাজিক ভূমিকা নিয়ে ঘৃণাভাষণ দেন; যে দেশে নারীর স্বাভাবিক অধিকারকে ‘ধর্মবিরোধিতা’ হিসেবে দাঁড় করানো হয়—সেখানে নারী আর কতটা স্বাধীন হতে পারে?

ধর্মের নাম ব্যবহার করে নারীর স্বাধীনতা কেটে দেওয়া এক ধরণের নৈতিক ফাঁদ।
বলার কথা—ধর্ম নারীর মর্যাদা রক্ষা করে।
কিন্তু বাস্তবতা—ধর্মের ব্যাখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাদের ক্ষমতা, তাদের মধ্যে নারীর উপস্থিতি নেই বললেই চলে।
অথচ তারা নারীর জীবনের প্রতিটি অংশ—পোশাক থেকে বিবাহ, শিক্ষা থেকে কর্মজীবন—সব কিছুতেই মতামত দেওয়ার অধিকার দাবি করে।

এটাই মৌলবাদের নির্মম বাস্তবতা:
যাকে কখনো যুক্তির জায়গা দেওয়া হয়নি, তাকে নিয়ন্ত্রণের জায়গা দেওয়া হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

নারীর দেহ: মৌলবাদের নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু

মৌলবাদের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—নারীর দেহকে তার ধর্মীয় নৈতিকতার কেন্দ্রস্থলে বসিয়ে দেওয়া।
পুরুষের দেহ, তার কামনা, তার দুর্বলতা—এসব নিয়ে মৌলবাদীদের কোনো আলোচনা নেই।
কিন্তু নারী?
নারীর দেহই যেন সব সমস্যার উৎস।

নারীর পোশাককে তারা ‘ফিতনা’ বলে, আর পুরুষের দায়িত্বহীনতাকে বলে ‘স্বভাব’।
নারীর চলাফেরা হয় ‘অশ্লীলতা’, পুরুষের অসভ্যতা হয় ‘অকস্মাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা’।
নারীর কণ্ঠস্বাধীনতা হয় ‘ধর্মীয় শত্রুতা’, পুরুষের ঘৃণাভাষণ হয় ‘ওলামার কথা’।

মৌলবাদ নারীর প্রতি এই পক্ষপাতমূলক অবস্থান কেন ধরে রাখে?

কারণ—
নারীর দেহ নিয়ন্ত্রণ মানে নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ।
আর নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামাজিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যা ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকে।

শিক্ষা ও জ্ঞান—মৌলবাদের সবচেয়ে বড় শত্রু

যে সমাজে নারী শিক্ষিত হয়, সেখানে মৌলবাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই কারণেই বহু ধর্মীয় গোষ্ঠী মেয়েদের উচ্চশিক্ষাকে প্রলয়ঙ্করী বলে চিহ্নিত করতে চায়।

তাদের ভয়—
শিক্ষিত নারী প্রশ্ন করতে শেখে।
আর মৌলবাদ সবচেয়ে ভয় পায় প্রশ্নকে।

একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম হয়, তখন পরিবার, সমাজ কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর তার নির্ভরতা কমে যায়।
এটাই মৌলবাদীদের তীব্র অস্বস্তির জায়গা।

তারা চায় নারী যেন তার ‘অস্তিত্ব’ পরিবার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দানের ওপর নির্ভর করে রাখে।
কিন্তু শিক্ষা সেই দানটিকেই অপ্রয়োজনীয় করে তোলে।

এ কারণেই মৌলবাদ এমন সব সমাজে thrives—
যেখানে নারীর শিক্ষা সন্দেহের চোখে দেখা হয়।

নারীর কণ্ঠ দমন করতে ডিজিটাল হুমকি

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নারীদের জন্য নতুন কণ্ঠ, নতুন মঞ্চ দিয়েছে।
কিন্তু মৌলবাদীরা এটিই ভয় পাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
কারণ ডিজিটাল স্পেসে নারীরা আর ‘চুপ থাকা’ চরিত্র নয়—তারা মতামত দেয়, যুক্তি দেয়, প্রতিবাদ করে।

ফলে সেখানে মৌলবাদ নেমে আসে নতুন এক অস্ত্র নিয়ে—
অনলাইন ট্রোলিং, হুমকি, রেপ থ্রেট, এবং চরিত্রহনন।

নারী যদি বলে—
“আমি আমার অধিকার চাই”—
তারা বলে—
“তুমি ধর্মবিরোধী।”

নারী যদি লিখে—
“বিবাহে সমঅধিকার চাই”—
তারা বলে—
“তুমি পশ্চিমা সংস্কৃতির দাসী।”

নারী যদি প্রতিবাদ করে—
তারা বলে—
“তোমার চরিত্র সংশয়জনক।”

এখানে লক্ষণীয় একটি বিষয়—
মৌলবাদের বিরোধিতায় যারা পুরুষ, তাদের বিরুদ্ধে এই মাত্রার ব্যক্তিগত হামলা হয় না।

এটি প্রমাণ করে—
নারীর কণ্ঠ মৌলবাদীদের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় হুমকি।

পরিবার: প্রথম যুদ্ধক্ষেত্র

মৌলবাদ শুধু মসজিদ, মাদ্রাসা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে জন্মায় না—
এটি জন্মায় ঘরের ভেতরে, ডাইনিং টেবিলে, বসার ঘরে, সন্ধ্যার আলোয় বাবা-মেয়ের কথোপকথনে।

অনেক পরিবারে এখনো নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়া ‘অপবিত্র সাহস’ বলে মনে করা হয়।
পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ধর্মকে ব্যবহার করে নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করতে চায়।

আমাদের সমাজে পরিবারের ছেলেকে শেখানো হয়—
সে পরিবারের ভবিষ্যৎ।

আর মেয়েকে শেখানো হয়—
সে পরিবারের দায়িত্ব।

এই পার্থক্যই মৌলবাদকে জিইয়ে রাখে।
কারণ পরিবার যখন নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ চর্চা করে, তখন সমাজ সেই নিয়ন্ত্রণকেই স্বাভাবিক ধরে।

রাষ্ট্র কি সত্যিই নারীর পাশে?

আইনের বইয়ে নারীর অধিকার আছে, আদালতে নারীর সুরক্ষা আছে, সংবিধানেও সমঅধিকার আছে।
কিন্তু বাস্তবে?
রাষ্ট্র প্রায় সময় মৌলবাদের চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

যখন ধর্মীয় গোষ্ঠী নারীর অধিকার নিয়ে উন্মাদনা ছড়ায়—
রাষ্ট্র তা প্রতিহত করার বদলে ‘তাদের রাগ কমানোর’ চেষ্টা করে।
যেকোনো প্রগতিশীল আইন বা নীতি প্রণয়নের সময়ও তারা মৌলবাদের দিকে তাকিয়ে দেখে—
“ওরা কী বলবে?”

রাষ্ট্র যদি নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইত, তবে ঘৃণামূলক বক্তৃতা, ধর্মীয় উস্কানি, নারীবিদ্বেষী প্রচারণা—এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারত।
কিন্তু নেয় না।
কারণ মৌলবাদ রাষ্ট্রীয় রাজনীতির একটি জোরাল ভোটব্যাংক।

নারী স্বাধীনতার ভয়—মৌলবাদের অস্তিত্বের সংকট

মৌলবাদ নারীকে ভয় পায় মোটেও ধর্মীয় কারণে নয়—
এটি একধরনের রাজনৈতিক ভয়

একটি স্বাধীন, শিক্ষিত, আত্মবিশ্বাসী নারী—
মৌলবাদীর চোখে বিপজ্জনক।
কারণ সে প্রশ্ন করবে, যুক্তি দেবে, প্রতিরোধ করবে—
আর মৌলবাদ প্রশ্ন ও যুক্তির সামনে কখনোই টিকতে পারে না।

নারীর মুক্তি মানে সমাজে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস।
যেখানে পুরুষের বিশেষ সুবিধা কমে আসবে।
মৌলবাদ তো সেই বিশেষ সুবিধাকে ধর্মীয় ‘অধিকার’ হিসেবে চালিয়ে দিতে চায়।

উপসংহার

নারীর স্বাধীনতা শুধু একটি মানবাধিকার নয়—
এটি সমাজের উৎকর্ষের অপরিহার্য শর্ত।

মৌলবাদ নারীর অস্তিত্বকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়,
কারণ নারীর স্বাধীনতা তার রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য হুমকি।

একটি সমাজ যত বেশি মৌলবাদী হয়—
তত বেশি নারী হয় নীরব, নির্যাতিত এবং পিছিয়ে থাকা একটি জনগোষ্ঠী।

কিন্তু নারী যদি উঠে দাঁড়ায়, কলম ধরে, কণ্ঠ তোলে—
তবে মৌলবাদ টিকে থাকতে পারে না।
এ কারণেই নারীর লড়াই শুধু তার নিজের জন্য নয়—
এটি সমাজকে মৌলবাদের হাত থেকে মুক্ত করার লড়াই।

নারীর মুক্তি মানে সমাজের মুক্তি।
নারীর কণ্ঠ মানে ভবিষ্যতের কণ্ঠ।

এবং মৌলবাদ যতই ভয় পাক—
এই কণ্ঠ থামানো আর কোনোদিনই সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *