বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

December 1, 2025 3:29 am
December 1, 2025 3:29 am

শহরের অদৃশ্য খাঁচা: তরুণীর স্বাধীনতার গল্প ও আমাদের নীরব দায়

রিমি, মিতা, নীরা—নামগুলো আলাদা, গল্পগুলোও আলাদা। কিন্তু তাদের অভিজ্ঞতা এক জায়গায় এসে মিলে যায়—শহরের পরিপাটি অট্টালিকার নিচে, সোশ্যাল মিডিয়ার চকচকে ফিল্টারের আড়ালে, আমরা যে অদৃশ্য খাঁচা তৈরি করেছি, তার ভেতরেই তারা প্রতিদিন বেঁচে থাকে। এই খাঁচা কেউ ইট–বালু দিয়ে বানায় না; এটা তৈরি হয় চোখ ফিরিয়ে নেওয়া এক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে, নীরবতায় অভ্যস্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাস দিয়ে, আর ন্যায়ের বদলে মানিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতিতে পুষ্ট হয়ে।

ঢাকার যে অংশে আমি থাকি, সেখানে সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাঁটলে একটা স্থিরতা দেখা যায়। কিন্তু সেই স্থিরতার মধ্যেও ভেসে ওঠে দূরের চায়না রেস্টুরেন্টের আলো, স্যালুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরদের ভিড়, আর ফ্ল্যাটবাড়ির জানালায় টিভির আলো। এসবই যেন শহরের নিয়ন্ত্রিত ব্যস্ততা। এই ব্যস্ততার মধ্যে যে জীবনগুলো নিঃশব্দে ভেঙে যায়, তাদের গল্পই সমাজের সবচেয়ে কম আলোচিত অংশ।

রিমিকে আমি প্রথম দেখি একটি ছোট ক্যাফেতে, যেখানে সে তিন মাস ধরে আংশিক সময় কাজ করছিল। বয়স প্রায় ২০–২২। শহরে এসেছিল পড়াশোনার স্বপ্ন নিয়ে, আর সঙ্গে ছিল পরিবারের আর্থিক চাপ। প্রথম দিনেই বলেছিল—‘আপুরা, ঢাকা একটা জঙ্গল। মানিয়ে নিতে শেখাই বড় যুদ্ধ।’ কথাটা তখন খুব সাধারণ মনে হয়েছিল, কিন্তু পরের কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে বুঝিয়ে দেয়—সে কতো বড় সত্য বলেছিল।

এক রাতে ক্যাফে বন্ধ হওয়ার পর সে আমাদের সঙ্গে কাছের রিকশাস্ট্যান্ড পর্যন্ত হাঁটছিল। হঠাৎ সে বলে উঠল, “আপু, আমার বাসার কাছে কয়েকজন ছেলে দুই–তিন দিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। ফোন দেয়, ফলো করে। মালিককে বললে বলছে—নিজের মতো সামলাতে। আমি ভয় পাই।”
তার মুখে ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ছিল অভ্যস্ততার গন্ধ। এই শহরে নিরাপত্তাহীনতা যেন এতটাই স্বাভাবিক যে মেয়েরা আর অভিযোগ করেও ক্লান্ত। কেউ কেউ তো করে না, কারণ জানে, বদলানোর কিছু নেই।

আমরা সবাই তাকে বলেছিলাম—প্রতিদিন অন্য রাস্তা দিয়ে যেও, আত্মরক্ষার স্প্রে রাখো, প্রয়োজন হলে থানায় যেও। কিন্তু রিমি হেসে বলেছিল—“আপুরা, আমার ভয়টা রাস্তায় না। ভয়টা মানুষের দৃষ্টিতে।”

আমি সেদিন বুঝেছিলাম—নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বড় উৎস আসলে ভয় দেখানো না, বরং সমাজের ক্রমাগত বিচার।

নীরা, আরেক তরুণী, যার ক্লাসমেটরা তাকে অপমান করত তার পোশাক, চুল, এমনকি উচ্চারণ নিয়েও। সে একদিন নিঃশব্দে কলেজ বাদ দিয়ে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ভর্তি হয়। কারণ জিজ্ঞাসা করলে বলেছিল—“আমি কারও চোখের সামনে শ্বাস নিতে পারি না।”
একজন ১৯ বছরের তরুণী যদি শহরের ব্যস্ততায় দাঁড়িয়ে ‘শ্বাস নিতে পারি না’ বলে, তাহলে আমাদের উন্নয়ন, নীতি, আলোচনার মাঝেও কিছু একটা গভীরভাবে ভেঙে যাচ্ছে।

সামাজিক চাপকে আমরা অনেক সময় হালকা করে দেখি। কিন্তু এ চাপ দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরকে নিয়ন্ত্রণ করে। মিতার বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল কয়েক মাস আগে। ছেলের পরিবার জানতে পেরে থাকে—মিতা একসময় একটি মানবাধিকার সংগঠনে ইন্টার্নশিপ করেছিল, যেখানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ে সচেতনতা ক্যাম্পেইন করত। এতে তারা সন্দেহ পোষণ করেছিল—“মেয়েটি বেশি আধুনিক না তো?”
‘বেশি আধুনিক’ শব্দটাই সমাজের ভয়কে বহন করে। যেন নারীর সচেতনতা, স্বাধীনতা ও সাহস সমাজের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

মিতা খুব শান্তভাবে বলেছিল—“আন্টি, আধুনিক হওয়া কি ভুল?”
উত্তরে আন্টি বলেছিলেন—“না, ভুল না। কিন্তু এসব বিষয়ে কাজ করলে বউয়ের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।”

এটাই আমাদের সমাজের অদৃশ্য খাঁচা—মানিয়ে নেওয়া। মানিয়ে নেওয়া যেন নারীর জন্মগত দায়িত্ব। ঘর, পরিবার, রাস্তাঘাট, চাকরি—সব জায়গায় নারীকে মানিয়ে নিতে হবে। এতটাই মানিয়ে নিতে হবে যে সে নিজের স্বাধীনতার অস্তিত্বই ভুলে যায়।

তবে এই খাঁচা কেবল নারীর ওপরেই তৈরি হয়—এমনটা নয়। শহরের তরুণরাও নীরব এক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। রফিক, এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, আমাকে বলেছিল—তার বন্ধুরা তাকে “বেশি সংবেদনশীল” বলে ঠাট্টা করে কারণ সে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলে। পুরুষের সংবেদনশীলতা এখানে দুর্বলতা, মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা এখানে পরিহাসের বিষয়।
এই সমাজে মানবিক হওয়া যতটা সহজ, সেটিতে দাঁড়িয়ে থাকা ততটাই কঠিন।

আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আমরা বলি—তোমরা সাহসী হও, স্বপ্ন দেখো, এগিয়ে যাও। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা তাদের ঘিরে ফেলি অসংখ্য অঘোষিত নিয়মে, সীমায়, সন্দেহে। পরিবারের প্রত্যাশা, সমাজের দৃষ্টিকোণ, কর্মক্ষেত্রের চাপ—এ সব মিলিয়ে তারা এক নিঃশব্দ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধে অস্ত্র নেই, কিন্তু আছে দমবন্ধ করা নিয়ম।

আমরা প্রায়ই শুনি—বাংলাদেশের তরুণেরা খুব সচেতন, তারা প্রতিবাদ জানাতে জানে, সাহসী। কিন্তু এই সাহসের বাইরেও একটা চাপা ভয় আছে—বিচার হওয়ার ভয়।
এক তরুণী আমাকে বলেছিল, “আপা, সবচেয়ে ভয় লাগে নিজের গল্প কাউকে বলতে। কারণ সবাই শোনে, কিন্তু কেউ বোঝে না।”

মাথার ওপর থাকা এই অদৃশ্য চাপই আমাদের শহরকে একটি বিশাল খাঁচায় পরিণত করে। প্রতিটি খাঁচার রং ভিন্ন—কারও ক্ষেত্রে ধর্মের নামে বিচার, কারও ক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য, কারও ক্ষেত্রে আয়-শিক্ষা-সমাজের অনুচ্চারিত শ্রেণিভেদ। কিন্তু খাঁচার ভেতরের অনুভূতি এক—নীরব শ্বাসরোধ।

সমাধান কী?

আমরা প্রায়ই সমাধান খুঁজতে গিয়ে বড় বড় নীতিমালার কথা বলি—আইন, নিরাপত্তা, দায়িত্ব, প্রশিক্ষণ। এগুলো অবশ্যই দরকারি। কিন্তু সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি অনেক গভীর—আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। সমাজের মানুষ যখন বিচার করার আগে বোঝার চেষ্টা করবে, তখনই প্রথমবারের মতো কেউ তার গল্প বলতে সাহস পাবে।

মানবাধিকার কেবল কিছু ঝকঝকে শব্দ নয়—এটি ব্যক্তির শ্বাস নেওয়ার অধিকার, নিজের মতো বাঁচার অধিকার। শহরের প্রতিটি তরুণ, প্রতিটি তরুণী, প্রতিটি শ্রমিক, প্রতিটি নারী—তারা সবাই একই অধিকার চায়। কেউই চায় না—তাদের জীবনকে কেউ অদৃশ্য খাঁচায় আটকে রাখুক।

আমরা হয়তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেখব—রিমি আজও বাসার ফেরার পথে কয়েকজন অপরিচিতের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে দ্রুত হাঁটছে। নীরা ক্লাসের গেটে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে শ্বাস ঠিক করছে। মিতা এখনও লড়ছে—তার স্বাধীনতার সংজ্ঞা বদলাতে। আর রফিক—তার বন্ধুর ঠাট্টা সয়ে মানবিক থাকতে চেষ্টা করছে।

এই গল্পগুলো শেষ হয়ে যায় না। কারণ খাঁচাগুলো ভাঙা এখনো শুরু হয়নি।

তবে আশার জায়গা আছে। প্রতিদিন নতুন করে কিছু তরুণ-তরুণী এই চাপা নীরবতার বিরুদ্ধে কথা বলছে। সোশ্যাল মিডিয়ায়, ক্যাম্পাসে, অফিসে, পরিবারের টেবিলে। তারা জানে—পরিবর্তন রাতারাতি আসে না। কিন্তু কথা বললেই শুরু হয় সামান্য ফাটল। আর ওই ফাটলই একদিন খাঁচাকে ধসিয়ে দিতে পারে।

সমাজের প্রত্যেক মানুষের ভেতর যদি একটু করে স্পর্শকাতরতা জাগে—একটু করে বোঝার চেষ্টা, বিচার কমানো, শ্রদ্ধা বাড়ানো—তাহলে হয়তো এই শহর একদিন সত্যিকারের মুক্তির জায়গা হতে পারে।
যেখানে একজন তরুণী নিজের ভয় নয়, নিজের স্বপ্ন নিয়ে সামনে হাঁটবে।
যেখানে একজন তরুণ তার অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হবে না।
যেখানে মানবাধিকার কোনো স্লোগান নয়—দৈনন্দিন সত্য হবে।

শহর তখন অদৃশ্য খাঁচা নয়—হয়ে উঠবে এক বিস্তৃত খোলা আকাশ।

আর সেই আকাশের নিচেই আমরা শ্বাস নেব, মুক্তভাবে, সমানভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *