বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 2:13 am
January 16, 2026 2:13 am

যে সমাজ নারীর পথ রুদ্ধ করে, সে সমাজই পিছিয়ে পড়ে—তবু নীরব পুরুষ কেন?

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

বাংলাদেশের সর্বশেষ জনশুমারি বলছে, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি—৫১ শতাংশ—নারী। সংখ্যার বিচারে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন; নারীর সংখ্যা বাড়লেও তাঁদের অবস্থান ও অধিকার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রধানত পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। নারীর পোশাক, চলাফেরা, কর্মক্ষেত্র, মতপ্রকাশ—সব ক্ষেত্রে আজও সমাজে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার প্রভাব স্পষ্ট।
সংখ্যা বৃদ্ধি কোনো জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা বা মর্যাদা নিশ্চিত করে না—এ সত্য বাংলাদেশে নারীর অবস্থানে সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত। পরিবারের ভেতর থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত বহু সিদ্ধান্তে নারী অংশগ্রহণ কম, অথচ সেই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব নারীর জীবনে সর্বাধিক। এটি কেবল সামাজিক বৈষম্যের প্রতিফলন নয়; এটি ক্ষমতার অসম বণ্টনেরও ফল।
সাম্প্রতিক সময়ে নারীর কর্মঘণ্টা সীমিত করার প্রস্তাবসহ বিভিন্ন মন্তব্য ও সিদ্ধান্তে নারীর স্বাধীনতা সীমিত করার প্রবণতা আবার আলোচনায় এসেছে। নারীরা বিভিন্ন মাধ্যমে এ ধরনের উচ্চারণের বিরোধিতা করলেও পুরুষদের একটি বড় অংশ নীরব থেকেছে। নারীর অধিকারের প্রশ্নে পুরুষের নীরবতা নতুন নয়। বিশেষ করে সহিংসতা, বৈষম্য বা বৈধ অধিকার সংকোচনের ঘটনায় নারী-পুরুষের প্রতিক্রিয়ার বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে। নারীর ইস্যু যেন শুধু নারীরই দায়—এমন ভুল ধারণার কারণেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে না।
বিবেচ্য বিষয় হলো—নারীর অধিকার ক্ষুণ্ন হলে এর প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরেই পড়ে। অর্থনীতি, পরিবার, জনস্বাস্থ্য, শ্রমবাজার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৪ শতাংশ নারী হওয়ার পরও তাঁদের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কর্মবাজারে নারীর অংশগ্রহণ কমে গেলে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে, দারিদ্র্য বাড়বে, পরিবারে আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পাবে—এ ক্ষতি নারী-পুরুষ উভয়েরই।
রাজনীতিতেও নারীর প্রতিনিধিত্ব সীমিত। সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যাগতভাবে থাকলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর প্রভাব খুবই কম। নারী ভোটার সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাঁদের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করেন প্রধানত পুরুষ রাজনীতিকেরা। ফল হিসেবে সিদ্ধান্তগুলো নারী-স্বার্থের প্রশ্নে প্রায়ই একপেশে থেকে যায়।
নারীবাদ নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তিও সমস্যার একটি অংশ। নারীবাদ পুরুষবিরোধী নয়; এটি সমতা ও ন্যায়ের প্রশ্ন। অথচ এ শব্দকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীর অধিকার প্রশ্নকে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কে পরিণত করা হয়। এর ফলে নারী-পুরুষ উভয়ের যৌথ আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আড়ালে পড়ে যায়।

নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতার পেছনে সামাজিক মানসিকতার গভীর শিকড় রয়েছে। সম্মান, নিরাপত্তা, ধর্মীয় মূল্যবোধ—এসবকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে নারীর স্বাধীনতাকে সীমিত করা হয়। অথচ বাস্তবতা হলো—নারীর স্বাধীনতা সীমিত করা মানে সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত করা।
এ কারণে নারীর অধিকার দাবি কেবল নারীর দাবি হিসেবে নয়, সামাজিক দাবি হিসেবে বিবেচিত হওয়া জরুরি। পরিবারে সমতা, শিক্ষায় জেন্ডার সংবেদনশীলতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, রাজনীতিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ—এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষত পুরুষের অংশগ্রহণ ছাড়া নারীর অধিকারের আন্দোলন কার্যকর হতে পারে না।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত উদ্যোগই সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। নারীর বিরুদ্ধে যেকোনো বৈষম্য বা সহিংসতা প্রতিরোধ করা সমাজের প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। উন্নয়নের স্বার্থেই আজ প্রয়োজন নারীর অধিকারকে সমগ্র সমাজের দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তখনই, যখন নারী কোনো বিশেষ শ্রেণি নয়—জাতির সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হবেন। নারীর দাবি সবার দাবি হয়ে উঠলে তবেই একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমতাপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *