মানবাধিকার শব্দটি আজ দেশে এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে, মনে হয় এটি কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বিলাসী চিন্তার নাম; যেন সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কম, রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে সম্পর্ক বেশি। অথচ বাস্তবে সত্য হলো—মানবাধিকার হলো নাগরিকত্বের মেরুদণ্ড, রাষ্ট্রের নৈতিকতার ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এই ভিত্তি যতবারই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, ততবারই রাষ্ট্র তার ভুল ঢাকতে নতুন কৌশল আবিষ্কার করে—কখনো দেশপ্রেম দেখিয়ে, কখনো ধর্মীয় আবেগ উসকে দিয়ে, কখনো আবার আইনের নামে দমনের পথ তৈরি করে।
সমস্যা হলো, রাষ্ট্র আজ নাগরিককে শোনা নয়; তাকে চুপ করানোকে দক্ষতা মনে করছে। এই চুপ করানোর রাজনীতিই আজ মানবাধিকার সংকটের অন্যতম উৎস।
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গল্পগুলো এত বেশি যে মানুষ এখন আর অবাক হয় না। বরং আমাদের সমাজে এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে—যেন আমরা বুঝেই নিয়েছি, “এটাই হয়তো স্বাভাবিক।” নির্যাতন, মামলা, গুম, হামলা —সবই যেন আমাদের দৈনন্দিন অভিধানের অংশ হয়ে গেছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, মানুষ এখন ন্যায়বিচার নিয়ে আশা ছাড়তে শিখেছে। তারা জানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়ার মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। রাষ্ট্র যখন বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন সে নাগরিকের প্রতি নৈতিক দায়বদ্ধতা হারায়। আর সেই হারানো জায়গাটি পুরে ভরাট হয় ভয়, নীরবতা আর আত্মস censored-এ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো—কিন্তু রাষ্ট্র দুর্বলদের বদলে শক্তিশালীদের দিকে ঝুঁকেছে। আমাদের সমাজে এখন এমন এক শক্তির গঠন তৈরি হয়েছে, যেখানে ক্ষমতার কাছে অধিকার পরাজিত হয়, আর সত্য হেরে যায় সুবিধার কাছে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার সংকট বোঝার জন্য একবার চারদিকে তাকালেই যথেষ্ট। শ্রমিক যখন ন্যায্য মজুরি দাবি করে, তাকে বলা হয়—”উস্কানি দিচ্ছে”। কৃষক যখন ফসলের দাম চাই, তার দিকে তাকানো হয় সন্দেহের চোখে। শিক্ষক যখন হয়রানির প্রতিবাদ করে, তাকে “শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী” বলে আখ্যা দেওয়া হয়। সাংবাদিক যখন দুর্নীতি প্রকাশ করে, তার বিরুদ্ধে মামলা, হয়রানি, হুমকি—সবই নেমে আসে।
সব মিলিয়ে আমরা যে পরিস্থিতিতে বাস করছি তা হলো এক নিয়ন্ত্রিত নীরবতার সমাজ, যেখানে কথা বললে তুমি বিপদে পড়তে পারো, আর চুপ থাকলে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে ফেলো।
রাষ্ট্র এখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ‘শর্তাধীন অধিকার’ হিসেবে বিবেচনা করে। অর্থাৎ তুমি কথা বলতে পারবে, যদি সেই কথা রাষ্ট্র বা ক্ষমতার বিরুদ্ধে না যায়। অথচ প্রকৃত স্বাধীনতা হলো সেই যা রাষ্ট্রের সমালোচনার অধিকারও নিশ্চিত করে।
সমস্যা হলো, রাষ্ট্র সমালোচনাকে শত্রুতা মনে করে, আর প্রশ্নকে ষড়যন্ত্র।
ফলে এক ধরনের অদৃশ্য ভয় মানুষের ভিতর ছড়িয়ে গেছে। এ ভয় কখনো আসে আইনের মাধ্যমে, কখনো আসে নজরদারির মাধ্যমে, কখনো আসে ধর্মীয় উগ্রতার মাধ্যমে। কিন্তু ভয় যেখান থেকেই আসুক, এটি নাগরিকের কণ্ঠরোধ করে, সমাজের চিন্তাশক্তিকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রতা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছে। ধর্ম আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ড—এই কথাটি সত্য। কিন্তু সেই ধর্মকে যখন রাজনৈতিক ব্যবহারের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা অধিকারবিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়।
আজ ধর্মের নামে মানুষ খুন হয়, বাড়ি পোড়ানো হয়, মেয়ে ধর্ষণের ঘটনাও ন্যায্যতা পায়। অথচ রাষ্ট্র অনেক সময়ই এই উগ্রতার বিরুদ্ধে কঠোর হতে চায় না। কারণ ভোট, ক্ষমতা আর সামাজিক চাপ—এই তিনটি শক্তি মিলে রাষ্ট্রকে অন্ধ করে রেখেছে।
যখন সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী মানুষের ঘর পোড়ানো হয়, যখন হিন্দু–বৌদ্ধ পরিবারের ওপর হামলা হয়, যখন একজন ভিন্নমতের মানুষকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে টার্গেট করা হয়—তখন রাষ্ট্রের ভূমিকা হয় দায়িত্বহীন নীরবতার।
ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষার নামে মানবাধিকারকে গলা টিপে হত্যা করা হয়। পূর্ণাঙ্গ তদন্তের বদলে, প্রকৃত দায়ীদের বিচারের বদলে, রাষ্ট্র বরং সাধারণ নাগরিককে বলে—”চুপ থাকো, পরিবেশ নষ্ট কোরো না!”
এই ‘পরিবেশ’ আসলে কার জন্য?
মানুষের জন্য, নাকি উগ্রতার জন্য?
শুধু ধর্ম নয়—সামাজিক কাঠামোও মানবাধিকারবিরোধী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
তুমি যদি ভিন্নভাবে চিন্তা করো, তুমি যদি যৌন বা লিঙ্গ পরিচয়ে প্রচলিত কাঠামোকে প্রশ্ন করো, তুমি যদি নারীর অধিকার বা LGBTQ+ মানুষের অধিকারের কথা বলো—তাহলে সামাজিক হামলা এমনভাবে আসে যেন তুমি অপরাধী।
আমাদের সমাজে যৌনতা, প্রেম, শরীর—এগুলো নিয়ে কথা বলা এখনও ‘পাপ’।
ফলে যৌন সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা হয়—”বাংলাদেশের সংস্কৃতি নষ্ট হচ্ছে!”
কিন্তু সংস্কৃতি কখনোই মানুষের ওপর নির্যাতনকে বৈধতা দেয় না।
যে সংস্কৃতি মানুষকে অমানুষ বানাতে চায়, সেটি ঐতিহ্য নয়—এটি ভয় আর অজ্ঞতার মিশ্রণ।
রাষ্ট্র যখন যৌন সংখ্যালঘু মানুষের পরিচয়কে স্বীকৃতি না দিয়ে বরং তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে, তখন এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে নির্মম রূপ হয়ে ওঠে।
মানুষ হিসেবে জন্ম নিয়ে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে না পারা—এটাই অধিকারহরণের গভীরতম আঘাত।
রাষ্ট্রের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হলো বিচারহীনতা।
গুম, ক্রসফায়ার, নির্যাতন—এগুলো এখন আমাদের সমাজে এমন স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে নতুন কোনো ঘটনা ঘটলে মানুষ আর বিস্মিত হয় না।
এই উদাসীনতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এটি রাষ্ট্রকে বলে দেয়—”মানুষ আর প্রশ্ন করছে না, তাই আমরা যা খুশি করতে পারি।”
এভাবে ধীরে ধীরে বিচারহীনতা রাষ্ট্রের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়।
শুধু রাজনৈতিক বিরোধী নয়—সাধারণ মানুষের প্রতিও এই ‘বিচারহীনতা’ সমানভাবে প্রযোজ্য।
মনে রাখা জরুরি—বিচারহীন রাষ্ট্র কখনোই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল থাকতে পারে না।
মানবাধিকার সংকটের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো ‘স্বাভাবিকায়ন’।
যখন মানুষ ভেবে নেয় কোনো অন্যায়ই বদলাবে না, তখন তারা নীরব হয়ে যায়।
এই নীরবতাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রিয় অস্ত্র।
কারণ নীরব মানুষ প্রশ্ন করে না, দাবি করে না, প্রতিরোধ করে না।
এজন্য রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ভয় পায় এমন মানুষকে, যে কথা বলে।
যে প্রতিদিন ছোট ছোট অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
যে বলে—“ভয়কে ভয় করো না।”
রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তাই মানবাধিকারের সংগ্রাম নয়—বরং মানুষের ভেতরের ভয়জয়।
মানুষ যদি ভয়ভাঙা শিখে যায়, তাহলে কোনো কর্তৃত্ববাদ দীর্ঘদিন টিকতে পারে না।
শেষ কথা—মানবাধিকার কখনোই রাষ্ট্রের দান নয়, এটি মানুষের জন্মগত অধিকার।
রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে—অধিকার রক্ষার মাধ্যমে তার শক্তি বাড়ে, দমন করে নয়।
একটি সমাজ তখনই সভ্য হয় যখন তার দুর্বলতম মানুষটিও ন্যায়, নিরাপত্তা ও মর্যাদা পায়।
বাংলাদেশ যদি সত্যিই এগোতে চায়, তবে তাকে প্রথমে মানবাধিকারের দিকে ফিরে তাকাতে হবে।
রাস্তায় দাঁড়ানো মানুষের ভয়, ঘরে বসে থাকা নারীর নিরাপত্তাহীনতা, ভিন্নমতের মানুষের শঙ্কা—এইসবই রাষ্ট্রের দায়।
মানুষের অধিকার রক্ষা করা কোনো NGO-র কাজ নয়—এটা রাষ্ট্রের মৌলিক কর্তব্য।
মানুষকে ভয় দেখিয়ে নয়, স্বাধীনতা দিয়ে রাষ্ট্র বড় হয়।
আর আমরা যারা লিখি, প্রশ্ন তুলি, কথা বলি—আমরা চাই দেশের উন্নতি হোক ভয়মুক্তির মাধ্যমে, নীরবতার মাধ্যমে নয়।











