২১শ শতকের এই প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবী মানবসভ্যতাকে দিয়েছে অভূতপূর্ব সুযোগ। জ্ঞান, তথ্য, যোগাযোগ— সবকিছু আজ হাতের মুঠোয়। কয়েকটি ক্লিকেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া যায়, এক মুহূর্তে ছড়িয়ে দেওয়া যায় যেকোনো মতামত বা অভিজ্ঞতা। কিন্তু একইসঙ্গে প্রযুক্তি যে এক গভীর সংকটও তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ডিজিটাল যুগের এই সুবিধাগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন কিছু চ্যালেঞ্জ, যেগুলো নাগরিকের নিরাপত্তা, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আজকের এই লেখায় সেই সংকট—ডিজিটাল যুগে নাগরিক নিরাপত্তার বহুমাত্রিক হুমকি— নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হবে। কেন এই সংকট বাড়ছে, কারা ঝুঁকির মধ্যে আছে, কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে এবং রাষ্ট্র–সমাজ–মানুষ—কোন দিকে এগোচ্ছে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কী?
ডিজিটাল পরিবেশ: সুযোগের ভেতর লুকানো ঝুঁকি
আমরা যখন ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ বলি, অনেকেই মনে করেন এটি কেবল প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা—পাসওয়ার্ড, ডিভাইস প্রোটেকশন, সোশ্যাল মিডিয়া গোপনীয়তা ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক গভীর।
ডিজিটাল নিরাপত্তা মানে—
- নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা
- মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষা
- অনলাইন হয়রানি ও সহিংসতা থেকে মুক্তি
- রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় নজরদারি থেকে সুরক্ষা
- ঘৃণাচর্চা ও উগ্রবাদের টার্গেট থেকে মুক্ত থাকা
অর্থাৎ ডিজিটাল স্পেস আজ শুধু প্রযুক্তি নয়, বরং মানবাধিকার চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। এবং এখানেই সংকট সবচেয়ে বেশি।
নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার: নাগরিক স্বাধীনতার অদৃশ্য শৃঙ্খল
আমরা এখন এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিদিন আমাদের চারপাশে একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করছে।
CCTV, ডেটা অ্যানালিটিকস, ফেসিয়াল রিকগনিশন, সাইবার ট্র্যাকিং—সবকিছুই নাগরিকের উপস্থিতিকে ‘ডেটা’তে রূপান্তর করছে।
কয়েকটি উদাহরণ—
- আপনার প্রতিটি অনলাইন সার্চ একটি ডেটা
- কার সঙ্গে কথা বলছেন, কতক্ষণ কথা বলছেন—সবই ডেটা
- কোথায় যাচ্ছেন, কোন রাস্তায় যাচ্ছেন—লোকেশন ডেটা
- কী পছন্দ করছেন—বায়বীয় অ্যালগরিদম দ্বারা বিশ্লেষিত ডেটা
এই সমস্ত তথ্য বিশাল ভাণ্ডারে জমা হচ্ছে, যেখানে নাগরিকের স্পষ্ট সম্মতি নেই, নজরদারি থেকে মুক্তির কোনো পথ নেই, এবং বড় সমস্যা হলো—এ তথ্য কীভাবে, কার কাছে, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে, সাধারণ মানুষের সে সম্পর্কে ধারণাও নেই।
ডিজিটাল যুগে তথ্যই শক্তি। আর যাদের কাছে এই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ, তারা চাইলে নাগরিক আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে, মতামতকে পরিচালিত করতে পারে, এমনকি গণতন্ত্রের সিদ্ধান্তকেও বদলে দিতে পারে।
সাইবার অপরাধ: অনলাইন স্পেসের নীরব হিংস্রতা
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যত ব্যাপক হচ্ছে, সাইবার অপরাধ ততই বিস্তৃত ও জটিল হচ্ছে।
এখন অপরাধ শুধু রাস্তায় নয়, ঘটছে স্মার্টফোনের মাঝেই।
কিছু সাধারণ সাইবার অপরাধ—
- ফিশিং ও প্রতারণা
- ব্যক্তিগত ছবি/ভিডিও চুরি
- ডিপফেক
- ফেসবুক/ইমেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক
- আর্থিক প্রতারণা
- সাইবার বুলিং
- অনলাইন হয়রানি
- পরিচয় বিকৃতি
বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণা বলছে—নারীরা অনলাইনে সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার। তাদের ছবি বিকৃত করা থেকে শুরু করে ট্রোল, গালাগাল, হুমকি, ব্ল্যাকমেইল—সবকিছুই আজ রীতিমতো ‘স্বাভাবিক অপরাধে’ পরিণত হয়েছে।
এ সমস্যা শুধু মানসিক চাপই তৈরি করে না;
অনেকেই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আত্মবিশ্বাস হারানো, ট্রমা এমনকি আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে।
ভুয়া তথ্য ও প্রচারণা: মতামতের ওপর আঘাত
ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে ভয়াবহ যে চ্যালেঞ্জটি দেখা দিয়েছে, তা হলো ভুয়া তথ্য বা মিথ্যা প্রচারণা।
আজ একটি ভুয়া পোস্ট কয়েক মিনিটেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
এর ফলে—
- রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ে
- ঘৃণা ছড়ায়
- সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের ওপর নির্যাতন বাড়ে
- জনগণ ভুল পথে পরিচালিত হয়
- জনস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে
ভুয়া তথ্য এখন শুধু সামাজিক ক্ষতির কারণ নয়; এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি।
অ্যালগরিদম ও সামাজিক মাধ্যম: মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণের অদৃশ্য খেলাঘর
আজকের মানুষ নিজে তথ্য খুঁজে বের করে না; বরং তথ্য এসে মানুষকে খুঁজে নেয়।
ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, এক্স—এসব প্ল্যাটফর্ম নির্ধারণ করে দেয় মানুষ কী দেখবে, কী ভাববে, কী ভালো লাগবে।
অ্যালগরিদমের কাজ হলো—
- আপনাকে স্ক্রিনে ধরে রাখা
- আপনাকে আরও বেশি সময় ব্যয় করানো
- আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা
- আপনার রাজনৈতিক মত প্রভাবিত করা
এই অ্যালগরিদমই ঘৃণা, সহিংসতা ও চরমপন্থী মতবাদের প্রচারণাকে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়।
কারণ ‘নেতিবাচকতা’ সবচেয়ে দ্রুত মানুষের মনোযোগ কাড়ে।
অর্থাৎ প্রযুক্তি এখানে কোনো নিরপেক্ষ মাধ্যম নয়—বরং একটি শক্তিশালী প্রভাবক।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর ডিজিটাল সহিংসতার প্রভাব
ডিজিটাল সহিংসতা সব মানুষের ওপর একইভাবে প্রভাব ফেলে না।
প্রান্তিক মানুষ—নারী, শিশু, সংখ্যালঘু, ভিন্নমতাবলম্বী, মানবাধিকার কর্মী—তাদের ওপর এর প্রভাব বহুগুণ বেশি।
উদাহরণ—
- মতপ্রকাশে উৎসাহী তরুণদের হুমকি দেওয়া
- ভিন্ন ধর্ম/জাতি/লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষকে টার্গেট করা
- নারীদের ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া
- মানবাধিকার কর্মীদের ওপর সমন্বিত অনলাইন আক্রমণ
এসব আক্রমণ শুধু ব্যক্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না;
সমাজে ভয়, নীরবতা এবং আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি তৈরি করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব: প্রযুক্তি নয়, মানবাধিকারকে অগ্রাধিকার
ডিজিটাল নিরাপত্তা রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বের অংশ।
কিন্তু অনেক দেশে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ বলতে কেবল আইন প্রণয়ন বোঝানো হয়, যা অনেকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করতে ব্যবহার করে।
যেখানে প্রয়োজন—
- স্বচ্ছ তদন্ত
- সাইবার অপরাধ দমনে বিশেষায়িত ইউনিট
- নাগরিকের তথ্য সুরক্ষার আইন
- প্ল্যাটফর্ম কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি
- ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সচেতনতা
- ভুক্তভোগীদের নিরাপদ রিপোর্টিং ব্যবস্থা
সত্যিকারের ডিজিটাল নিরাপত্তা হচ্ছে—
মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, ভয় তৈরি করা নয়।
পরিবার ও সমাজের করণীয়
এই চ্যালেঞ্জ শুধু আইন দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়;
সমাজ ও পরিবারকেও ভূমিকা রাখতে হবে।
- সন্তানদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা
- নারী ও তরুণদের আত্মবিশ্বাসী করা
- অনলাইন হয়রানিকে উপহাস না করে গুরুত্ব দেওয়া
- ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করা
- সংলাপ ও সহমর্মিতার পরিবেশ তৈরি
- ঘৃণাচর্চার বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান নেওয়া
কারণ ডিজিটাল সহিংসতা যতটা প্রযুক্তিগত, তার থেকে বেশি সামাজিক।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিরাপত্তা: কিছু জরুরি কৌশল
- সব অ্যাকাউন্টে দুই ধাপ যাচাইকরণ (2FA)
- শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড
- সোশ্যাল মিডিয়ার প্রাইভেসি সেটিংস নিয়মিত রিভিউ
- অচেনা লিংকে ক্লিক না করা
- সন্দেহজনক বার্তা/প্রোফাইল ব্লক ও রিপোর্ট
- প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার না করা
- নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
ব্যক্তিগত সুরক্ষা বড় সমাধান নয়, কিন্তু এটি প্রথম প্রতিরক্ষা।
ভবিষ্যৎ: প্রযুক্তি কি স্বাধীনতা দেবে নাকি নিয়ন্ত্রণ?
ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—
প্রযুক্তি আমাদের স্বাধীনতা বাড়াবে নাকি নিয়ন্ত্রণ করবে?
আজ আমরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছি, যে নীতি প্রণয়ন করছি, যে আচরণকে উৎসাহ দিচ্ছি—
সবকিছুই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন ধরনের ডিজিটাল পৃথিবীতে বড় হবে।
আমাদের সামনে দুটি পথ—
একটি হলো দমন, নজরদারি ও ভয়ের পথ।
অন্যটি হলো মানবাধিকার, স্বাধীনতা, সম্মান ও নিরাপত্তার পথ।
কোন পথটি আমরা বেছে নেব—
তা নির্ভর করছে রাষ্ট্র, সমাজ এবং প্রতিটি মানুষের সচেতনতার ওপর।
উপসংহার: মানুষের মর্যাদাই ডিজিটাল নিরাপত্তার মূলভিত্তি
প্রযুক্তি যত শক্তিশালী হচ্ছে, মানুষের মর্যাদার প্রশ্ন তত জটিল হয়ে উঠছে।
কিন্তু একটি সত্য কখনো বদলায় না—
মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া কোনো ডিজিটাল উন্নয়নই টেকসই নয়।
ডিজিটাল যুগে নাগরিক নিরাপত্তা মানে—
- মানুষের ভয়মুক্তভাবে বাঁচার অধিকার
- নিজের মত প্রকাশের অধিকার
- নিজের পরিচয়, ছবি ও তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ
- সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার
প্রযুক্তি মানুষের সেবা করবে—মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।
এ বিশ্বাস থেকেই আমাদের সামনে এগোতে হবে।
ডিজিটাল যুগে মানবমর্যাদা রক্ষা শুধু নীতি নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
— সাদিয়া শারমিন আয়শা
গবেষক, মানবাধিকার বিষয়ক বিশ্লেষক ও লেখক











