বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নির্মম সত্য অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত—এখানে সরকার বদলায়, ক্ষমতার পোশাক বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের আচরণ বদলায় না। শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর মানুষ ভেবেছিল দেশে মানবাধিকারের নতুন ভোর দেখা যাবে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর অনেকের আশা ছিল—এবার হয়তো গুমের দুঃস্বপ্ন শেষ হবে, পুলিশি দমন কমবে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পাহাড় ভাঙবে, এবং রাষ্ট্র সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আচরণ করবে। কিন্তু দেড় বছরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে গেছে—রাষ্ট্র তার পুরোনো রূপটিই আগলে রেখেছে। তাই মানুষ আজ ক্ষোভ নিয়ে বলে—যে যায় লঙ্কায়, সে-ই রাবণ হয়ে ফিরে আসে।
স্বীকার করতেই হবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গুম বন্ধ হয়েছে। বাংলাদেশে এটি নজিরবিহীন ইতিবাচক অর্জন। শেখ হাসিনার শেষ দশকে গুম এমন এক আতঙ্কে পরিণত হয়েছিল যে পরিবারগুলো রাত হলেই ভয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকত। গুমবিরোধী আইন করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—মানবাধিকার কি শুধু গুম বন্ধ হলেই রক্ষা হয়? রাষ্ট্র কি নাগরিককে সুরক্ষা দিতে পারে শুধুমাত্র কোন একটি নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধ কমিয়ে? বাস্তবতা হলো—গুম বন্ধ হলেও রাষ্ট্রীয় দমননীতি বন্ধ হয়নি। সাদাপোশাকে গ্রেপ্তার, রাতের অন্ধকারে আটক, নির্দিষ্ট সময়ের আগে আদালতে হাজির না করা—এসব ঘটনা আগের মতোই চলছে। মডেল মেঘনা আলমকে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তার করে আটক রেখেছিল, তা যে আইনসংগত ছিল না—এ কথা স্বীকার করেছিলেন সরকারের আইন উপদেষ্টাই। এই স্বীকারোক্তিই প্রমাণ করে রাষ্ট্রের ‘নতুন মুখ’ আসলেও তার ‘পুরোনো আচরণ’ আগের মতোই টিকে আছে।
ক্রসফায়ারের ভুতও এখনো ঘোরাফেরা করছে। যদিও এখন আর সেই শব্দ ব্যবহার করা হয় না, কিন্তু বাস্তবতায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, আবার মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন বলছে সংখ্যাটি ৬০। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি মাসেই চারটির বেশি মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এমনভাবে মারা গেছে, যার কোনও বিচার নেই, জবাবদিহি নেই, এমনকি সঠিক তদন্তও নেই। অতীতে শেখ হাসিনার আমলে এসব হত্যাকাণ্ডকে ‘এনকাউন্টার’ বা ‘ক্রসফায়ার’ বলে চালানো হতো। এখন নতুন নামে হোক কিংবা নামহীনভাবে—মূল সত্য একটাই: রাষ্ট্র এখনো হত্যা করে, আর তার দায় নেয় না। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন যথার্থই বলেছেন—এ ক্ষেত্রে অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রাণঘাতী গুলির ব্যবহার, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, এবং বাহিনীর আচরণে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো মব-সহিংসতার ভয়াবহ বিস্তার। গত দশ মাসে মব-সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৪০ জনের মৃত্যু—এটা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটা রাষ্ট্রের নীরব ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষকে রটনা, গুজব, বা ছোটখাটো বিরোধকে কেন্দ্র করে দল বেঁধে হত্যা করা হচ্ছে। বাড়িঘর ভাঙচুর, মাজার ও দরগাহে হামলা, ধর্মীয় উসকানি, মেয়েদের ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেওয়া—এসব ঘটনা প্রমাণ করে মব এখন কেবল সহিংস নয়, তারা রাষ্ট্রের বিকল্প কর্তৃত্বে পরিণত হচ্ছে। এবং রাষ্ট্র সেই মবকে থামানোর বদলে নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে আছে। লেখক ফিরোজ আহমদের কথায়—রাষ্ট্রের ভেতর এমন একটি শক্তিশালী অংশ আছে যারা এই দঙ্গলবাজদের প্রতি অদ্ভুত সহমর্মিতা অনুভব করে। রাষ্ট্রের এই নীরবতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি লজ্জাজনকও। কারণ রাষ্ট্রের কাজ জনগণকে ভয় দেখানো নয়; তাদের সুরক্ষা দেওয়া।
বিরোধী রাজনৈতিক মত দমনের আরেকটি রূপ হলো ঢালাও মামলা। শেখ হাসিনার শাসনে ‘গায়েবি মামলা’ শব্দটি যেমন আলোচিত হয়েছিল, এখন ভিন্নভাবে সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। শত শত লোককে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় নাম-ঠিকানাসহ ঠাঁই দেওয়া হচ্ছে। একজনের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়ে ‘ঢালাওভাবে’ আরো কয়েকশ মানুষের নাম যুক্ত করা হচ্ছে। সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, খেলোয়াড়, অভিনেতা, এমনকি সরকারি চাকরিজীবী—কাউকেই রেহাই দেওয়া হয়নি। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব মামলার বড় অংশের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, এবং স্রেফ সুযোগ নেওয়ার প্রবণতা। আইন উপদেষ্টা এটিকে “বিব্রতকর” বলেছেন ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে এই অপব্যবহার বন্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে মানুষ ভেবেছিল যে যুগের পরিবর্তন ঘটবে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল—শুধু যুগ নয়, কেবল শাসকের মুখই পরিবর্তিত হয়েছে।
আরেকটি বিস্ময়কর বৈপরীত্য হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিসভায় রয়েছেন কয়েকজন সুপরিচিত মানবাধিকারকর্মী। যারা পূর্বে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছিলেন তীব্র কণ্ঠস্বর। আজ যখন তাঁদের সরকারেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে, তখন তারা নীরব। এই নীরবতা শুধু হতাশাজনক নয়, মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে—মানবাধিকারকর্মীরা কি শুধু বিরোধী অবস্থানে থাকলেই সাহসী। ক্ষমতায় আসার পর কি তাদের সেই ভাষা, সেই অবস্থান, সেই নৈতিকতা—সবকিছুই ফিকে হয়ে যায়? যখন মানবাধিকারকর্মীরাই রাষ্ট্রের অন্যায়ের সময়ে চুপ হয়ে যান, তখন সাধারণ মানুষ কাকে বিশ্বাস করবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল—তারা রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনী, পুলিশ, র্যাব—কারও আচরণে মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং কখনো কখনো মনে হয়েছে বাহিনী আগের মতোই দমনমূলক ক্ষমতার অপব্যবহার করছে, কেবল রাজনৈতিক রং বদলে গেছে। ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষকে এখনো দমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত। অনেক ক্ষেত্রে আটক, রিমান্ড, কিংবা মামলার ক্ষেত্রে অতীতের মতোই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।
বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংস্কার। কিন্তু এই সংস্কারের কোনো ছাপ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নেই, আদালতের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, কথাবলার স্বাধীনতা সীমিত, আর মত প্রকাশের অধিকার এখনো ভয়ের মধ্যে বন্দী। গণমাধ্যম এখনো চাপের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুক্ত অভিব্যক্তি ব্যস্ত করে তোলার বদলে নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। ক্ষমতার কেন্দ্রে যারা আছেন, তারা রাষ্ট্রের বাহিনী ও যন্ত্রকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বদলে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন—এ অভিযোগ আজ সর্বত্রই শোনা যায়।
মানবাধিকার অর্থ শুধু গুম বন্ধ হওয়া নয়; শুধু মামলা-মোকদ্দমা কমা নয়; শুধু বাহিনীর সদাচরণ নয়। মানবাধিকার মানে নাগরিকের মর্যাদা। নাগরিক যেন রাষ্ট্রকে ভয় না পায়, বরং রাষ্ট্র তাকে সম্মান দেয়। রাষ্ট্র যেন সুরক্ষার প্রতীক হয়, আতঙ্কের নয়। শেখ হাসিনার পতনের পর মানুষ ভেবেছিল এবার রাষ্ট্রের ভেতরে যে ভয়, যে নিপীড়ন, যে দমন—এসবের পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু আজ মানুষ দেখছে—শাসক বদলালে রাষ্ট্র বদলায় না; বদলায় শুধু ভাষা, মুখ, পোশাক। তার আচরণ আগের মতোই থাকে—স্বৈরাচারী, সন্দেহবাদী এবং দমনমুখী।
বাংলাদেশের মানুষের প্রাপ্য ছিল নতুন ভোর, নতুন আস্থা, নতুন স্বাধীনতার বাতাস। দেড় বছর পর আজ যে বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে, তাতে সেই ভোর এখনো দূরের আলো। অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের অধিকার পুনরুদ্ধার করার বদলে পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্রেরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। মব-সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ঢালাও মামলা, পুলিশি নিপীড়ন—এসব যেন অতীতের ছায়া হয়ে বর্তমানের গায়ে এসে পড়ছে। নাগরিকের অধিকার পুনঃস্থাপন করার বদলে রাষ্ট্র যেন নির্বাক দাঁড়িয়ে দেখছে কীভাবে মানুষের ওপর অত্যাচার বাড়ছে।
মানুষ যে ভেবেছিল—স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর অন্তত রাষ্ট্র তার মুখ বদলাবে—তা হয়নি। তাই আজকের বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ—শুধু সরকারের ব্যর্থতার জন্য নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোগত অসুস্থতার জন্য। যদি এই কাঠামো বদলানো না যায়, যদি বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা না হয়, যদি আইন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা বন্ধ না হয়—তাহলে বাংলাদেশে মানবাধিকার ক্ষয়ে যাবে, মানুষ তার মর্যাদা হারাবে, আর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিকের ওপর দাঁত বের করা এক যন্ত্রে পরিণত হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো রাষ্ট্রকে মানুষের রাষ্ট্র বানানো—ক্ষমতার নয়। কর্তৃত্বের নয়, ন্যায়বিচারের। নিপীড়নের নয়—স্বাধীনতার।
যদি তা না হয়, তাহলে এই দেশে সরকার যতবারই বদলাক, রাষ্ট্র কখনোই বদলাবে না। আর মানুষ বারবারই দেখবে— যে যায় লঙ্কায়—সে-ই রাবণ হয়।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।










