বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 15, 2026 11:13 pm
January 15, 2026 11:13 pm

দীপু দাসের মৃত্যু: আমাদের সমাজ কোথায় দাঁড়াচ্ছে

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

একজন মানুষের মৃত্যু কখনো কখনো শুধু পরিবারের শোক নয়; তা হয়ে ওঠে পুরো সমাজের আয়না। দীপু চন্দ্র দাসের নির্মম হত্যাকাণ্ড সেই আয়নার তীব্র প্রতিফলন। সেখানে আমরা নিজেরাই দেখি—গর্ব নয়, ভয়, লজ্জা, এবং গভীর অসহায়তার প্রতিচ্ছবি।

ময়মনসিংহের ভালুকায় যে দৃশ্য ঘটেছে, তা কোনো সভ্য রাষ্ট্রের নাগরিকের জন্য সহনীয় নয়। একজন মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তারপর দেহ আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এটি একটি নির্মম, অমানবিক সহিংসতা, যা কেবল দেহ নয়—মানবিক বোধকেও জ্বালিয়ে দেয়।

হত্যার পরপরই দেখা যায় পরিচিত চিত্র। গুজব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তেজক ভাষা, এবং সঙ্গে যুক্ত হয় এক শব্দ—‘জনতা’। বলা হয়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ক্ষুব্ধ জনতা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিশ্চিত করেছে—কোনও প্রমাণ নেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে—একজন নিরীহ মানুষ কেন মারা গেল?

উত্তর খুঁজতে হলে চোখ ফেরাতে হবে সমাজের গভীরে। সেখানে আইন দুর্বল, রাষ্ট্র অনুপস্থিত, আর জনতা নিজেকে বিচারক মনে করতে শুরু করেছে। দিপু দাস ছিলেন শ্রমিক নেতা, যিনি ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিক অধিকারের কথা বলেছিলেন। এগুলো সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার, ধর্ম বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে। কিন্তু এই অধিকার দাবি করাই যখন ‘হুমকি’ হয়ে যায়, তখন ক্ষমতার বলয় থেকে প্রতিশোধ আসে—প্রায়ই গোপন বা জনতার হাতে তুলে দিয়ে।

মব কালচার: সমাজের ভয়ঙ্কর ছায়া

এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি মব কালচারের ফলাফল। মব কালচার মানে ব্যক্তির দায় মুছে যায়, সহিংসতা ‘সমষ্টির’ নামে বৈধ হয়ে ওঠে। কেউ দায় নেয় না, কেউ জবাবদিহি করে না। সবাই মিলে করলে অপরাধ আর অপরাধ থাকে না—এমন মানসিকতা তৈরি হয়। দিপু হত্যাকাণ্ডে অন্তত ১৪০–১৫০ জনের একটি জমায়েত দেখা গেছে, যারা আইনকে উপেক্ষা করে নিজেদের বিচারবোধ প্রয়োগ করেছিল।

বাংলাদেশে মব কালচার নতুন নয়, কিন্তু এখন তা আরও সংগঠিত ও সাহসী। গুজবই বিচার, উত্তেজনাই রায়। রাষ্ট্রের নীরবতা সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অন্তত ২৫৮টি সহিংসতার ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২৭টি হত্যাকাণ্ড, ২০টি নারী নির্যাতন এবং ৫৯টি প্রার্থনাস্থলে আক্রমণ। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি ঘটনা মানুষের জীবন, নিরাপত্তা ও মানসিক ক্ষতির প্রমাণ।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা: রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। সংবিধান সবার জন্য সমান অধিকার নিশ্চিত করেছে। বাস্তবে দেখা যায়, সংখ্যালঘু পরিচয় অনেকের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবাধিকার কেবল কাগজে বা বক্তৃতায় আছে; বাস্তবে তা নেই। একজন নাগরিক প্রমাণ ছাড়া নিহত হলে, রাষ্ট্রের মানবাধিকার ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যায়।

এই বাস্তবতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—নাগরিক নিরাপত্তা ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন। সড়ক, সেতু, ভবন সবই থাকলেও যদি মানুষ নিরাপদ না থাকে, তাহলে রাষ্ট্র সভ্য নয়।

তৌহিদী জনতা: ভ্রান্ত ধারণা ও বিপজ্জনক প্রভাব

মব কালচারকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ‘তৌহিদী জনতা’ শব্দটি ব্যবহার হচ্ছে। এটি শুধু ভুল নয়, বরং ভয়ঙ্কর। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা স্পষ্ট: একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা। ধর্ম কখনো সহিংসতার হাতিয়ার হতে পারে না।

‘তৌহিদী জনতা’ নামে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তা ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং ধর্মকে ঢাল বানিয়ে অপরাধীকে আড়াল করার প্রচেষ্টা। এটি সমাজে বিভাজন বাড়াচ্ছে, এবং জনতার মধ্যে সহিংসতা আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

 

মৌলবাদ ও রাজনৈতিক দায়

মৌলবাদ শুধু ধর্মীয় কট্টরতা নয়; এটি যুক্তির মৃত্যু, ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা। বাংলাদেশে মৌলবাদ ক্রমশ জনজীবনে প্রবেশ করেছে—রাজনীতি, সামাজিক মাধ্যম, দৈনন্দিন কথাবার্তায়।

রাজনৈতিক দলগুলোও দায় এড়াতে পারে না। ক্ষমতায় থাকা দল হোক বা বিরোধী দল—ধর্মকে হাতিয়ার বানিয়ে রাজনীতি দেশকে বিভক্ত করেছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী প্রায়শই এর বলি হয়েছে। রাষ্ট্রের নীরবতা সহিংসতাকে উৎসাহিত করেছে এবং জনগণের আইনের প্রতি আস্থা কমিয়েছে।

মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তা

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে অন্তত ২৫৮টি সহিংসতার ঘটনা, ২৭টি হত্যা, ২০টি নারী নির্যাতন, এবং ৫৯টি প্রার্থনাস্থলে আক্রমণ ঘটেছে। আইন ও মানবাধিকার কার্যকর না হলে দিপু দাসের মতো বহু নিরীহ জীবন ঝুঁকিতে থাকবে।

মানবিক মূল্যবোধ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, গণতন্ত্র—এসবের জন্য মব কালচার, গুজব এবং ধর্মীয় বিভাজনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান অপরিহার্য।

উপসংহার

দীপু দাসের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি জাতির জন্য সতর্কবার্তা। নাগরিক নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে, এই ধরনের ঘটনা চলতেই থাকবে।

আমরা যদি সত্যিকারের মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজ চাই—মব কালচার প্রত্যাখ্যান করতে হবে, ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, এবং আইনকে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।

দীপু দাসের রক্ত আমাদের সামনে একটি দায় রেখে গেছে। সেই দায় এড়ালে ইতিহাস ক্ষমা করবে না।

 

 

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *