রাজধানীতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। হত্যা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে উদ্বেগ বাড়ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সব থানাকে নতুন করে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাং বহুদিনের সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের তৎপরতা বেড়েছে। এদের নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে এবং নিয়মিত আটক-গ্রেপ্তার চলছে। সর্বশেষ আদাবরে চাঁদাবাজির ঘটনায় পাঁচ সদস্যকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, গত চার বছরে রাজধানীতে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট কয়েক হাজার অভিযোগ জমা পড়েছে। হত্যা, ধর্ষণ, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ সময় পাঁচ হাজারের বেশি সদস্যকে আটক করা হলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বর্তমানে রাজধানীতে অন্তত ১২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা। ২০২২ সালে সারা দেশে এ ধরনের চক্র ছিল ১৭৩টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৭টিতে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি থানা এলাকাতেই ছোট-বড় গ্রুপে বিভক্ত কিশোর গ্যাং রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও বড় ভাইদের প্রভাব তাদের বেপরোয়া করে তুলছে। ইভ টিজিং, মাদক কারবার, চুরি-ছিনতাই থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে তারা।
পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম ভার্চুয়াল সভায় সব ইউনিটপ্রধান, মেট্রোপলিটন কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দিয়েছেন—চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং যেকোনো মূল্যে স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
গবেষণা তথ্য বলছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ কিশোর অপরাধী দারিদ্র্য, পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অস্থিরতা ও মাদকের প্রভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরোধমূলক সামাজিক উদ্যোগ ও পুনর্বাসন ছাড়া শুধু অভিযানে স্থায়ী সমাধান আসবে না।
সম্প্রতি আদাবরে একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় চাঁদা না দেওয়ায় হামলার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। শ্রমিকদের কুপিয়ে আহত করার ঘটনায় রাতেই থানা ঘেরাও করেন মালিক ও শ্রমিকরা। ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মূল অভিযুক্ত রাসেলসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছে, বেতন দেওয়ার সময় পূর্বপরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় ছিনতাই-চাঁদাবাজি ঠেকাতে ৫৫০টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ে কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মাহিম মিয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায়ও কিশোর গ্যাং সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অভিযুক্তদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট থানা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সমন্বিত অভিযান, নজরদারি বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।










