ঘরটা খুব বড় ছিল না।
একটা জানালা, একটা টেবিল, আর একটি দরজা।
মেয়েটার নাম—ইশরাত।
ইশরাত ছোটবেলা থেকেই এই ঘরটাকে চিনত। এটাই তার নিজের জায়গা। এখানে সে পড়াশোনা করত, গল্প লিখত, কখনো কখনো চুপচাপ বসে থাকত।
এই ঘরেই সে প্রথম শিখেছিল—স্বপ্ন দেখতে।
কিন্তু এই ঘরের একটা অদ্ভুত নিয়ম ছিল।
দরজাটা সবসময় বন্ধ থাকত।
কেউ তাকে কখনো স্পষ্ট করে বলেনি দরজাটা কেন বন্ধ, কিন্তু সবাই জানত—এটা খোলা হয় না।
ছোটবেলায় ইশরাত একবার মাকে জিজ্ঞেস করেছিল—
“দরজাটা খুললে কী হবে?”
মা একটু থেমে বলেছিলেন—
“সব দরজা সবার জন্য না।”
এই উত্তরটি তখন খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল।
কারণ ইশরাত তখনো বুঝতে শেখেনি—কোন দরজা কার জন্য, সেটা কে ঠিক করে।
সময় কেটে যায়।
ইশরাত বড় হয়। তার পড়াশোনা ভালো, শিক্ষকরা তাকে পছন্দ করে, বন্ধুরা তাকে সম্মান করে। সবাই বলে—“মেয়েটা অনেক দূর যাবে।”
কিন্তু এই “দূর” শব্দটির ভেতরে সবসময় একটা সীমা ছিল—যেটা কেউ উচ্চারণ করত না, কিন্তু সবাই জানত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর ইশরাতের পৃথিবী বদলাতে শুরু করে।
সে নতুন মানুষের সঙ্গে মেশে, নতুন চিন্তা শেখে। প্রথমবারের মতো সে এমন কিছু প্রশ্ন শুনতে পায়, যেগুলো আগে কেউ করেনি।
একদিন তার এক বন্ধু casually জিজ্ঞেস করেছিল—
“তুমি কি নিজের জীবন নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারো?”
ইশরাত উত্তর দিতে পারেনি।
কারণ সে কখনো এই প্রশ্নটা নিজেকে করেনি।
সেই দিন রাতে, অনেক বছর পর, সে আবার দরজাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
দরজাটা ঠিক আগের মতোই।
বন্ধ।
নীরব।
সে হাত দিয়ে দরজাটা ছুঁয়ে দেখে।
কোনো তালা নেই।
সে থমকে যায়।
তাহলে এতদিন… দরজাটা আসলে লক করা ছিল না?
পরের কয়েকদিন ইশরাতের ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করে।
সে বুঝতে পারে—তার জীবনে অনেক কিছুই “নিয়ম” হিসেবে মানা হয়েছে, কিন্তু কখনো যাচাই করা হয়নি সেই নিয়মগুলো সত্যিই আছে কিনা।
সে খেয়াল করতে শুরু করে—
কোথায় সে নিজে সিদ্ধান্ত নেয়নি
কোথায় তাকে বলা হয়েছে
কোথায় সে নিজেই নিজেকে থামিয়েছে
এই উপলব্ধি সহজ ছিল না।
কারণ সত্যিটা যতটা না কঠিন, তার চেয়ে বেশি অস্বস্তিকর।
একদিন পরিবার থেকে বলা হলো—
তার বিয়ের কথা ভাবা হচ্ছে।
সবকিছু খুব স্বাভাবিকভাবে বলা হলো।
“ছেলেটা ভালো”
“পরিবার ভালো”
“তোমার জন্যই ভালো হবে”
ইশরাত চুপ করে শুনছিল।
তার মাথার ভেতরে তখন অন্য কিছু ঘুরছিল—
দরজাটা।
সে আবার ঘরে ফিরে আসে।
দরজার সামনে দাঁড়ায়।
এই দরজাটা কি শুধু কাঠের?
নাকি এর পেছনে আছে তার জীবনের সব অপ্রশ্ন করা সিদ্ধান্ত?
সে হাত বাড়ায়।
দরজাটা ধীরে ধীরে ঠেলে দেয়।
দরজাটা খুলে যায়।
বাইরে কোনো অন্ধকার নেই।
কোনো ভয়ঙ্কর দৃশ্য নেই।
বরং আলো।
খোলা জায়গা।
একটা রাস্তা—যেটা কোথায় যায়, সে জানে না।
এই অজানাটাই তাকে থামিয়ে দেয়।
আমরা প্রায়ই ভাবি—নিয়ন্ত্রণ আমাদের বাইরে থেকে আসে।
কেউ আমাদের থামায়, কেউ আমাদের বাধা দেয়।
কিন্তু অনেক সময় সবচেয়ে শক্ত বাধাটা আমরা নিজেরাই তৈরি করি।
ভয় থেকে।
শিক্ষা থেকে।
অভ্যাস থেকে।
ইশরাত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ।
ভেতরের ঘরটা পরিচিত।
নিরাপদ।
সব জানা।
বাইরের দুনিয়া অজানা।
অনিশ্চিত।
কঠিনও হতে পারে।
কিন্তু একটাই পার্থক্য—
ওটা তার নিজের।
পরদিন সকালে, ইশরাত তার পরিবারকে বলল—
“আমি এখন বিয়ে করতে চাই না।”
ঘরে নীরবতা নেমে এলো।
এই নীরবতা নতুন কিছু নয়।
কিন্তু আজ ইশরাতের কাছে এটি ভিন্ন লাগছিল।
কারণ আজ সে জানে—
দরজাটা খোলা।
এই গল্পের শেষ এখানে না।
কারণ প্রতিটি ইশরাতের গল্প এখানেই শুরু হয়।
যখন সে বুঝতে পারে—
সব দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে না।
কিছু দরজা আমরা নিজেরাই বন্ধ করে রাখি।
আর একদিন—
সাহস করে খুলে ফেলি।
লিখেছেন-
Rafia Akther











