চলছে ধুন্ধুমার খেলা। আমাদের দেশেও রাত জেগে খেলা দেখছে সব বয়সের মানুষ। সারা দিন চলছে সেই খেলার গল্প। বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক উৎসবগুলোর একটি। ১৯৩০ সালে মাত্র ১৩টি দল নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিশ্বকাপ আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশই একদিন বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন দেখছে। সেই স্বপ্নকে আরো বিস্তৃত করতেই ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে প্রথম বারের মতো অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দেশ।
বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনকে বলা হয়-‘Greatest Show on Earth’। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই মহাযজ্ঞ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক মিলনমেলা, আবেগের উৎসব এবং বিশ্বসম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। বিশ্বকাপ শুরু হলে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র যেন কিছু সময়ের জন্য নতুন রূপ ধারণ করে। যুদ্ধরত দেশের মানুষও খেলার আলোচনা করে, রাজনৈতিক মতভেদে বিভক্ত পরিবারও একসঙ্গে বসে ম্যাচ দেখে, ভাষা ও সংস্কৃতির পার্থক্য ভুলে কোটি কোটি মানুষ একই উল্লাসে মেতে ওঠে। এমন দৃশ্য পৃথিবীর আর কোনো অনুষ্ঠানে খুব কমই দেখা যায়।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, জাতিগত পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শ-কোনোটিই এখানে প্রধান নয়। একজন মুসলমান, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা ইহুদি একই স্টেডিয়ামে বসে একই দলের জন্য চিৎকার করতে পারে। একজন আফ্রিকান, ইউরোপীয়, এশীয় কিংবা লাতিন আমেরিকান একই আনন্দ উদ্যাপন করতে পারে। ফুটবল এমন একটি ভাষা, যার কোনো অনুবাদের প্রয়োজন হয় না।
আজকের পৃথিবী নানা সংকটে জর্জরিত। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য যুদ্ধ, জাতিগত সংঘর্ষ-মানবসভ্যতা যেন ক্রমাগত বিভক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় বিশ্বকাপ ফুটবল আমাদের একটি ভিন্ন শিক্ষা দেয়। শেখায় যে-প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, কিন্তু শত্রুতা নয়; মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ঘৃণা নয়। বিশ্বরাজনীতিও যদি এই সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিতে পারত, তাহলে অনেক সংঘাত হয়তো আলোচনার টেবিলেই সমাধান হতো। বিশ্বকাপ কেবল প্রতিযোগিতার শিক্ষা দেয় না; এটি মানবিক সহাবস্থানেরও শিক্ষা দেয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের লাখো সমর্থক একই শহরে, একই স্টেডিয়ামে, একই পরিবেশে অবস্থান করে।
ফুটবল কূটনীতি: জাতিসংঘ রাজনৈতিক কুটনীতির মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। বিশ্বকাপ ফুটবল আবেগ, সংস্কৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে একই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। অনেক সময় ক্রীড়া কূটনীতি রাজনৈতিক কূটনীতির চেয়েও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ইতিহাসে দেখা গেছে-ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বহু দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বকূটনীতি সাধারণত রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দূতাবাস কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু কখনো কখনো একটি ফুটবল ম্যাচ, একটি গোল কিংবা একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও এমন কাজ করে দেখিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আলোচনাও করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে ফুটবল রাজনৈতিক উত্তেজনা কমিয়েছে, বৈরী দেশগুলোর মধ্যে সংলাপের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
ফুটবল কূটনীতির অন্যতম আলোচিত উদাহরণ তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার সম্পর্ক। ২০০৮ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের একটি ফুটবল ম্যাচ উপলক্ষ্যে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভানে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল সফর করেন। এটি ছিল দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতার পর একটি নয়া ডেভেলপমেন্ট। পরবর্তীকালে উভয় দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায় এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচেষ্টা শুরু হয়। দীর্ঘ সাত দশকের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও ফুটবল দুই কোরিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে।
আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্টে এ ফুটবল সরাসরি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিল। ২০০৫ সালে বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনের পর জাতীয় দলের অধিনায়ক দিদিআর ড্রগবা জাতির উদ্দেশে আবেগঘন আহ্বান জানান। তার অনুরোধে বিদ্রোহী ও সরকারি পক্ষ আলোচনায় বসে। দেশটির গৃহযুদ্ধ প্রশমনে এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ফুটবল সেখানে শুধু খেলা ছিল না; ছিল জাতীয় পুনর্মিলনের প্রতীক।
চীন দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক ক্লাব প্রতিযোগিতা, বিদেশি খেলোয়াড় আমন্ত্রণ এবং ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশটি বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর সর্বজনীনতা।
রাজনৈতিক ভাষণ মানুষকে বিভক্ত করতে পারে, কিন্তু একটি গোল উদ্যাপন মানুষকে একত্রিত করে। রাষ্ট্রনায়কদের আলোচনায় যেখানে আনুষ্ঠানিকতা থাকে, ফুটবলে সেখানে থাকে আবেগ। এই আবেগ জনগণের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করে, যা পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কখনো কখনো একটি ফুটবল ম্যাচ এমন দরজা খুলে দেয়, যা বহু বছরের কূটনৈতিক আলোচনা খুলতে পারেনি। ফুটবল যুদ্ধ থামাতে না পারলেও শত্রুতার দেওয়ালে প্রথম ফাটল ধরাতে পারে।
অন্যদিকে পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, সংগীত এবং ঐতিহ্য নিয়ে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে। ফলে এটি কেবল ফুটবলের আসর নয়, বরং মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীও বটে। বিশ্বকাপের সময় আমরা দেখি-আফ্রিকার ঢাক, লাতিন আমেরিকার সাম্বা, ইউরোপের সংস্কৃতি,
আরব বিশ্বের আতিথেয়তা-সবকিছু একসঙ্গে মিশে যায়। পৃথিবীর আর কোনো অনুষ্ঠান এত বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে না।
বিশ্বকাপ তরুণ প্রজন্মকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। এখানে জন্মপরিচয় নয়, যোগ্যতাই মুখ্য। একজন দরিদ্র পরিবারের শিশু কঠোর পরিশ্রম করে বিশ্বসেরা ফুটবলার হতে পারে। পেলের গল্প, মারাদোনার গল্প, লিওনেল মেসির গল্প কিংবা অসংখ্য আফ্রিকান ফুটবলারের গল্প আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। তাই বিশ্বকাপ সাম্যেরও প্রতীক। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্বকাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়োজক দেশগুলো অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভের সুযোগ পায়। তবে অর্থনৈতিক লাভের চেয়েও বড় বিষয় হলো একটি দেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় দর্শন সম্ভবত ‘ফেয়ার প্লে’ বা ন্যায্য প্রতিযোগিতা। মাঠে সবাই সমান। বড় দেশ, ছোট দেশ, ধনী দেশ, গরিব দেশ-সবাই একই নিয়মে খেলে। শক্তিশালী দলও হারতে পারে, দুর্বল দলও জিততে পারে। এই নীতিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। বিশ্বকাপের রেফারিং থেকে নিরপেক্ষতার শিক্ষা নেওয়া যায়।
বিশ্বকাপ আমাদের আরো একটি শিক্ষা দেয়-জাতীয় গৌরব এবং আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব একে অপরের পরিপন্থি নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে নিজের দেশকে ভালোবাসতে পারে এবং অন্য দেশের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে পারে। প্রকৃত দেশপ্রেম কখনো বিদ্বেষ শেখায় না; বরং আত্মমর্যাদা ও পারস্পরিক সম্মান শেখায়। যদি বিশ্বরাজনীতি ফুটবলের কাছ থেকে একটি শিক্ষা গ্রহণ করতে চায়, তবে সেটি হবে-প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকুক, কিন্তু শত্রুতা নয়; প্রতিযোগিতা থাকুক, কিন্তু ধ্বংস নয়; মতপার্থক্য থাকুক, কিন্তু সহিংসতা নয়। মাঠে যেমন নিয়ম, সম্মান এবং পারস্পরিক স্বীকৃতির মাধ্যমে খেলা পরিচালিত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কও যদি পরিচালিত হতো, তাহলে পৃথিবী আরো শান্তিপূর্ণ হতে পারত।
এই কারণেই বিশ্বকাপ ফুটবলকে শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা বলা যায় না। এটি মানবসভ্যতার এক মহা-উৎসব, বিশ্বসম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক অনন্য পাঠশালা। বিশ্বকাপ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়-মানুষের মধ্যে বিভেদের চেয়ে মিল অনেক বেশি, সংঘাতের চেয়ে সহযোগিতা অনেক বেশি শক্তিশালী।
তাই বিশ্বকাপের প্রকৃত তাৎপর্য ট্রফি জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রকৃত মহত্ত্ব নিহিত রয়েছে পৃথিবীর মানুষকে একত্রিত করার ক্ষমতার মধ্যে। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ ফুটবলকে যথার্থই বলা হয়- “The Greatest Show on Earth.”
লেখক: ফিকামলি তত্ত্বের জনক, বিশ্ববিদ্যালয় সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক











