বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

July 6, 2026 12:21 am
July 6, 2026 12:21 am

বিক্ষোভে অচল পাকিস্তান কাশ্মির, রাজপথে আজাদীর ডাক

২৬ দিন ধরে চলা তীব্র অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পাকিস্তান অধ্যূষিত কাশ্মির। ৩৮ দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন দমাতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

চলমান আন্দোলনে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আন্দোলনকারীদের দাবি মৃতের সংখ্যা ৩০ জনেরও বেশি। পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে আহত হয়েছে শতাধিক। গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাজারেরও বেশি মানুষকে।

আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান আর সরকারের কঠোর দমননীতি- দুয়ে মিলে পাকিস্তান অধ্যূষিত কাশ্মির অচল হয়ে পড়েছে। উচ্চ দ্রব্যমূল্য ও খাদ্য সঙ্কটে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি কাশ্মির উপত্যকা।

নিত্যপণ্যের দাম কমানো ও বিদ্যুতের দামে ভর্তুকির দাবিতে ২০২৩ সালের মে মাসে আন্দোলন শুরু হয় কাশ্মিরে। বিভিন্ন নাগরিক প্লাটফর্ম মিলে গঠিত জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও অনির্দিষ্টকালের সম্পূর্ণ শাটডাউন কর্মসূচিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল কাশ্মিরে।সরকার বিভিন্ন সময়ে দাবি মানার আশ্বাস দিয়ে আন্দোলনকারীদের শান্ত করে। তবে বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেয়া আশ্বাস বাস্তবায়ন না করার প্রতিবাদে গত ৯ জুন থেকে শুরু হয়েছে ৩৮ দফা আন্দোলেন নতুন পর্যায়। তার আগে ৫ জুন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটিকে। কমিটির পলাতক শীর্ষ নেতাদের ধরতে কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।

এবারের আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের বিপুল অংশগ্রহণ আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। ১০/১২ বছরের স্কুল শিক্ষার্থীরাও রাজপথে আন্দোলনে গলা মেলাচ্ছে। রাজপথে স্লোগান উঠেছে- ’পাকিস্তানি বাহিনী দূর হটো, দূর হটো’, ‘পাকিস্তানি বাহিনী কাশ্মীরিদের হত্যা করছে’, ‘কাশ্মীর পাকিস্তানি হামলার শিকার, ‘আমরা মৌলিক অধিকার চাই’, ‘আমরা বিনামূল্যে শিক্ষা চাই’, ‘খাদ্য সরবরাহ বন্ধ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে’ ‘জাতিসংঘ, আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’।

কাশ্মিরের জনগণের প্রতি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ মানুষ রাজপথে নেমে এসে সবকিছু বন্ধ করে দিচ্ছে। অ্যাকশন কমিটির নেতারা বলছেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রের বৈষম্য আর দমনপীড়নের ইতিহাস পুরোনো। এ প্রসঙ্গে তারা বাঙালি, বেলুচ ও পশতুদের সাথে পাকিস্তান সরকারের করা আচরণের কথা তুলে ধরেন। দাবি না মানলে সরকারকে বাংলাদেশ ও নেপালে সাম্প্রতিক আন্দোলনের পরিণতির কথাও স্মরণ করিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। ৩৮ দফা দাবি না মানলে মুজাফফরাবাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার পরিচালনা, কাশ্মির থেকে পাকিস্তান হটানোর চূড়ান্ত কর্মসূচির হুশিয়ারীও দিচ্ছেন নেতারা। এমনকি প্রয়োজনে ভারতের সাথে যোগাযোগ বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা।

কেন্দ্রের বৈষম্যের কথা তুলে ধরে আন্দোলনকারীরা বলছেন, কাশ্মিরে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তাদের কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। তাছাড়া আটা-ময়দার দামও সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তারা আমলা ও ভিআইপিদের জন্য বিশেষ প্রটোকল বাতিলেরও দাবি তুলছেন। সরকারি তহবিল অপচয়ের দাবিও আছে তাদের।

তবে আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় বিধানসভার নির্বাচনকে সামনে রেখে এবারের আন্দোলন নতুন গতি পেয়েছে। বিধানসভায় কাশ্মিরের বাইরে থাকা কাশ্মিরি শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি এ সংরক্ষিত আসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকার কাশ্মিরের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং ইচ্ছামত ছড়ি ঘোরায়। এবার তারা এ সংরক্ষিত আসন সম্পুর্ণ বাতিলের দাবি তুলেছে। সরকার কিছু দাবি মানার ঘোষণা দিলেও সংরক্ষিত আসন এবং বিশেষ প্রটোকলে ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন কমিটিও ছাড় দিতে রাজি নয়।

শুরু থেকে অ্যাকশন কমিটি দোকানপাট শাটডাউন, পরিবহন ধর্মঘট, লংমার্চ, অবস্থান ধর্মঘটের মত কর্মসূচি পালন করছে। মুজাফফরাবাদ, রাওয়ালকোট, মিরপুরসহ প্রধান প্রধান সব শহরের সমস্ত দোকানপাট, কাঁচাবাজার ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হচ্ছে। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে কাশ্মিরের অন্য এলাকায়ও। ফলে প্রায় একমাস ধরে উত্তাল কাশ্মির উপত্যকা।

আন্দোলনকারীদের পিছু হটাতে সরকার নিষ্ঠুর দমননীতির পাশাপাশি অঞ্চলটিতে খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী পণ্যের প্রবেশ সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ করে দেয়ায় ফলে ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবাসমূহ অচল হয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আরোপ, কারফিউ জারি করে সরকার কাশ্মির কার্যত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলন এখন আর শুধু কাশ্মিরে সীমাবদ্ধ নেই। আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ কাড়তে বিভিন্ন দেশে বাস করা প্রবাসী কাশ্মিরিরাও পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।

সম্প্রতি এক সমাবেশে অ্যাকশন কমিটির নেতা সরদার আমান খান বলেন, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর কখনোই পাকিস্তানের অংশ ছিল না। তিনি দাবি করেন যে, তাদের চেয়ে পাকিস্তানেরই এই অঞ্চলের বেশি প্রয়োজন। আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থানের বিপরীতে সরকারর কঠোর অবস্থানে কাশ্মিরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে কাশ্মিরের ওপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় করকারের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ আলগা হয়ে যাাচ্ছে। সামনের দিনে আন্দোলন কোনদিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *