বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

September 28, 2026 6:22 am
September 28, 2026 6:22 am

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: সমৃদ্ধ ও নতুন বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা পেশ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। ধর্ম-বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের লক্ষ্য। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তাগিদের পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় থ্রি-আর (রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল অনুসরণের কথা তুলে ধরেন।

ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মদানকারী সবার অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং আহতদের প্রতি সহমর্মিতা জানান।

নিজেকে স্মৃতিকাতর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছিলেন। একইভাবে তিনি দেশের জনগণের স্বার্থ এবং শান্তিপূর্ণ বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র শক্তিশালী হতে পারে না। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের (কর্মক্ষম জনসংখ্যার অধিক হার) সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জোর
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এতে দেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানে নিহিত’ উল্লেখ করে তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়াকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

জলবায়ু ন্যায়বিচারে তাগিদ
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ক্লিন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ ও মিঠাপানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। তাই নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক। বিভিন্ন খাতের এসব কার্ডকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকার বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এবারই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কর্মমুখী শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের বিষয়টি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যাগ ও স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’কে বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে সারাদেশে আয়োজিত মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানো এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করছে। জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ মিল রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রযুক্তির বৈষম্য দূর করার আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুযোগ এখনও সবার জন্য সমান নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’

উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী এআই ও সামাজিক মাধ্যমের বিকাশের সুফল ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

এলডিসি উত্তরণে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। এ উত্তরণকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দেশ একা এগিয়ে যেতে পারে না। কভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা থেকেও পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও নির্ভরতার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

শান্তি ও মানবিক বিশ্বের পক্ষে বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং সম্মান ও মর্যাদা রক্ষাই দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। জাতিসংঘকে এমন একটি সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান।

নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষা

নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসনের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য– ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়– এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সরকারের লক্ষ্য।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বকে স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে বাংলাদেশ কাজ করছে।
‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’– এই প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে এ বৈঠকে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের মধ্যকার সহযোগিতা, বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের অগ্রাধিকার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে জাতিসংঘের সহযোগিতা ও সমর্থনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক 
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে উচ্চ পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সরকার ও মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দ্বিপক্ষীয় ও সাইডলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধির উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব একেএম নাজমুল হক এ কথা জানান।

সহকারী প্রেস সচিব জানান, বুধবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে দুই দেশের সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়ে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়। জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে বৃহস্পতিবার আনুতিন চার্নভিরাকুলের পরই তারেক রহমান বক্তব্য দেন।

এ ছাড়া সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া মালমের স্টেনারগার্ডের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে বাংলাদেশ ও সুইডেনের মধ্যে স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।

পাকিস্তান সফর নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার বৈঠক করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পৃথক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এশিয়া ওয়ানের খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি কখন পাকিস্তান সফরের পরিকল্পনা করছেন? জবাবে তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত জবাবে বলেন, ‘আমরা একটি দিনক্ষণ ঠিক করব। আমরা সময়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’ এদিকে বৈঠক শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইপিআই প্রেসিডেন্টের বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের (আইপিআই) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জায়েদ রা’য়াদ আল হুসেইনের সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ বৈঠক করেছেন। গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রালে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব এ কে এম নাজমুল হক। তিনি জানান, বৈঠকে আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং সমসাময়িক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জাতিসংঘকেন্দ্রিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিষয়েও মতবিনিময় হয়।

ওয়াল স্ট্রিট প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল সকালে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি প্রাতঃরাশ বৈঠকে অংশ নেন। জেপি মরগ্যান আয়োজিত এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ম্যানহাটনের জেপি মরগ্যান সদরদপ্তরে। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগের সম্ভাবনা, বাণিজ্য ও আর্থিক খাতসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

মা ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে জোর জোবাইদার
প্রতিরোধযোগ্য মা ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার (পিএইচসি) কেন্দ্রবিন্দুতে পেশাদার ধাত্রীদের রাখার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে ‘অঙ্গীকার থেকে কার্যকর পদক্ষেপ: প্রতিরোধযোগ্য মা ও নবজাতকের মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ধাত্রীসেবার সমন্বয়’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের এক সাইড ইভেন্টের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ডা. জোবাইদা বলেন, পেশাদার ধাত্রীরা জীবন রক্ষা করেন। তাই তাদের কার্যকর, সমতাভিত্তিক ও টেকসইভাবে কাজের সুযোগ করে দেয় এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিরোধ, মর্যাদা ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ভিত্তিতে একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে সেই জনকেন্দ্রিক ধারাকে এগিয়ে নিতে চায়। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে নারী ও শিশুরা।

অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ অনুষ্ঠানে সিয়েরা লিওন, নেপাল, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সমাপনী বক্তব্যে ডা. জোবাইদা সব অংশগ্রহণকারীকে ধন্যবাদ জানান।

ড. খলিলুরের সাফল্য কামনা রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব পালনকালে তাঁর সাফল্য কামনা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সাধারণ পরিষদের বর্তমান অধিবেশন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও হুমকি মোকাবিলায় দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সহায়তা করবে।

বুধবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সপ্তাহ চলাকালে খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠককালে ল্যাভরভ এই প্রত্যাশার কথা জানান। রুশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *