ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সবসময়ই ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। এজন্য এ বিমানবন্দরে যাত্রী-স্বজনের ভিড় লেগেই থাকে। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবে কয়েকটি বিমানবন্দরে কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়ায় ঢাকা থেকে দেশটির উদ্দেশে ফ্লাইটও স্থগিত রয়েছে। এতে বিমানবন্দরে রীতিমতো ভিড় কমে এসেছে।
বিমানবন্দরে দায়িত্বরত কর্মীরা বলছেন, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে আন্তর্জাতিক রুটে প্রায় প্রতিদিনই গড়ে অন্তত ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এর মধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন রুটে গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এ যাত্রীদের সঙ্গে দ্বিগুণ বা তারও বেশি আত্মীয়স্বজন বিমানবন্দরে আসেন। তবে ঢাকা থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় সেই ভিড় কমে গেছে।
হুতিদের হামলার পর গত শনিবার ঢাকা থেকে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দাম্মামে কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করে বিভিন্ন এয়ারলাইন্স। এতে গতকাল বিকেল পর্যন্ত ১৩ হাজার ৭১ যাত্রী নির্ধারিত সময়ে দেশটিতে যেতে পারেননি। একই সময় পর্যন্ত ১০টি এয়ারলাইন্সের ৮৩ ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদ ও দাম্মামে তাদের সব ফ্লাইট স্থগিত ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে।
বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা বলছেন, শনিবার থেকে ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত শুরু হলেও পরের দিনগুলোতেও যাত্রী ও স্বজনরা বিমানবন্দরে ভিড় করেন। গত সোমবারও হাজার হাজার যাত্রী বিমানবন্দরে অনিশ্চিত অপেক্ষায় ছিলেন। এতে তাদের নানা ভোগান্তি হচ্ছিল। তবে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের নানা উদ্যোগের কারণে গতকাল থেকে বহির্গমন টার্মিনালে সৌদিগামী যাত্রীর ভিড় কমে গেছে। যাত্রীরা এখন বিমানবন্দর ও এয়ারলাইন্সগুলো থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়ায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন।
এদিকে চলমান পরিস্থিতি সামাল দিতে শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীম সামাদ এয়ারলাইন্সগুলোকে চিঠি দিয়ে নানা উদ্যোগ নিতে বলেছেন।
চিঠিতে তিনি এয়ারলাইন্সগুলোকে নানা নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ফ্লাইট বাতিল, বিলম্ব ও সময়সূচির পরিবর্তন সম্পর্কে যাত্রীদের মোবাইল ফোনে এসএমএস, ফোনকল, ইমেইল, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানাতে হবে। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি, ফের টিকিট বুকিং, অর্থ ফেরত ও অন্যান্য প্রযোজ্য ব্যবস্থা সম্পর্কেও স্পষ্ট তথ্য দিতে হবে। ফ্লাইটের অবস্থা নিশ্চিত না হয়ে যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসতে নিষেধ করতে হবে।
ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তার দরকার হলে যাত্রীদের সৌদি কর্তৃপক্ষ, ঢাকায় সৌদি দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে পরামর্শ দিতে হবে এয়ারলাইন্স সংস্থাগুলোকে।
ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এরই মধ্যে যেসব যাত্রী বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন, তাদের জন্য বসার জায়গা, পানীয় জল, হালকা খাবারসহ প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু, প্রতিবন্ধী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রীর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। কোনো যাত্রীকে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না উল্লেখ করে বলা হয়েছে, যাত্রীদের সঙ্গে সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে এবং সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে হবে। নির্দেশনাগুলো অবিলম্বে কার্যকর করে বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখতে হবে।
প্রতিটি এয়ারলাইন্সকে একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি নিয়োগ করার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিনিধির নাম, পদবি, মোবাইল নম্বর ও ইমেইল ঠিকানা দ্রুত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা বিভাগকে জানাতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ওই প্রতিনিধিকে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে যাত্রীদের সহায়তা ও ফ্লাইট-সংক্রান্ত তথ্য সমন্বয় করতে হবে।
চার দিনে ৮২ ফ্লাইট বাতিল, দুশ্চিন্তায় ১৩ হাজার যাত্রী: বেবিচক জানিয়েছে, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে কার্যক্রম সীমিত থাকার কারণে শনিবার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত চার দিনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ৮২টি ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। এতে ১৩ হাজার ৭১ যাত্রী ঢাকা থেকে সৌদিতে যেতে পারেননি। স্থগিত বা বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে ঢাকা থেকে সৌদিতে সরাসরি চলাচলরত ফ্লাইট রয়েছে ৩২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট রয়েছে ৫০টি।
সরাসরি ফ্লাইটগুলোর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ১০টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ১০টি, সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের পাঁচটি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের সাতটি ফ্লাইট রয়েছে। এ ছাড়া, ট্রানজিট ফ্লাইটগুলোর মধ্যে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের ২২টি, সালাম এয়ারের চারটি, ইজিপ্ট এয়ারের একটি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ১১টি, কাতার এয়ারওয়েজের ছয়টি এবং ফ্লাই দুবাইর ছয়টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হয়েছে।
এদিকে ঢাকা থেকে রিয়াদে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট স্থগিতের পর গতকাল ঢাকা থেকে দাম্মামেও ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। গতকাল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সটির জনসংযোগ বিভাগের বার্তায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবে চলমান বিমানবন্দর হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে দাম্মাম এবং রিয়াদগামী বিমানের সব ফ্লাইট স্থগিত থাকবে।
এতে বলা হয়, স্থগিত থাকা ফ্লাইটগুলোর পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও যাত্রার সময়সূচি সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য যথাসময়ে জানানো হবে। জরুরি প্রয়োজনে সম্মানিত যাত্রীরা জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে সৌদি আরবে যাতায়াত এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। এক্ষেত্রে টিকিট ও ভ্রমণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য নিকটস্থ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সেলস সেন্টারে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করেছে বিমান।











