সরকার ঘোষণা করেছে—অবৈধভাবে আমদানি করা বা কর ফাঁকি দিয়ে আনা মোবাইল হ্যান্ডসেট চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ব্লক করা হবে। এই সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাজস্ব গাইবান্ধা রোধ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং ধুঁকতে থাকা স্থানীয় হ্যান্ডসেট উৎপাদন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা। তবে বর্তমানে ব্যবহৃত অবৈধ ফোনগুলো সরাসরি বন্ধ করা হবে না—তথ্যসম্মত পর্যায়ক্রমিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বলে বিটিআরসি জানিয়েছে।
ঢাকায় গতকাল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR)’ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চালু করার ঘোষণা দেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি–বিষয়ক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি জানান, ENIR/NEIR সিস্টেমটি আন্তর্জাতিক মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (IMEI) নম্বর যাচাই করে চুরি বা অবৈধ ডিভাইস শনাক্ত ও ব্লক করবে। প্রতিটি মোবাইল ডিভাইসের জন্য ১৫-সংখ্যার একটি অনন্য আইএমইআই কোড থাকে—এই নম্বর পদ্ধতিতেই ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন করা হবে।
বিটিআরসি সূত্রে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ফোনের প্রায় ৪০ শতাংশ অবৈধভাবে প্রবেশ করে—এতে সরকার বছরে আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশীয় নির্মাতারা প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে। NEIR কার্যকর হলে অবৈধ আমদানি বন্ধ, চুরি-চোপড়ের ফোন শনাক্তকরণ ও অনিবন্ধিত ডিভাইসের নেটওয়ার্ক ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে—ফলে মোবাইল-ভিত্তিক অপরাধ তদন্তেও সহায়তা মিলবে বলেও আশা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ফোন নির্মাতারাই এই সিস্টেম সংযুক্ত করার জন্য অর্থায়ন করেছে। বিটিআরসি হঠাৎ করে কোনো হ্যান্ডসেট ব্লক করবে না; ব্যবহারকারীদের পর্যাপ্ত সময় ও স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া হবে যাতে সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়ে জনভোগান্তি না হয়।”
সিস্টেমটি কিভাবে কাজ করবে
NEIR ডাটাবেজে প্রতিটি মোবাইলের আইএমইআই নম্বর রেকর্ড থাকবে। যখন কোনো ডিভাইস নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হবে, তখন আইএমইআই যাচাই করে দেখা হবে—নিবন্ধিত ও বৈধ হলে নেটওয়ার্কে চলতে দেয়া হবে; অন্যথায় ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্লক হয়ে যাবে। নতুন ফোন কেনার আগে ক্রেতারা ফোনের প্যাকেটে থাকা আইএমইআই নম্বর নিয়ে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে SMS করে (KYD <স্পেস> [IMEI]) ডিভাইসের বৈধতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারবেন।
বিদেশ থেকে বৈধভাবে আনা বা উপহার হিসেবে পাওয়া ফোনের জন্য ব্যবহারকারীকে NEIR পোর্টালে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে আইএমইআই, পাসপোর্ট কপি, ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প ও ক্রয়ের রশিদের মতো নথি আপলোড করতে হবে। যাচাই পর ডিভাইস নেটওয়ার্কে স্থায়ীভাবে ব্যবহার যোগ্য হবে। ব্যবহৃত ফোন বিক্রি বা উপহার দিলে পূর্ব মালিককে NEIR প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন বাতিল করে নতুন মালিকের নামে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। হারানো বা চুরি হওয়া ফোনও অবিলম্বে ব্লক করা যাবে—ফলে তা নেটওয়ার্কে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়বে।
প্রযুক্তিগত ও নীতিগত প্রেক্ষাপট
এর আগে ২০২১ সালে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল; কিন্তু আইএমইআইয়ের জটিলতা, ডুপ্লিকেট আইএমইআই ও একাধিক ফিচার ফোনে একই আইডি থাকার মতো সমস্যা থাকায় ব্যাপক বাস্তবায়ন স্থগিত রাখা হয়েছিল। এবার সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সমাধান এবং স্টেকহোল্ডার সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনাটি পুনরায় কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
বিটিআরসি কর্মকর্তা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, NEIR চালু হলে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (MFS) জালিয়াতি, সিম প্রতারণা ও ডিজিটাল অপরাধ প্রবণতা কমবে। একই সঙ্গে স্থানীয় হ্যান্ডসেট নির্মাতারা অনিয়ম-ভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা পাবে এবং বৈধ আমদানিকারকরা বাজারে পুনরায় স্থিতিশীলতা পাবেন।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, NEIR সফলভাবে চালু হলে স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়ার পাশাপাশি সরকারের আয়ও বৃদ্ধি পাবে—তবে বাস্তব প্রতিস্থাপনের সময় ক্রেতা-ভোক্তাদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা এবং নথি-যাচাই সহজ করার ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন হবে।











