বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 3:40 am
January 16, 2026 3:40 am

মব–সহিংসতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি: রাষ্ট্র কি ব্যর্থতার দায় নেবে?

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

“রাষ্ট্র যদি এখনই না জাগে, তবে এই সহিংসতা একদিন আমাদের সকলকেই গ্রাস করবে।”

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হয়ে উঠেছে মব সহিংসতা—অর্থাৎ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। দেশের কোন প্রান্তেই আর আইন নিজের হাতে নেওয়া এক নতুন অভ্যাস নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার আলোয় দেখা যায় যে, মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে গণপিটুনি ও হত্যা এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। শুধু সন্দেহ, গুজব বা কৌতূহলে মানুষকে প্রাণে বঞ্চিত করা হচ্ছে; অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মতো মৌলিক ন্যায়বিচার পর্যন্ত ধোলা হয়ে যাচ্ছে। মাগুরার ঘটনাসহ একাধিক কেসের সূত্র ধরে এই প্রবণতার দায় আর রাষ্ট্র ও সমাজকে এড়িয়ে যেতে দেওয়া সম্ভব নয়।

“একটি সমাজ তখনই অসুস্থ হয় যখন সন্দেহেই শাস্তি দিয়ে ফেলা হয়।“

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশে ৬৩৭ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে পুলিশ সদস্য, রাজনৈতিক কর্মী, সংখ্যালঘু ও সাধারণ নাগরিক—সব শ্রেণির মানুষই রয়েছেন। এক বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৫১ জন। অর্থাৎ এক বছরে গণপিটুনিজনিত হত্যার হার বেড়েছে প্রায় বারো গুণ।(সূত্র: ইকোনমিক টাইমস, গ্লোবাল সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, ২০২৫)। মব হত্যার এই ভয়ঙ্কর উত্থান বাংলাদেশের সামাজিক মানচিত্রে নেমে এসেছে আতঙ্কের কালো ছায়া হয়ে। যেখানে আগে অপরাধ সন্দেহে থানায় নেওয়া হতো, সেখানে এখন “জনতার বিচার” হয়ে যাচ্ছে রাস্তায়।

“অভিযোগের প্রমাণ নয়, সন্দেহই এখন মৃত্যুর কারণ।“

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের পর আওয়ামী লীগ সরকার পতিত হয় এবং দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। মানুষ ভেবেছিল, এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আসবে আইনশৃঙ্খলার পুনর্জাগরণ, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। নতুন সরকার রাজনৈতিকভাবে দুর্বল এবং প্রশাসনিকভাবে অগোছালো হওয়ায় আইন প্রয়োগের ক্ষমতা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এই সুযোগে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রতিশোধ, গুজব ও উন্মত্ততার রাজনীতি। পূর্ববর্তী সরকারের সমর্থকদের লক্ষ্য করে হামলা, প্রতিপক্ষকে অপমান ও “দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়ে গণধোলাই—এসবই এখন সাধারণ ঘটনা। অধিকাংশ মব সহিংসতার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও গোষ্ঠীগত প্রতিশোধ।

একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন জানায়—নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশ কোনো না কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হত্যাকারীরা রয়ে গেছেন অদণ্ডিত।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাসমূহঃ

  • ৯ জুলাই ২০২৫, ঢাকার পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে লালচাঁদ সোহাগ নামের এক স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ীকে মোবাইল চুরির অভিযোগে শতাধিক লোক মিলে পিটিয়ে হত্যা করে।
  • ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তোফাজ্জল হোসেন নামে মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তিকে “চোর” সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
  • মাগুরায় ইসরাফিল হোসেন নামে এক তরুণকে একইভাবে হত্যা করা হয়।

“দেশজুড়ে একের পর এক ভয়ঙ্কর ঘটনা প্রমাণ করছে, মানবজীবনের মূল্য কতটা তুচ্ছ হয়ে গেছে।“

প্রতিটি হত্যার পর সংবাদমাধ্যমে ক্ষোভের ঢেউ উঠলেও, এক মাস না যেতেই নীরবতা নেমে আসে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিক জীবন ও আইনের আশ্রয় লাভের অধিকারী। কিন্তু বাস্তবে আইনের আশ্রয় এখন আর নাগরিকের কাছে পৌঁছায় না—কারণ আইন নিজেই ভীত, দুর্বল ও প্রভাবিত। দল পরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক দুর্বলতা, পুলিশের পক্ষপাত, বিচারব্যবস্থার ধীরগতি—সবই রয়ে গেছে আগের মতো। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকরা যখন দেখে, অপরাধী শাস্তি পাচ্ছে না, তখন তারা নিজেরাই আইন হাতে তুলে নেয়।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ মাত্রা

জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদে বলা আছে—“ন্যায়বিচার ছাড়া মানবাধিকার টিকে না।“ কিন্তু বাংলাদেশে এখন ন্যায়বিচার যেন বিলাসিতা। গণপিটুনিতে নিহতদের মধ্যে রয়েছে নারী, শিশু, আদিবাসী ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও। এগুলো শুধু অপরাধ নয়; এগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্লাসিক উদাহরণ। তবুও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো স্বতঃপ্রণোদিত তদন্ত বা ক্ষতিপূরণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে এখন ন্যায়বিচার যেন বিলাসিতা।

পশ্চিমা বিশ্বে কেন মানুষ নিরাপদ

অনেকে যুক্তি দেন—আমাদের সমাজে ক্ষোভ বেশি, আইন দুর্বল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো কিভাবে শান্তি বজায় রাখে? কারণ সেখানে আইনের শাসন কেবল কথায় নয়, প্রয়োগে প্রতিষ্ঠিত। যুক্তরাজ্য বা কানাডায় কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলেও তাকে আদালতে হাজির করা হয়; বিচার হয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়। পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, বিচার বিভাগ স্বাধীন।

অপরদিকে বাংলাদেশে আইনের প্রয়োগ নির্ভর করে কে অভিযুক্ত, সে কোন দলের, কিংবা সে কতটা প্রভাবশালী। এই বৈষম্যই মব সহিংসতার মানসিক ভিত্তি তৈরি করছে—মানুষ ভাবে, “বিচার হবে না, তাই নিজেরাই করি।”রাজনৈতিক দলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আইনকে নিজেদের হাতের খেলনা বানিয়েছে। ক্ষমতায় থাকলে আইন কঠোর, ক্ষমতার বাইরে থাকলে আইন “নিরপেক্ষ”হয়ে পড়ে। এই দ্বিচারিতা সমাজে এমন বার্তা দেয়—“ক্ষমতাধর হলে তুমি অদণ্ডিত।”নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে এই প্রবণতা ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে।

গণপিটুনি শুধু অপরাধ নয়—এটি এক ধরনের সমষ্টিগত নৈতিক অবক্ষয়। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে, আদালত ন্যায় দেবে না, তখন প্রতিশোধই হয়ে ওঠে তাদের কাছে “ন্যায়বিচার।”এমন সমাজে সভ্যতার মুখোশ খুলে যায়।

“এই ভয়াবহতা থেকে বেরোতে হলে রাষ্ট্রকে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে।“

করণীয়: আইন, বিচার ও মানবিকতার পুনর্গঠন

  • প্রতিটি মব-হত্যা মামলায় দ্রুত তদন্ত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।
  • আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোয় আনতে হবে।
  • রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—গণপিটুনিতে জড়িত হলে দলীয় পরিচয় কোনো রক্ষা দেবে না।
  • সোশ্যাল মিডিয়া ও গুজব-নির্ভর উস্কানির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
  • ভুক্তভোগী পরিবারের মানসিক ও আর্থিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
  • নাগরিক সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বাড়াতে হবে—“রাস্তায় বিচার নয়, আদালতেই বিচার” এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিটি মামলার দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার ও অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • আর সমাজকে বুঝতে হবে—রাস্তায় বিচার নয়, আদালতেই বিচার।

ন্যায়বিচার রাস্তায় নয়, রাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় মব-হত্যা আর শুধু সামাজিক অপরাধ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক। রাজনীতি পাল্টেছে, সরকার বদলেছে, কিন্তু বিচারহীনতা বদলায়নি। একটি জাতি যখন বিচার হারায়, তখন সে মানবিকতাও হারায়। আজ প্রয়োজন শক্ত বার্তা—

“আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, আর আইন নিজের হাতে তুলে নিলে শাস্তি হবেই।”

রাষ্ট্র যদি এই বার্তা দিতে না পারে, তবে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার—সবই কেবল বক্তৃতার শব্দ হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের জনগণ সেই সময়ের অপেক্ষায় আছে, যখন আদালত আবার রাস্তায় নামা জনতার ওপর নয়—আইনের ওপর নির্ভর করবে।

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *