বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

December 1, 2025 3:41 am
December 1, 2025 3:41 am

ভয়, ন্যায় আর রাষ্ট্রের নীরবতা — মানবাধিকারের সংকটে বাংলাদেশ

Md Abdur Rahman

মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা আজকাল এক ধরনের ঝুঁকি। তুমি যদি কারও নিপীড়নের কথা বলো, কেউ না কেউ বলবে — “দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে।” তুমি যদি রাষ্ট্রের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলো, বলা হবে — “বিদেশি প্রভাব।” কিন্তু আসলে সত্যিটা হলো, মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলা কোনো রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; বরং রাষ্ট্রকে আরও মানবিক করে তোলার আহ্বান।

আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে অধিকারকে ‘অনুগ্রহ’ মনে করা হয়, আর ন্যায়কে ‘সহনশীলতার পরীক্ষা’। অথচ মানবাধিকার মানে কেবল আইনি কাগজ নয়, এটি মানুষের মর্যাদার প্রতিশ্রুতি।
সংবিধানে লেখা আছে—“সব নাগরিকের সমান অধিকার থাকবে।” কিন্তু বাস্তবে সমান অধিকার এখন এক বিলাসী বাক্য, যা দরিদ্র, প্রান্তিক কিংবা ভিন্ন চিন্তার মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়।

রাষ্ট্র আজ নাগরিকের জন্য নয়, বরং নিজেকে রক্ষা করতে ব্যস্ত।

বাংলাদেশে মানবাধিকার শব্দটা এখন প্রায় রাজনৈতিক হয়ে গেছে। তুমি যদি গুম, খুন, বা নির্যাতন নিয়ে কথা বলো, তোমাকে ‘বিদেশি এজেন্ট’ বা ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া হয়। অথচ মানবাধিকার কোনো বিদেশি শব্দ নয়—এটি তোমার, আমার, প্রতিটি নাগরিকের বাঁচার মৌলিক শর্ত।

একজন শ্রমিক যখন মাস শেষে মজুরি পান না, সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন।
একজন নারী যখন রাস্তায় নিরাপদে হাঁটতে পারেন না, সেটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
একজন সাংবাদিক যখন ভয়ের কারণে সত্য প্রকাশ করতে পারেন না, তখন রাষ্ট্রের আত্মা আহত হয়।

কিন্তু আমরা এইসব ঘটনাকে এমনভাবে দেখতে শিখেছি যেন এগুলো স্বাভাবিক। যেন নির্যাতন বা অবিচার—এটাই আমাদের নিয়তি।

রাষ্ট্রের ভয় এখন মানুষের ভয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেউ ফেসবুকে লিখতে ভয় পায়, কেউ প্রতিবাদে যেতে ভয় পায়, কেউ প্রশ্ন করতে ভয় পায়। অথচ ভয়হীনতাই মানবাধিকারের ভিত্তি। ভয় মানে অন্ধকার, আর অধিকার মানে আলোর দিকে হাঁটা।

যে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখিয়ে নীরব রাখে, সেই রাষ্ট্র টিকতে পারে না। কারণ ইতিহাস দেখায়—ভয়ের রাজনীতি টিকে থাকে যতদিন না মানুষ তার অধিকার দাবি করে নেয়।

আজ মানবাধিকারকর্মীরা, ব্লগাররা, সাংবাদিকরা কিংবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—সবাই এক অদৃশ্য দমনযন্ত্রের নিচে বাস করছে। কেউ কারও উপর খোলা হাতে হামলা করে না, কিন্তু ভয় এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যে, মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠ রোধ করে রাখে।

এই আত্মনিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে বড় নিপীড়ন।

ধর্মীয় উগ্রতা, সামাজিক সহিংসতা ও রাষ্ট্রীয় নিস্পৃহতা—এই তিনটি একত্রে তৈরি করেছে এক জটিল সংকট।
তুমি যদি ধর্মের নামে অন্যায় দেখেও প্রশ্ন না করো, তাহলে মানবাধিকার কেবল বইয়ের বিষয় হয়ে থাকে।

ধর্ম কোনো রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার নয়, এটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস। কিন্তু আজ রাষ্ট্র সেই বিশ্বাসকেই ব্যবহার করছে নাগরিকের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে। তুমি যদি প্রশ্ন করো কেন নারী এখনও ধর্মীয় বক্তৃতায় অবমানিত হয়, কেন ভিন্ন যৌন অভিমুখের মানুষকে অমানুষ বলা হয়, কিংবা কেন সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে—তাহলে রাষ্ট্র তোমাকে বলে, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত।”

অথচ প্রকৃত ধর্ম কখনোই অন্যের অধিকার হরণ শেখায় না।
ধর্মকে ভয় আর নিষেধের রাজনীতিতে পরিণত করা হয়েছে—এটাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে কৌশলী রূপ।

মানবাধিকার কেবল মৃত্যুদণ্ড বা নির্যাতনের প্রশ্ন নয়। এটি প্রতিদিনের ন্যায়ের প্রশ্ন।
যে দেশে শ্রমিকের মজুরি অন্যায্য, কৃষকের ফসলের দাম অর্ধেক, শিক্ষক হয়রানির শিকার, এবং বিচার পেতে বছর পার হয়ে যায়—সেই দেশে মানবাধিকার নিয়ে গর্ব করার কিছু থাকে না।

বিচারব্যবস্থার পক্ষপাত এখন এতটাই প্রকট যে, সাধারণ মানুষ আর আদালতের দ্বারস্থ হতে চায় না। কারণ তারা জানে—যে বিচার পেতে বছর যায়, সেই বিচার কোনো অধিকার নয়, একধরনের ক্লান্তি।

মানবাধিকার মানে ত্বরিত বিচার, সমান সুযোগ, মর্যাদাপূর্ণ জীবন। কিন্তু রাষ্ট্র যদি কেবল আইন তৈরি করে, বাস্তবায়ন না করে—তাহলে মানবাধিকার কাগজে বন্দি থাকে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখন সবচেয়ে বিপন্ন অধিকার।
রাষ্ট্র এখন আর কেবল তোমার লেখা মুছে দেয় না, বরং তোমার ভয় তৈরি করে।
তুমি যাতে লিখতে না চাও, কথা বলতে না চাও—এই ভয়ই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, অনলাইন নজরদারি—সবই এই ভয় প্রতিষ্ঠার কৌশল।
মানুষ যখন নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে ভয় পায়, তখন সমাজ বেঁচে থাকলেও স্বাধীনতা মরে যায়।

মানবাধিকারের কথা বললে কেউ বলে—“এটা দেশের বিরুদ্ধে।” কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকারবিরোধিতা করাই দেশের বিরুদ্ধে।
যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে না, সে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কখনোই সম্মান পায় না।

একটি রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় তখনই, যখন তার দুর্বলতম নাগরিক নিরাপদ থাকে।
কিন্তু এখানে ঘটে উল্টোটা—শক্তিশালী গোষ্ঠী নিরাপদ, দুর্বলরা ভীত।

মানবাধিকার মানে হলো প্রতিটি মানুষের মুখে কথা বলার স্বাধীনতা দেওয়া। তুমি রাষ্ট্রের প্রশংসা করবে কি সমালোচনা করবে—তোমার সেই অধিকার থাকবে।

বাংলাদেশে এখন এক ধরনের moral policing চলছে। কারা কী লিখবে, কারা কী পরবে, কারা কাকে ভালোবাসবে—সবকিছুর ওপর সামাজিক রায় জারি হচ্ছে। এই সামাজিক রায়ই পরে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে রূপ নেয়।
যখন মানুষ মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণ করতে চায়, তখন রাষ্ট্রের কাজ হয় সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কিন্তু রাষ্ট্র তা না করে বরং এই রায়কে বৈধতা দেয়।

এভাবে ধীরে ধীরে নাগরিকত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা রাষ্ট্রের নাগরিক নই, বরং ‘পর্যবেক্ষণের অধীন প্রজা’ হয়ে যাচ্ছি।

মানবাধিকারকে ‘পশ্চিমা ধারণা’ বলে যারা ঠাট্টা করে, তারা ভুলে যায়—ইসলামেরও মূল শিক্ষা মানব মর্যাদা।
কিন্তু এই শিক্ষা আজ ধর্মীয় রাজনীতির আওয়াজে হারিয়ে গেছে।
একসময় যারা স্বাধীনতার জন্য লড়েছিল, আজ তাদের উত্তরসূরিরা ভিন্নমত দমনে গর্ববোধ করে।
এটা রাষ্ট্রের নৈতিক পরাজয়।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই বিশ্বাস করে স্বাধীনতা তার ভিত্তি, তবে তাকে প্রথমে ভয় দূর করতে হবে।
যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের কণ্ঠে ভয় দেখে, সে রাষ্ট্র আত্মবিশ্বাসহীন।

আজ সময় এসেছে, মানবাধিকারের প্রশ্নকে রাজনীতির বাইরে এনে মানবিকতার আলোয় দেখা।
এটা কোনো বিদেশি শর্ত নয়—এটা আমাদের নিজেদের টিকে থাকার শর্ত।

একজন মানুষ যদি তার মত, চিন্তা, ভালোবাসা, বিশ্বাস প্রকাশ করতে না পারে—তাহলে সে বেঁচে থাকলেও মৃত।
রাষ্ট্রের উচিত হবে এই মৃত নীরবতা ভাঙা, ভয়মুক্ত নাগরিক তৈরি করা।

মানবাধিকার মানে কেবল স্লোগান নয়—এটা সেই আলো, যেটি ভয়কে হার মানায়।

শেষ কথা:
মানবাধিকার রক্ষার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তির নয়, এটি গোটা সমাজের আত্মার সংগ্রাম।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের হয়, তবে তাকে জনগণের কণ্ঠ ফিরিয়ে দিতে হবে।

কারণ, ভয় যে দিনে হার মানে, সেদিনই মানুষ সত্যিকারের স্বাধীন হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *