বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা আজ এক গভীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ঘরে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা অনলাইনে—নারী যেন কোথাও নিরাপদ নয়। অথচ এই সহিংসতার মূল শিকড় কেবল ব্যক্তি অপরাধে নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পিতৃতন্ত্র, মৌলবাদী চিন্তা ও রাজনৈতিক উদাসীনতার জটিল মেলবন্ধন।
সহিংসতার পরিসংখ্যান: সংখ্যার আড়ালে লুকানো বেদনা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রতি চারজনের মধ্যে তিনজন নারী—অর্থাৎ ৭৬ শতাংশ—জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা জীবনসঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৯ শতাংশ নারী গত এক বছরেই নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, এবং ৮.৩ শতাংশ নারী প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার।
অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের প্রথম নয় মাসে অন্তত ৬৫৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৮১ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ১২ জন নির্যাতনের পর আত্মহত্যা করেছেন।
এসব সংখ্যা কেবল নথিবদ্ধ মামলা; বাস্তবে সংখ্যা আরও ভয়াবহ। অনেক নারী এখনো “সম্মান হারানোর ভয়”, সামাজিক লজ্জা কিংবা বিচারহীনতার কারণে মুখ খুলতে পারেন না।
ডিজিটাল সহিংসতা: সাইবার বুলিংয়ের নতুন দুঃস্বপ্ন
প্রযুক্তির অগ্রগতি নারীদের জন্য যেমন সুযোগ এনেছে, তেমনি এনেছে নতুন বিপদ। ছবি বিকৃতি, ভয়েস ম্যানিপুলেশন, ভুয়া একাউন্ট থেকে হুমকি, “মেম” বানিয়ে অপমান—সবকিছু মিলে নারীর সম্মান প্রতিনিয়ত আক্রমণের মুখে।
২০২৩ সালে পুলিশের সাইবার ইউনিটে নারীর বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধের অভিযোগ বেড়েছে ৪৭ শতাংশ। কিন্তু এসব মামলার মাত্র ১ শতাংশ আদালতে বিচারাধীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ ঘটনাকে “ছোটখাটো বিষয়” বলে এড়িয়ে যায়।
ঢাকায় এক তরুণীকে পোশাক নিয়ে হেনস্তা করার ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হলেও, পরে থানায় ফুলের মালা দিয়ে বরণ করার দৃশ্য রাষ্ট্রের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে। এটি দেখায়, আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা কত গভীরভাবে প্রোথিত।
রাজনীতির ব্যর্থতা: নারী নেতৃত্ব, কিন্তু নারীর উন্নতি নয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীরা নেতৃত্বে থাকলেও, সাধারণ নারী সমাজ সেই নেতৃত্বের সুফল পাচ্ছে না। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই নারী নেতৃত্বাধীন, কিন্তু তাতে নারী-সমতা অর্জিত হয়নি। দলীয় কাঠামো, মনোনয়ন, অর্থায়ন বা নীতিনির্ধারণের জায়গাগুলো এখনো পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত। রাজনৈতিক দলগুলো নারী দিবসে বক্তব্য রাখে, কর্মসূচি পালন করে; কিন্তু বাস্তব পর্যায়ে নারীর নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান বা সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে যেমন নারীরা অপমানিত হন, তেমনি নিজেদের দলের ভেতরেও নারী কর্মীরা নিগৃহীত হন।
“এ যেন এক নির্মম বৈপরীত্য—নারী নেতৃত্বাধীন রাজনীতিতে নারীই সবচেয়ে অবরুদ্ধ।“
মৌলবাদ ও পিতৃতন্ত্র: নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযান
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় মৌলবাদী চিন্তা এখনো শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করে। এই চিন্তাধারা নারীকে “ঘরের ভিতর” সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে, আর তার পোশাক ও আচরণের ওপর সামাজিক নজরদারি চালায়। ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও সামাজিক নৈতিকতার নামে নারীর স্বাধীনতাকে দমন করার এই প্রবণতা নতুন নয়। মৌলবাদীরা বলে, “নারীর স্বাধীনতা সমাজে অস্থিরতা আনে”—কিন্তু বাস্তবে তারা সমাজের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যই টিকিয়ে রাখে।
সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন যথার্থই বলেছেন,“Religion is now the first obstacle to women’s advancement. Religion pulls human beings backwards—it goes against progressiveness.”
আর সমাজতাত্ত্বিক সিলভিয়া ওয়ালবি তাঁর Theorizing Patriarchy-তে লিখেছেন, Patriarchy is a system of social structures in which men dominate, oppress and exploit women.”
“বাংলাদেশের সমাজেও সেই কাঠামো আজও অটুট—ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাজনীতি একত্রে নারীকে নিয়ন্ত্রণের এক বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া তৈরি করেছে।“
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা: সুরক্ষার বদলে অপমান
নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইন আছে—নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ইত্যাদি। কিন্তু এসব আইনের প্রয়োগ প্রায়শই রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের শিকার হয়। নারীরা যখন থানায় অভিযোগ করতে যান, তখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রথমে তাঁদের পোশাক, চলাফেরা কিংবা আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা একবার বলেছিলেন—“মেয়েটা রাতে বাইরে কেন ছিল?”
এই এক বাক্যই দেখায়, আমাদের সমাজ এখনো অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করে। অপরাধের ন্যায্য বিচার না হলে, অপরাধী নয়—সমাজই অপরাধে সহযাত্রী হয়ে যায়।
মিডিয়া ও দেহরাজনীতি: সৌন্দর্যের নামে নিয়ন্ত্রণ
মিডিয়া, বিজ্ঞাপন ও বিনোদন শিল্প নারীর প্রতি দ্বৈত আচরণ করে। একদিকে “নারী ক্ষমতায়ন” প্রচারিত হয়, অন্যদিকে নারীকে ভোগ্যপণ্য বা “সৌন্দর্যের মাপকাঠি”-তে বেঁধে ফেলা হয়।
মার্কিন লেখক নাওমি উলফ তাঁর The Beauty Myth-এ লিখেছেন, “As women have climbed in power, the standards of beauty have grown more restrictive.” অর্থাৎ, নারীরা যত শক্তিশালী হন, সমাজ তত বেশি তাদের দেহ, পোশাক ও সৌন্দর্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বাংলাদেশের টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট—যেখানে আদর্শ নারী মানে অনুগত, কোমল ও নীরব সত্তা।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ: যেখানে নারীর মর্যাদা অনুপস্থিত
আমাদের পরিবার, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মেয়েদের শেখানো হয় “ভদ্র মেয়ে প্রতিবাদ করে না।”এই শিক্ষা মেয়েদের মধ্যে ভয়, অনিশ্চয়তা ও আত্মসমর্পণের সংস্কৃতি তৈরি করে।
ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর The Second Sex-এ লিখেছিলেন, “One is not born, but rather becomes, a woman.” অর্থাৎ, সমাজ-সংস্কৃতি নারীকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে সে নিজের অধীনতা মেনে নেয়।
“বাংলাদেশের নারী আজো সেই ‘গড়ে তোলা’ বাস্তবতার বন্দি।“
সমাধান: শিক্ষা, আইন ও সংস্কৃতির সংস্কার
নারীর সম্মানহানি ও সাইবার বুলিংয়ের এই সংকট থেকে বের হতে হলে কেবল নীতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন—
- জেন্ডার সংবেদনশীল শিক্ষা: প্রাথমিক স্তর থেকেই ছেলে-মেয়েদের সমান মর্যাদার চেতনা শেখাতে হবে।
- বিচার ব্যবস্থার জবাবদিহি: ধর্ষণ, নির্যাতন ও সাইবার অপরাধে দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
- রাজনৈতিক অঙ্গীকার: নারী নেতৃত্বের প্রচারণা নয়, বাস্তব সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- মিডিয়ার দায়বদ্ধতা: নারীকে ভোগ্যপণ্য নয়, নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।
- সাইবার নিরাপত্তা ও সহায়তা কেন্দ্র: ভুক্তভোগী নারীর জন্য নিরাপদ ও গোপন সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করতে হবে।
- পুরুষের ভূমিকা: নারী অধিকার শুধু নারীর নয়; এটি মানবাধিকারের প্রশ্ন।
শেষ কথা
বাংলাদেশের নারীরা শিক্ষা, রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই অগ্রগতি এখনো নিরাপত্তা ও মর্যাদার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। মৌলবাদ, রাজনীতি ও পুরুষতন্ত্র একত্রে নারীর অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে।
মানবাধিকার কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মৌলিক অধিকার। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা মানে সমাজকে সভ্যতার পথে ফিরিয়ে আনা। একটি দেশ তখনই সত্যিকারের মানবিক হয়, যখন তার অর্ধেক জনগোষ্ঠী—নারীরা—নিরাপদ, সম্মানিত ও স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই—আমরা কি সেই মানবিক বাংলাদেশ গড়তে পারব?
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











