গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস নিজেকে ধাত্রী বলতেন—যিনি শিশুর জন্ম দেন না, বরং চিন্তার জন্মে সহায়তা করেন। এই রূপক সভ্যতার ভিত্তিকে স্পষ্ট করে। শিক্ষক সেই ধাত্রী, যিনি মানুষের বিবেক, যুক্তিবোধ ও নাগরিক চেতনার জন্ম দেন। পৃথিবীর সব সভ্য সমাজেই শিক্ষককে বলা হয় সমাজের স্তম্ভ। কারণ শিক্ষকরাই ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরি করেন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের বীজ বপন করেন এবং সমাজকে যুক্তি ও মানবিকতার পথে পরিচালিত করেন। কিন্তু বাংলাদেশে আজ সেই স্তম্ভ ভাঙনের মুখে।
দেশের শিক্ষাঙ্গন এখন ভয়, হুমকি ও মব-সহিংসতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষকরা তাঁদের নিজ কর্মস্থলেই নিরাপত্তাহীন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের সময় আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হাসান মোহাম্মদ রোমানের ওপর হামলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দীনের ওপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ—এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো একটি গভীর কাঠামোগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
এই সংকটের দায় শুধু কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। বাংলাদেশ সরকার, প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং বিচারব্যবস্থা—সবাই শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। এই ব্যর্থতা এখন আর ব্যতিক্রম নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা উদ্বেগজনক। বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, গত এক দশকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলে দেড় শতাধিক শিক্ষক শারীরিক হামলা, গুরুতর হুমকি ও প্রকাশ্য অপমানের শিকার হয়েছেন। প্রতিবছর গড়ে ৩০–৪০ জন শিক্ষক সরাসরি সহিংসতার মুখে পড়েন। কিন্তু এর বিপরীতে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির হার অত্যন্ত কম। অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয় না, আর যেগুলো হয় সেগুলো বছরের পর বছর বিচারাধীন থাকে। এটি আইনের শাসনের সরাসরি ব্যর্থতা।
একজন শিক্ষক আক্রান্ত হলে তাঁর প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা প্রশাসন ও পুলিশ। বাস্তবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখায়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি ‘অভ্যন্তরীণ সমস্যা’ বলে এড়িয়ে যায়। বিচারব্যবস্থা—যেটি শেষ আশ্রয় হওয়ার কথা—সেখানে মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও দৃষ্টান্তমূলক রায়ের অভাব অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।
এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক ব্যর্থতা।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব। শিক্ষক একজন সাধারণ নাগরিক, যাঁর জীবন, মর্যাদা ও মতপ্রকাশের অধিকার সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত। শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষককে হুমকি দেওয়া বা আঘাত করা মানে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। রাষ্ট্র যখন এই লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়ায় না, তখন রাষ্ট্র নিজেই দায়ী হয়ে পড়ে।
এই সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক সংস্কৃতিও বড় ভূমিকা রাখছে। আওয়ামী লীগ (BAL), বিএনপি (BNP), জামায়াতে ইসলামী (BJI)সহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছাত্র ও শিক্ষক সংগঠন শিক্ষাঙ্গনকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনকে ব্যবহার করা হয়েছে; ক্ষমতার বাইরে থাকলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু যেই দলই ক্ষমতায় থাকুক, সরকার হিসেবে দায়িত্ব তাদেরই—এবং সেই দায়িত্ব পালনে ধারাবাহিক ব্যর্থতা স্পষ্ট।
এই বাস্তবতার সঙ্গে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর তুলনা করলে পার্থক্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যে কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা রাজনৈতিক কর্মীর হাতে হুমকি বা হামলার শিকার হন, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “জিরো টলারেন্স টু ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট টিচার্স” নীতিমালা কার্যকর রয়েছে। শিক্ষক নিগ্রহকে সেখানে শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়, গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।
জার্মানিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা হলে দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শিক্ষককে হুমকি দেওয়া রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ সেখানে শিক্ষককে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়।
কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষক সুরক্ষার জন্য বিশেষ প্রটোকল রয়েছে। কোনো শিক্ষক হুমকির মুখে পড়লে স্কুল বোর্ড, পুলিশ ও সামাজিক সেবা বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। অনেক রাজ্যে শিক্ষক নিগ্রহের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যদিও শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার সমস্যা আছে, তবুও শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং মামলাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। সেখানে কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর পক্ষে শিক্ষাঙ্গনে হামলা চালিয়ে পার পাওয়ার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই তুলনা দেখায়—পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে শিক্ষক সুরক্ষা রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। সেখানে শিক্ষক নিগ্রহ মানে শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত।
বাংলাদেশে এই বোধ এখনও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং এখানে শিক্ষক নিগ্রহ প্রায় ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে মেনে নেওয়ার এক বিপজ্জনক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এই দায়মুক্তির সংস্কৃতিই মব তৈরি করে। আজ শিক্ষক আক্রান্ত হচ্ছেন; কাল সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিচারকও হতে পারেন। ইতিহাস বলে—যখন রাষ্ট্র এক পেশাজীবী গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন শেষ পর্যন্ত কেউই নিরাপদ থাকে না।
এই ব্যর্থতার আন্তর্জাতিক প্রতিফলনও স্পষ্ট। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা আরোপ করেছে। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। এর অর্থ—রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।
সক্রেটিস যোগ্যতার নীতির কথা বলেছিলেন। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন—জুতা মেরামত করবে চর্মকার, রাষ্ট্র চালাবে রাজনীতিবিদ। কিন্তু আজ বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, রাজনীতিবিদরা শিক্ষাঙ্গনে দখলদারি করছেন, ছাত্রসংগঠন আইন নিজের হাতে নিচ্ছে, আর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিকার দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চিত্র নয়।
এই অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে মৌলিক ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করতে হবে এবং শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করার নির্দেশ ও বাস্তব ক্ষমতা দিতে হবে। শিক্ষক নিগ্রহের ঘটনায় দ্রুত মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে এসব মামলায় অগ্রাধিকার দিতে হবে, যাতে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক রায় অপরাধীদের নিরুৎসাহিত করে।
সবশেষে, রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রকেই স্বীকার করতে হবে—শিক্ষাঙ্গনে এই নৈরাজ্য তাদের ব্যর্থতার ফল।
শিক্ষকরা সমাজের স্তম্ভ। সেই স্তম্ভ ভেঙে পড়লে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও টেকসই হয় না। শিক্ষকদের সুরক্ষা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়—এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, নৈতিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ব। সক্রেটিসের উত্তরাধিকার রক্ষা করতে হলে, আজই সরকার, প্রশাসন, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থাকে তাদের ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস এই অবহেলার জন্য রাষ্ট্রকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











