ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো ভবনে আগুন, ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং নিউজ এজ সম্পাদক নুরুল কবিরের ওপর সংঘবদ্ধভাবে হেনস্তা—এই ঘটনাগুলোকে যদি আমরা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা বলে দেখি, তবে আমরা সত্যের একাংশই দেখব। এগুলো আসলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার কাঠামো এবং নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। এখানে আগুন জ্বলেছে শুধু কয়েকটি ভবনে নয়; আগুন ধরানো হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বে। এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কোনো ‘হঠাৎ উত্তেজিত জনতার’ কাজও নয়। এগুলো দীর্ঘদিন ধরে লালিত বিদ্বেষ, পরিকল্পিত উসকানি এবং রাষ্ট্রের ক্রমাগত নিষ্ক্রিয়তার ফল।
একটি সমাজে সংবাদপত্র যখন আক্রমণের শিকার হয়, তখন সেটি কেবল সাংবাদিকদের সংকট নয়—সেটি পুরো সমাজের সংকট। কারণ সংবাদপত্র হলো সমাজের আয়না। সেই আয়না ভেঙে ফেলার অর্থ হলো, রাষ্ট্র আর নিজের চেহারা দেখতে চায় না। প্রশ্ন হলো—এই আগুন কারা লাগাচ্ছে, কারা উসকানি দিচ্ছে, আর কারা নীরব থেকে সেই আগুনকে বড় হতে দিচ্ছে?
সংবাদপত্র ও সাংবাদিকরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিলাসিতা নয়—তারা কাঠামোর অংশ।
সংবাদপত্রকে সমাজের আয়না বলা হয়, কারণ সেখানে সমাজ নিজেকে দেখে—নিজের অসুস্থতা, অন্যায়, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার। আয়নাটি ভাঙার চেষ্টা মানে সমাজকে নিজের চেহারা দেখতে না দেওয়া। যারা সংবাদপত্রে আগুন ধরায়, তারা আসলে সত্য দেখার ক্ষমতাকেই ধ্বংস করতে চায়।
গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভের কথা আমরা বহুবার বলেছি—আইনসভা, নির্বাহী, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যম। সংবাদমাধ্যম দুর্বল হলে বাকি তিনটি স্তম্ভও জবাবদিহিহীন হয়ে পড়ে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের খবর যদি প্রকাশ না পায়, ক্ষমতার অপব্যবহার যদি প্রশ্নের মুখে না পড়ে, তবে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতাবানদের যন্ত্রে পরিণত হয়। সেই রাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার একটি খালি শব্দমাত্র।
এই সাম্প্রতিক সহিংসতার কেন্দ্রে রয়েছে ইসলামের নামে মৌলবাদী উসকানি। এখানে ইসলাম বিশ্বাসের নৈতিক কাঠামো হিসেবে উপস্থিত নয়; উপস্থিত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে। মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে যুক্তিকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। প্রশ্ন করলেই ‘ইসলামবিরোধী’, সমালোচনা করলেই ‘নাস্তিক’, ভিন্নমত মানেই ‘শত্রু’। এই মনস্তত্ত্ব থেকেই জন্ম নেয় মব ভায়োলেন্স—যেখানে ব্যক্তি নয়, জনতা সিদ্ধান্ত নেয়; আইন নয়, আবেগ শাসন করে।
এই উসকানির বড় অংশ সংগঠিত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ভিডিও ও পোস্টের মাধ্যমে দিনের পর দিন নির্দিষ্ট সংবাদপত্র, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা হয়েছে। নাম ও ছবি প্রকাশ করে একটি সামাজিক বৈধতা তৈরি করা হয়েছে—যেন এদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করা ন্যায্য। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়; এটি সরাসরি সহিংসতায় প্ররোচনা।
এই প্রেক্ষাপটে কয়েকজন প্রভাবশালী অনলাইন ব্যক্তিত্বের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পিনাকি ভট্টাচার্য ও ইলিয়াস হোসেনের বক্তব্য ও কনটেন্ট ঘিরে অভিযোগ রয়েছে—তারা ধারাবাহিকভাবে উত্তেজনা তৈরি করেছেন, সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে ‘শত্রু শিবির’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তারা হয়তো আগুন ধরাতে যাননি, কিন্তু আগুন ধরানোর ভাষা ও আবহ তৈরি করেছেন। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রভাবশালী কণ্ঠের দায়িত্ব বেশি—কারণ তাদের কথার প্রতিধ্বনি বহু দূর যায়।
এখানে প্রশ্ন ব্যক্তিগত দায় নয়; প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া। এসব উসকানি প্রকাশ্যে চলার পরও কেন কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? কেন হেট স্পিচ ও সহিংস আহ্বানের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ দেখা গেল না? কেন ঝুঁকিপূর্ণ সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরহীনতাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।
পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ কেবল ঘটনার পর উপস্থিত হওয়া নয়। তাদের দায়িত্ব আগাম সতর্কতা, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এখানে সেই দায়িত্ব পালনে স্পষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে। এই নিষ্ক্রিয়তা কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতা নয়; এটি সহিংসতার জন্য একটি নীরব প্রশ্রয়।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই মব ভায়োলেন্সের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা আহত হওয়া, সম্পদ ধ্বংস এবং প্রাণহানির দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা স্পষ্ট করেছে—ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়। বিচার হতে হবে ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং মানবাধিকারসম্মত; মৃত্যুদণ্ড নয়। এই অবস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রের শক্তি তার সহিংসতায় নয়, তার নৈতিকতায়।
এখানে আন্তর্জাতিক তুলনা জরুরি। বিশ্বের উন্নত গণতন্ত্রগুলোতেও তীব্র মতাদর্শিক বিভাজন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডানপন্থীরা বামঘেঁষা পত্রিকার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে, ইউরোপে অভিবাসন বা ধর্ম নিয়ে সংবাদমাধ্যমের অবস্থান ঘিরে তীব্র সমালোচনা হয়। কিন্তু একটি মৌলিক সীমা সেখানে অটুট—সংবাদপত্রের ভবনে আগুন দেওয়া যায় না, সাংবাদিককে জনতার হাতে তুলে দেওয়া যায় না। কারণ সেখানে একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ঐকমত্য আছে—মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশে সেই ঐকমত্য কেন দুর্বল? কেন মতভেদের জায়গায় আমরা শত্রু খুঁজি? কেন সমালোচনার জবাবে যুক্তি নয়, আগুন আসে? এর উত্তর আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতায় নিহিত। এখানে ধর্মকে রাজনীতির অস্ত্র বানানো হয়েছে, আর রাষ্ট্র সেই অপব্যবহার রুখতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেছে। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়; এর মানে রাষ্ট্র কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যার পক্ষ নেবে না, কোনো ধর্মীয় আবেগকে সহিংসতার বৈধতা দিতে দেবে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি—এই নীতি কাগজে আছে, বাস্তবে নয়। মৌলবাদী উসকানির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অস্পষ্ট অবস্থানই তাদের সাহস জোগাচ্ছে।
নুরুল কবিরের ওপর হামলা কেবল একজন সম্পাদকের ওপর নয়; এটি ভিন্নমতের ওপর আক্রমণ। প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার ভবনে আগুন দেওয়া মানে কেবল একটি পত্রিকাকে ভয় দেখানো নয়; এটি প্রতিটি নাগরিককে একটি বার্তা দেওয়া—ভিন্নমত ঝুঁকিপূর্ণ।
নাগরিক অধিকার কেবল ভোট দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাগরিক অধিকার মানে নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের মর্যাদা। যখন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন গণতন্ত্র একটি ফাঁপা কাঠামোতে পরিণত হয়—নাম থাকে, আত্মা থাকে না।
এই মুহূর্তে সরকারের সামনে আর কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। মৌলবাদী উসকানি, অনলাইন হেট স্পিচ ও সহিংসতার আহ্বানের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার দায় নির্ধারণ করতে হবে। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অবিলম্বে দায়িত্ব।
আগুন দিয়ে সংবাদপত্র পোড়ানো যায়। কিন্তু সত্য পোড়ানো যায় না। তবে নীরবতা দিয়ে গণতন্ত্রকে ধীরে ধীরে হত্যা করা যায়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি সেই নীরবতার পক্ষেই থাকবে, নাকি অবশেষে নিজের বিবেকের পক্ষে দাঁড়াবে?
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো ভবনে আগুন, ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা এবং একজন সম্পাদককে প্রকাশ্য রাস্তায় হেনস্তা—এই ঘটনাগুলোকে যদি আমরা কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা বলে দেখি, তবে আমরা সত্যের একাংশই দেখব। এগুলো আসলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, মানবাধিকার কাঠামো এবং নাগরিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। এখানে আগুন জ্বলেছে শুধু কয়েকটি ভবনে নয়; আগুন ধরানো হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় এবং রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বে।
একটি সমাজে সংবাদপত্র যখন আক্রমণের শিকার হয়, তখন সেটি কেবল সাংবাদিকদের সংকট নয়—সেটি পুরো সমাজের সংকট। কারণ সংবাদপত্র হলো সমাজের আয়না। সেই আয়না ভেঙে ফেলার অর্থ হলো, রাষ্ট্র আর নিজের চেহারা দেখতে চায় না। প্রশ্ন হলো—এই আগুন কারা লাগাচ্ছে, কারা উসকানি দিচ্ছে, আর কারা নীরব থেকে সেই আগুনকে বড় হতে দিচ্ছে?
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











