আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগস্ট ২০২৪-এর ঐতিহাসিক ‘মনসুন বিপ্লব’-এর পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি হবে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে—গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রের পথে, নাকি ভয়, বৈষম্য ও নিপীড়নের পুরনো চক্রে ফিরে যাবে—তার একটি নির্ধারণী মুহূর্ত।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশজুড়ে নারী, কন্যাশিশু ও ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যে ভয়াবহ উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে—বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই সময়ে নাগরিকদের মৌলিক নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় গুরুতরভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
নারী নিরাপত্তা: অগ্রগতির মুখোশের আড়ালে পশ্চাৎপসরণ
বাংলাদেশ পুলিশ ও নাগরিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ও বিশিষ্ট নারীবাদী কণ্ঠ ড. ফওজিয়া মসলেম এই পরিস্থিতিকে “সংগঠিত সামাজিক পশ্চাৎপসরণ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মীয় উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও রাষ্ট্রের নীরবতা নারীদের জন্য ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি করছে।
২০২৫ সালের মে মাসে কিছু কট্টর ধর্মীয় গোষ্ঠী প্রকাশ্যে নারীর অধিকার, লিঙ্গসমতা ও শিক্ষা-সংক্রান্ত উদ্যোগকে ‘ইসলামবিরোধী’ বলে আক্রমণ করে এবং সেগুলো বন্ধের দাবি তোলে। এই ঘটনার পর থেকেই নারী ও কন্যাশিশুরা শুধু রাস্তায় নয়, অনলাইনেও লাগাতার হুমকি, অপমান ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন নারীদের জন্য নতুন এক সংকট—যেখানে ট্রলিং, হুমকি ও সামাজিক বয়কট নারীদের মতপ্রকাশকে কার্যত স্তব্ধ করে দিচ্ছে।
সংখ্যালঘুদের রক্ত: রাষ্ট্রের ব্যর্থতার সবচেয়ে নির্মম দলিল
এই সহিংসতার চিত্র আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন আমরা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থার দিকে তাকাই। গত ডিসেম্বরে তরুণ গার্মেন্টকর্মী দীপু চন্দ্র দাসকে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানি নয়; এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার সম্পূর্ণ ব্যর্থতার প্রতীক।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য মানবাধিকার সংগঠনের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর অন্তত ৫১টি সহিংস ঘটনার নথিভুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১০টি হত্যাকাণ্ড। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিরাপত্তা বাহিনীর হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী গুরুতর লঙ্ঘন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, “বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা হলে আসন্ন নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে।”
রাজনীতিতে নারীর অনুপস্থিতি: গণতন্ত্রের শূন্যতা
বাংলাদেশ অতীতে দুইজন নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে—এই বাস্তবতা বারবার তুলে ধরা হয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। দেশের অন্যতম প্রধান দল জামায়াতে ইসলামী তাদের ২৭৬টি মনোনয়নের একটিতেও কোনো নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেনি।
রাজনীতিতে নারীর এই পরিকল্পিত অনুপস্থিতি স্পষ্ট করে দেয়—ক্ষমতার কাঠামো এখনও পুরুষতান্ত্রিক ও বর্জনমূলক। জাতিসংঘের নারী বিষয়ক বিশেষ দূত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, “নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক হতে পারে না।”
একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমার অবস্থান
আমি একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—গণতন্ত্র শুধু ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্র মানে নাগরিকের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতা ও ভয়হীন জীবনযাপন নিশ্চিত করা। যখন একটি রাষ্ট্র নারীকে চুপ করিয়ে দেয়, সংখ্যালঘুদের অরক্ষিত রাখে এবং সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে—তখন সেই রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক পরিচয় হারাতে শুরু করে।
মনসুন বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছিল—নাগরিক শক্তিই পরিবর্তনের মূল চালিকা। সেই বিপ্লবের মূল চেতনায় ছিল ন্যায়, মানবিক মর্যাদা ও অন্তর্ভুক্তি। আজ যদি আমরা নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘুর অধিকার ও নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হই, তবে সেই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।
করণীয় কী?
বাংলাদেশ সরকারের সামনে এখনো সুযোগ আছে। নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, জাতিসংঘের নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) এজেন্ডা অনুসরণ, এবং CEDAW ও ICCPR-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এখন আর বিকল্প নয়—এগুলো বাধ্যবাধকতা।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব আছে—নারী ও সংখ্যালঘুদের বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে: সহিংসতার কোনো জায়গা নেই।
শেষ কথা
বাংলাদেশ এখন একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস আমাদের জিজ্ঞেস করবে—এই সময়ে আমরা কি নীরব দর্শক ছিলাম, নাকি মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলাম?
গণতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে নয়—এটি টিকে থাকে মানুষের জীবনে, নিরাপত্তায় ও মর্যাদায়। সেই গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব আজ আমাদের সবার।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











