বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

February 4, 2026 7:00 am
February 4, 2026 7:00 am

ভোটের বাক্সে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি: ধর্ম, রাজনীতি ও নাগরিক বিবেক

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নতুন নয়। তবে সময়ের সঙ্গে তার ভাষা, কৌশল ও প্রকাশভঙ্গি বদলেছে। একসময় মসজিদের মিম্বর, ওয়াজের মাহফিল কিংবা গ্রাম্য উঠোন ছিল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক প্রচারের প্রধান ক্ষেত্র। এখন সেই ভূমিকা নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব লাইভ, ভাইরাল ভিডিও ও সংগঠিত অনলাইন প্রচারযন্ত্র। ফলে ধর্মীয় বক্তব্যের অপব্যবহার যেমন দ্রুত ছড়াচ্ছে, তেমনি তা যাচাই ও সমালোচনার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।

 

আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা আবারও দেখছি—কিছু রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ইসলামি পরিচয়ধারী দলগুলো, ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট’, ‘ইসলামের পক্ষে ভোট’, এমনকি কোথাও কোথাও ‘ভোট দিলে জান্নাতের নিশ্চয়তা’—এ ধরনের ভাষ্য জনপরিসরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু ইসলামি দল নয়, বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশের প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলই কোনো না কোনো সময়ে ধর্মকে ভোটের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিএনপি তার ইতিহাসে বহুবার ধর্মীয় আবেগ ও পরিচয়কে রাজনৈতিক ভাষ্য বানিয়েছে; আওয়ামী লীগও রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের কথা বললেও বাস্তবে ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে আপস করেছে।

 

সম্প্রতি রংপুরে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘কোরবানি’ শব্দের ধর্মীয় তাৎপর্যকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা করে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—এটি ইসলামের ভাষার গভীর অপব্যবহার। একইভাবে ঝালকাঠিতে জামায়াতের এক প্রার্থীর বক্তব্য—‘বিড়িতে সুখটানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারেন’—ধর্মীয় নৈতিকতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। পরে দলীয়ভাবে শোকজ করা হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়: এসব কি বিচ্ছিন্ন ভুল, নাকি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ভাষার অংশ?

 

ধর্ম কোনো দলীয় প্রতীক নয়, কোনো নির্বাচনী মার্কারও নয়। ইসলামে ইমান, তাকওয়া, ক্ষমা কিংবা জান্নাত—এসব বিষয় আল্লাহ ও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়। কোরআনে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, ‘তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে সামান্য মূল্যে বিক্রি করো না।’ ধর্মকে রাজনৈতিক লাভের হাতিয়ার বানানো ইসলামি দৃষ্টিতে শুধু ভুল নয়, নৈতিকভাবে গুরুতর অপরাধ।

 

তবু প্রশ্ন হলো—এই প্রচারণা কেন বারবার ফিরে আসে? কারণ রাজনীতিতে ধর্ম একটি সহজ, আবেগনির্ভর ও শক্তিশালী অস্ত্র। যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি বা মানবাধিকার নিয়ে জবাবদিহি কঠিন, সেখানে ধর্মের স্লোগান দিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া সহজ। ভোটারকে নাগরিক হিসেবে নয়, বিশ্বাসী হিসেবে সম্বোধন করলে তার স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়।

 

এখানে একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো আলেম সমাজের নীরবতা। ইসলামি ভাষ্য যখন প্রকাশ্যে বিকৃত হচ্ছে, তখন অনেক আলেম ও ধর্মীয় নেতা প্রকাশ্য প্রতিবাদে অনুপস্থিত। অথচ কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিও না এবং সত্য গোপন করো না।’ নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে তা অন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার নামান্তর।

 

ধর্মের অপব্যবহার শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; অন্য ধর্মের প্রতিও অসম্মান তৈরি করছে। চাঁদপুরে হিন্দু ধর্মীয় প্রতীকের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি ব্যবহার করে উত্তেজনা সৃষ্টির অভিযোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক বিভাজনই বাড়ায়। অথচ ইসলাম অন্য ধর্মকে অপমান করতে স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে।

 

আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো অনলাইন রাজনীতি। সংগঠিত ‘বট বাহিনী’, কটূক্তি, ব্যঙ্গ, চরিত্রহনন—এসব এখন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠছে। কোরআন যেখানে গিবত, অপমান ও উপহাস কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে, সেখানে ধর্মের নামে এসব আচরণ দ্বিচারিতার নগ্ন উদাহরণ।

 

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কোন পথে যেতে চায়? একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভোটার সিদ্ধান্ত নেবে কর্মসূচি, নীতি, অতীত কাজ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তিতে। ধর্ম নাগরিকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা; রাষ্ট্র ও নির্বাচন সেই বিশ্বাসের ওপর শর্ত আরোপ করতে পারে না।

 

ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। এর মানে হলো—রাষ্ট্র সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণ করবে এবং কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার হতে দেবে না। গণতন্ত্রের মূল শক্তি নাগরিকের স্বাধীন পছন্দ; সেই পছন্দ ভয়, লোভ কিংবা আখিরাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হলে তা আর স্বাধীন থাকে না।

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মকে ‘ব্যবসা’ বানিয়ে ভোট আদায়ের যে পুরোনো মডেল, তা আজ ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। মানুষ বদলেছে, সমাজ বদলেছে, তথ্যপ্রবাহ বদলেছে। ডিজিটাল যুগে সত্য গোপন রাখা কঠিন। ধর্মীয় আবেগ হয়তো সাময়িকভাবে কাজ করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে।

 

২০২৬ সালের নির্বাচন যদি সত্যিকার অর্থে অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হতে হয়, তবে সব রাজনৈতিক দলেরই ধর্মকে ভোটের হাতিয়ার বানানোর প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। ইসলামি দল হোক বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দল—সবাইকে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কোনো দলের নয়; রাষ্ট্র নাগরিকের।

 

ভোটের বাক্সে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি নয়, চাই জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও মানবিক রাজনীতি। সেটিই গণতন্ত্রের পথ, সেটিই ধর্মের নৈতিকতার সঙ্গেও সবচেয়ে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী ও লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *