আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে অনেক নিয়ম লেখা থাকে কাগজে, আর অনেক নিয়ম লেখা থাকে নীরবতায়। সংবিধানে মানবাধিকার আছে, আইনে সমতা আছে, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে মর্যাদা আছে—কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে এমন এক অদৃশ্য আইন কাজ করে, যা কাউকে চুপ থাকতে শেখায়, কাউকে মাথা নিচু করতে শেখায়, আবার কাউকে শেখায় কীভাবে অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
এই অদৃশ্য আইন সবচেয়ে বেশি কাজ করে নারীদের জীবনে, সংখ্যালঘুদের জীবনে, আর সেই মানুষদের জীবনে—যাদের ভালোবাসা সমাজের অনুমোদিত তালিকায় পড়ে না।
একজন তরুণীকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, “তুমি কেন রাতে একা বের হও না?”—সে সাধারণত কোনো বড় তত্ত্ব শোনায় না। সে বলে, “ভয় লাগে।”
এই ভয় কোনো একদিন হঠাৎ জন্মায় না। এই ভয় জন্মায় সেই শৈশব থেকে, যখন তাকে শেখানো হয়—ভালো মেয়েরা বেশি কথা বলে না, বেশি হাসে না, বেশি স্বাধীন হয় না।
আইন তাকে সমান নাগরিক বলে স্বীকৃতি দিলেও সমাজ তাকে বলে—তুমি আগে নারী, পরে মানুষ।
ধর্মের কথা এখানে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। ধর্ম আমাদের সমাজে শুধু বিশ্বাসের জায়গা নয়, এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক ভাষা। এই ভাষা দিয়ে মানুষ সান্ত্বনা পায়, আবার এই ভাষা দিয়েই অনেক সময় মানুষকে দমিয়ে রাখা হয়।
ধর্মের নামে বলা হয়—এটা হারাম, ওটা নিষিদ্ধ, ওটা লজ্জার।
কিন্তু খুব কম সময়ই বলা হয়—অপমান হারাম, নির্যাতন হারাম, অন্যের জীবন নিয়ন্ত্রণ করাও হারাম।
একজন মেয়ের পোশাক নিয়ে আলোচনা হয় ধর্মের নামে, কিন্তু একজন পুরুষের সহিংসতা নিয়ে ধর্মীয় আলোচনা খুব কমই শোনা যায়।
একজন সমকামী তরুণের ভালোবাসা নিয়ে ফতোয়া হয়, কিন্তু পরিবার থেকে তাকে বের করে দেওয়ার নিষ্ঠুরতা নিয়ে নীরবতা থাকে।
এই নীরবতাই আমাদের সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী আইন।
মানবাধিকার কাগজে লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ নির্ভর করে সমাজের মনোভাবের ওপর।
একজন নারী আইনি ভাবে সমান অধিকার পেলেও, অফিসে তার কণ্ঠস্বর কতটা গুরুত্ব পায়?
একজন সংখ্যালঘু নাগরিক ভোট দিতে পারলেও, সে কি নিরাপদ বোধ করে?
একজন ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষ আইনের চোখে অপরাধী না হলেও, সে কি প্রকাশ্যে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে?
আমরা প্রায়ই বলি—সমস্যা আইনগত নয়, সামাজিক।
এই কথাটা অর্ধেক সত্য।
কারণ সামাজিক সমস্যা তখনই বড় হয়, যখন আইন দুর্বল থাকে, আর রাষ্ট্র নীরব থাকে।
যেখানে নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করতে গেলে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়,
যেখানে ধর্ষণের পর মেয়েটিকে চরিত্র প্রমাণ করতে হয়,
যেখানে সংখ্যালঘু নির্যাতনের পর বলা হয়—“দুই পক্ষের ঝামেলা”—
সেখানে আইন কেবল বইয়ের ভেতর থাকে, জীবনের ভেতর নয়।
ধর্মীয় উগ্রবাদ এই নীরবতার ওপর দাঁড়িয়েই শক্তিশালী হয়।
উগ্রবাদ কখনো হঠাৎ আসে না।
এটি আসে ধীরে ধীরে—প্রথমে ভাষায়, পরে আচরণে, শেষে অস্ত্রে।
প্রথমে বলা হয়—তুমি আমাদের মতো নও।
তারপর বলা হয়—তুমি ভুল।
তারপর বলা হয়—তুমি বিপজ্জনক।
সবশেষে বলা হয়—তুমি বাঁচার যোগ্য নও।
এই পথচলাকে থামানোর একমাত্র উপায় হলো—প্রশ্ন করা।
কিন্তু আমাদের সমাজ প্রশ্ন করতে ভয় পায়।
ধর্ম নিয়ে প্রশ্ন করলে বলা হয়—তুমি নাস্তিক।
পরিবার নিয়ে প্রশ্ন করলে বলা হয়—তুমি অকৃতজ্ঞ।
রাষ্ট্র নিয়ে প্রশ্ন করলে বলা হয়—তুমি দেশদ্রোহী।
এভাবে প্রশ্নহীন এক সমাজ তৈরি হয়, যেখানে অন্যায় ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়।
একজন কিশোরী যখন বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না,
একজন নারী যখন যৌন হয়রানির কথা লুকিয়ে রাখে,
একজন তরুণ যখন নিজের পরিচয় গোপন করে বাঁচে—
তখন আমরা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি দেখি।
কিন্তু আসলে এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নীরব দলিল।
মানবাধিকার মানে শুধু বড় বড় সেমিনার নয়, আন্তর্জাতিক দিবস নয়, রঙিন পোস্টার নয়।
মানবাধিকার মানে—একজন মানুষ যেন নিজের ঘরে, নিজের শরীরে, নিজের বিশ্বাসে নিরাপদ থাকে।
ধর্ম মানে শুধু আচার নয়, নিয়ম নয়, নিষেধ নয়।
ধর্ম মানে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো, দুর্বলকে রক্ষা করা, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা।
আর রাষ্ট্র মানে শুধু প্রশাসন নয়।
রাষ্ট্র মানে—নাগরিকের ভয় কমানো, সাহস বাড়ানো, নীরবতা ভাঙা।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট আইন বা উন্নয়ন নয়।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো—আমরা ধীরে ধীরে অন্যায়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে যাচ্ছি।
খবরের কাগজে আরেকটি ধর্ষণের খবর পড়ে আমরা বলি—“খুব খারাপ।”
আরেকটি সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর পড়ে আমরা বলি—“দুঃখজনক।”
আরেকটি উগ্রবাদী হামলার খবর পড়ে আমরা বলি—“দোষীদের শাস্তি হোক।”
কিন্তু খুব কম সময়ই আমরা নিজেদের প্রশ্ন করি—
এই সমাজটা এমন হলো কীভাবে?
নীরবতার ভেতর যে আইন লুকিয়ে থাকে, সেটাই আমাদের আসল শত্রু।
এই আইন ভাঙতে হলে বড় বিপ্লব লাগে না।
লাগে ছোট ছোট সাহস—
ভয় পেলেও কথা বলা,
জনপ্রিয় মতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,
দুর্বল মানুষের পাশে থাকা।
কারণ ইতিহাস বলে,
সব উগ্রবাদ আগে ভাষায় জন্মায়,
সব নিপীড়ন আগে নীরবতায় শক্ত হয়,
আর সব পরিবর্তন শুরু হয় একজন মানুষের প্রশ্ন থেকে।
লিখেছেন- Jannatun Nayem Jannat










