কোনো জাতির ইতিহাসে এমন মুহূর্ত আসে যখন আমরা বুঝতে বাধ্য হই যে, বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের মান কেবল আদালতের রায় দিয়ে মাপা যায় না। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা মামলার রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দুটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল একটি ব্যক্তিগত শাস্তি নয়; এটি পুরো সমাজের নৈতিক, সামাজিক এবং বিচারিক মানদণ্ডের পরীক্ষার মুহূর্ত। একই সময়ে, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তার শাসনামলে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছে, যা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টে নিশ্চিত। এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক ব্যর্থতার এক কঠিন স্বাক্ষ্য।
রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু ওই সময় নিরাপত্তা বাহিনী—যাদের কাজ ছিল জনগণকে রক্ষা করা—তারা সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়ে নিরীহ মানুষের ওপর সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন নির্দেশ করে।
আদালতের মৃত্যুদণ্ড প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থা দুটি দিক নির্দেশ করছে: accountability অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু বিচার ফ্রি ও ফেয়ার ট্রায়াল এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে। Human Rights Watch বলেছে:“The trial of former Prime Minister Sheikh Hasina failed to meet international fair‑trial standards. She was tried in absentia, and the court-appointed defence lawyer did not have sufficient time to prepare.”
Amnesty International মন্তব্য করেছে:“The death sentence pronounced against Sheikh Hasina, in a process marred by a lack of transparency and due process, risks perpetuating a culture where justice is subordinated to retribution.”
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে। প্রথমত, accountability অপরিহার্য, এবং শেখ হাসিনা বিচার এড়াতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, বিচার শুধু শাস্তি নয়, মানবিক ও আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড অনুযায়ী হতে হবে। একজন মানুষ হিসেবে শেখ হাসিনার মৌলিক মানবাধিকারের অধিকার রক্ষা পেতে হবে।
মানবাধিকার-ভিত্তিক উদ্বেগ: ন্যায্য বিচার কি হয়েছে? নিচে কয়েকটি মূল দিক তুলে ধরা হলো যেখানে ন্যায্যতা বা নাগরিক অধিকার রক্ষা কতটা সম্ভব হলো বা সমস্যার সৃষ্টি হলো:
- বিচার in absentia (অনুপস্থিতিতে বিচার)
- শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায়ে অন্যত্র উপস্থিত ছিলেন না (“in absentia”)।
- এই ধরনের বিচার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন বিশেষ করে গৃহীত চুক্তি (যেমন, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কনভেনশন, ICCPR) এর fair trial প্রিন্সিপালের সঙ্গে সংঘর্ষ করতে পারে।
- Human Rights Watch (HRW) এহেতু উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, “in absentia” বিচার প্রক্রিয়া দোষীদের পক্ষে পুরো আত্মরক্ষা করার সুযোগ বন্ধ করে দেয় সাক্ষ্য চ্যালেঞ্জ করা, প্রতিপক্ষ যুক্ত করা, সুষ্ঠু প্রতিরক্ষা গঠন করা কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
আইনি প্রতিনিধিত্ব ও প্রতিরক্ষা অধিকারের সীমাবদ্ধতা Amnesty International তাদের বিবৃতিতে ব্যাখ্যা করেছে যে, আদালত-গত পন্থায় আত্মরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সময় ও স্বাধীন আইনজীবী বেছে নেয়ার সুযোগ নিষিদ্ধ মনে হয়েছিল। তারা বলেছে যে কোর্ট-নিয়োগ করা আইনজীবী (court-appointed lawyer) ছিল, কিন্তু প্রস্তুতির সময় ছিল অপ্রতুল এবং সাক্ষ্য ও প্রমাণ পরীক্ষণের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের একটি ন্যায্য সুযোগ ছিল না। এটি প্রমাণ করে যে বিচারপ্রক্রিয়া ন্যায্যতার মানদণ্ডে ভঙ্গ হতে পারে, বিশেষ করে একটি গুরুতর এবং রাজনৈতিক অর্থবহ মামলার ক্ষেত্রে।
মৃত্যুদণ্ড: সর্বোচ্চ শাস্তি কি সমানভাবে ভয়ংকর? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা
Amnesty International বলেছে, “মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি অতিরিক্ত মাত্রা যুক্ত করে” এবং এটি “নিষ্ঠুর, অবমাননাকর এবং অনমানব্যঞ্জক” শাস্তি। তাদের দৃষ্টিকোণ খুব স্পষ্ট — এমন একটি মামলায় যেখানে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিরক্ষা অধিকার এবং সসপেকশন অন্বেষণ প্রশ্নবিদ্ধ, মৃত্যুদণ্ড ন্যায্যতা অর্জনের উপায়ে পরিণত হওয়ার পরিবর্তে নিজেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
Amnesty আরও বলেছে যে, এই রায় “ন্যায় প্রক্রিয়ায় দেওয়া হয়নি” — কারণ “প্রসতির সময় খুব অল্প ছিল, উপযুক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সুযোগ সীমিত ছিল এবং আইনজীবীর পছন্দ স্বাধীন ছিল না।”
এইভাবে, মৃত্যুদণ্ড তার নিজস্ব আন্দোলন তৈরি করে — যদি বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে শাস্তি যত বড়ই হোক, এটি অধিকার ও ন্যায্যতার প্রতিশ্রুতি হিসেবে কাজ করবে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, ক্ষমতাসীন সরকার প্রায়শই বিচারব্যবস্থাকে প্রতিশোধমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। নির্বাচনের পর প্রাক্তন নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা তৈরি করা হয়, যা সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ণ করে। বর্তমান মৃত্যুদণ্ডও এই প্রেক্ষাপটে বিচার করতে হবে।
তবে জুলাই মাসের হত্যাকাণ্ডকে আমরা ভুলে যেতে পারি না। প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই নাগরিক হিসেবে নিজেদের মৌলিক অধিকার হারিয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তাদের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষা করা, কিন্তু তারা হত্যার শিকার হয়েছে। এটি আমাদের শেখায় যে, বিচার যদি রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা হয়, তবে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ দেখায়, সঠিক ন্যায়বিচার সম্ভব। দক্ষিণ আফ্রিকার Truth and Reconciliation Commission (TRC) গঠিত হয়েছিল অ্যাপারথেইডের পর, যেখানে অপরাধীদের দায় স্বীকার করা হয় এবং সত্য প্রকাশ করা হয়। রুয়ান্ডার ICTR (International Criminal Tribunal for Rwanda) গণহত্যার দায়ীদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রায় দিয়েছে। এই উদাহরণগুলো প্রমাণ করে, শাস্তি এবং বিচার কেবল প্রতিশোধ নয়; এটি স্বচ্ছতা, মানবিকতা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।
যদি আমরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তাহলে কিছু সত্য অস্পষ্ট নয়। বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। আদালতে দীর্ঘমেয়াদী এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভাব আছে। অতীতে দেখা গেছে, যেকোনো ক্ষমতাসীন সরকার প্রাক্তন প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে মামলা করে প্রতিশোধ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমেছে।
এবার আমাদের প্রশ্ন হলো—কীভাবে বাংলাদেশ একটি ন্যায়নিষ্ঠ ও মানবিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে? উত্তর স্পষ্ট, তবে বাস্তবায়ন কঠিন।
প্রথমত, বিচারব্যবস্থা সংস্কার অপরিহার্য। স্বাধীন, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ট্রায়াল নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষককে অংশগ্রহণ করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার বা রাজনৈতিক চাপ থাকলে তা স্বচ্ছতা হ্রাস করে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনী সংস্কার প্রয়োজন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে নাগরিক রক্ষার দায়িত্বে রাখতে হবে, হত্যাকারীর হাতিয়ার নয়। বাহিনীকে মৌলিক মানবাধিকার ও জবাবদিহির প্রশিক্ষণ দিয়ে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তৃতীয়ত, Truth and Reconciliation Commission (TRC) গঠন করতে হবে। অতীতের হত্যাকাণ্ড, লঙ্ঘন ও মানবাধিকার হানির সত্য প্রকাশ করতে হবে। এটি শুধু প্রতিশোধ নয়, বরং সমাজ পুনর্গঠনের দিকেও মনোযোগ দেয়।
চতুর্থত, মানবাধিকার শিক্ষার প্রসার অপরিহার্য। প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সাধারণ জনগণকে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করা প্রয়োজন। এটি শুধুমাত্র ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না, বরং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনে।
পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জরুরি। UN, HRW, Amnesty International-এর সঙ্গে সমন্বয় ও তদারকি নিশ্চিত করলে বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
এই মুহূর্তে আমাদের শিক্ষণীয় দিকটি স্পষ্ট—শুধু শাস্তি দেওয়াই যথেষ্ট নয়। বিচার কখনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হতে পারবে না। একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার সর্বদা রক্ষা পেতে হবে, সে নেতা হোক বা সাধারণ মানুষ।
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড এবং জুলাই মাসের হত্যাকাণ্ড আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও বিচারিক পরীক্ষার মুহূর্ত। আমাদের সমাজের সামনে প্রশ্ন স্পষ্ট: আমরা কি শুধুমাত্র প্রতিশোধ দেখব, নাকি ন্যায়, মানবাধিকার ও সত্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় শুরু করব?
উত্তরটি আমাদের সকলের হাতে। এই মুহূর্তে সমাজ, প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব একসাথে, যেন ভবিষ্যতে বিচার শুধুই প্রতিশোধ নয়, মানবিক ও স্বচ্ছতার প্রতীক হয়।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











