বাংলার ইতিহাসে বাউল–ফকিররা শুধু সংগীতশিল্পী নন; তারা আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ, বহুত্ববাদ, সাম্য ও মুক্তচিন্তার ধারক। তাদের গান শুধু শিল্প নয়, চিন্তার পাঠশালা—যা ধর্মীয় কট্টরতার বাইরে মানবিকতার দিকে আহ্বান জানায়। কিন্তু আজ সেই আলোছায়ার ঐতিহ্যই সবচেয়ে বেশি আক্রমণের শিকার। সাম্প্রতিক ঘটনা প্রমাণ করছে, বাউল–ফকিরদের ওপর নিপীড়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব, যার লক্ষ্য বাংলার বহুত্ববাদী সমাজ–চেতনাকে দমন করা।
রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রচার—পয়লা বৈশাখে বাউলদের প্রথম সারিতে রাখা, লালন স্মরণে আন্তর্জাতিক সম্মেলন করা—এসব দেখে কেউ মনে করতে পারেন, বাউল–ফকিররা এই দেশে মর্যাদা পান। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে নিপীড়নের ভয়াবহ বৃদ্ধি, রাষ্ট্রের নীরবতা এবং মৌলবাদী গোষ্ঠীর লাগামহীন উত্থান।
এই বৈপরীত্য শুধু সাংস্কৃতিক নয়; এটি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও মানবিক সমাজ ধারণার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
সাম্প্রতিক নিপীড়নের চিত্র: পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, বাউল–ফকিরদের ওপর নিপীড়ন কোনো দুর্ঘটনা বা বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়; এটি ধারাবাহিক দমননীতি।
১. আবুল সরকারের গ্রেপ্তার; ২০ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন খ্যাতিমান বাউলশিল্পী ও বাংলাদেশ বাউল সমিতির সভাপতি আবুল সরকার। অভিযোগ—“ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”।
- তাঁকে মাদারীপুরের একটি পালাগানের আসর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
- পরে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানো হয়।
- পুলিশ দাবি করে, তাঁর “নিরাপত্তার জন্য” তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে—কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল হামলাকারী নয়, ভুক্তভোগীকেই আটক করার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।
২. প্রতিবাদকারীদের ওপর হামলা; অবিচারের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশ নেওয়া বাউল–সাধক ও তাদের অনুসারীদের ওপর হামলা হয় বিভিন্ন স্থানে।
- মানিকগঞ্জে তৌহিদী জনতার হামলায় ৩–৪ জন আহত।
- ঠাকুরগাঁও আদালত প্রাঙ্গণে বাউলসমর্থকদের ওপর আরেক হামলায় ৪ জন আহত।
- আরও কয়েকটি জেলা—খুলনা, ঝিনাইদহ, মাদারীপুর—এ বিক্ষিপ্ত হামলার খবর পাওয়া যায়।
মোটামুটি নভেম্বরের শেষ সপ্তাহেই ৭–৮ জন বাউল ও সমর্থক আহত, এবং দেশজুড়ে দুঃশ্চিন্তার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
৩. মাজার–আখড়ায় আক্রমণ; জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই বাউল–ফকিরদের আখড়া, মাজার, সাধনাকুঞ্জ, ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবর পর্যন্ত ভাঙচুর হয়েছে। এগুলো বিচ্ছিন্ন নয়—জাতীয় সম্প্রীতির উপর সরাসরি আক্রমণ।
৪. প্রশাসনের ভূমিকা; নীরবতা না সমর্থন? আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুলিশ ভুক্তভোগীকে রক্ষার চেয়ে ‘প্রেশার গ্রুপের’ মতামত অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
হামলাকারীরা গ্রেপ্তার হচ্ছে না; বরং নিপীড়িতরাই আনুষ্ঠানিক হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্র–প্রশাসনের এই নীরবতা দমননীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
কেন এই নিপীড়ন বাড়ছে? কারণ বিশ্লেষণ
১. ধর্মীয় একত্ববাদী রাজনীতির উত্থান
বাউল–ফকিরদের দর্শন ধর্মীয় বহুত্ববাদ, ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক মুক্তির কথা বলে। মৌলবাদী গোষ্ঠীর কাছে এই দর্শন স্বভাবতই ‘বিপজ্জনক’। তাই “ধর্ম অবমাননা”র মতো অভিযোগ তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
২. সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে ক্ষমতার নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ধর্মীয় জাতিসত্তাভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো এটিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে—বহুমতকে দমন করে নিজেদের কর্তৃত্ব বিস্তারের। লক্ষ্য: ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচিন্তা দুর্বল করা।
৩. রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ক্রিয়তা
যে রাষ্ট্র গ্রেপ্তার করে ভুক্তভোগীকে, আর হামলাকারীকে “নিয়ন্ত্রণহীন জনতা” বলে চিহ্নিত করে—সেই রাষ্ট্র তার ধর্মনিরপেক্ষ, নাগরিক–অধিকার–ভিত্তিক মূলনীতিকে ত্যাগ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই নিষ্ক্রিয়তা বাস্তবে মৌলবাদী গোষ্ঠীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করছে।
৪. ভিডিও অপপ্রচার ও সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ধর্মীয় উত্তেজনা’
একটি পালাগানের আংশিক ভিডিও কাটছাঁট করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নানা জায়গায়।
সমস্ত প্রেক্ষাপট বাদ দিয়ে কয়েকটি লাইন ভাইরাল করা হয়েছে—এ যেন সমাজে বিদ্বেষ তৈরি করার সুবিন্যস্ত কৌশল। বাউলদের আধ্যাত্মিক তুলনামূলক আলোচনাকে ‘ধর্মবিরোধী প্রচারণা’ হিসেবে হাজির করা হয়েছে উদ্দেশ্যমূলকভাবে।
সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব: আক্রমণের বৈশিষ্ট্য
আজকের ঘটনার লেবেল—“ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত”—আসলে একটি রাজনৈতিক ছদ্মবেশ। পারস্পরিক ভিন্নতা, বিস্তার, মানবতা ও প্রশ্ন করার ক্ষমতাকে দমন করাই উদ্দেশ্য। গান বন্ধ করা মানে কণ্ঠরোধ করা। আখড়া ভাঙা মানে স্মৃতি নষ্ট করা।
বাউলদের ভয় দেখানো মানে বাংলার মরমি চেতনার ওপর আক্রমণ।
এই কারণেই এটি সাংস্কৃতিক প্রতিবিপ্লব—যা শুধুই অতীতের অর্জন নয়, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিকেও ধ্বংস করছে।
মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাগরিক স্বাধীনতার দৃষ্টিতে
একটি আধুনিক রাষ্ট্র তিনটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—
১. মানবাধিকার
প্রত্যেক নাগরিকের—
- মতপ্রকাশের অধিকার,
- সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার,
- ধর্মীয় ও অ-ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা,
- নিরাপত্তা ও মর্যাদা— রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হয়।
বাউল–ফকিরদের ক্ষেত্রে এই মৌলিক অধিকারগুলো ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে।
যে মানুষ গান গেয়ে শিখিয়েছে মানবকে ভালোবাসতে, তাকেই “ধর্মের শত্রু” হিসেবে হাজির করা হচ্ছে। এটি শুধু ভুক্তভোগীর ওপর নয়—সমগ্র সমাজের অধিকারকে অপদস্থ করছে।
২. ধর্মনিরপেক্ষতা
ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়; বরং সব ধর্ম, সব মত, সব চিন্তার সমান মর্যাদা।
যখন রাষ্ট্র ‘ধর্মীয় চাপে’ ভিন্নমত দমন করে, তখন সেটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র থাকে না—বরং মতাদর্শিক রাষ্ট্রে রূপ নেয়।
আজ সেই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। যে দেশে লালন, হাসন রাজা, জারি–সারি–মরমি গান জন্ম নিয়েছে, সেই দেশে বাউলদেরই আজ নিরাপত্তাহীনতা—এ এক গভীর আত্মবিরোধ।
৩. নাগরিক স্বাধীনতা
যখন একজন শিল্পী রাষ্ট্রের কাছে নিরাপদ না, যখন জনতা আক্রমণের শিকার হয় পুলিশের চোখের সামনে, যখন মুক্তচিন্তার পরিবেশ বরবাদ হয়—তখন পুরো সমাজই অনিরাপদ হয়ে পড়ে। নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে না শুধুমাত্র টহলদারিতে; গড়ে ওঠে স্বাধীনতার চর্চায়।
এখন করণীয়: কীভাবে উত্তরণ সম্ভব?
১. জাতীয় ঐতিহ্য রক্ষা আইন (National Heritage Protection Act) প্রণয়ন জরুরি
বাউল আখড়া, মাজার, সাধনার ঐতিহ্য, পালাগান, লোকসংগীত—এসবকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত। এতে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সাধকেরা আইনি সুরক্ষা পাবেন।
২. হামলাকারীদের বিচারের আওতায় আনা
রাষ্ট্র যদি হামলাকারীদের দমন না করে, বরং ভুক্তভোগীর ওপর দায় চাপায়—তাহলে তা মৌলবাদী শক্তিকে বৈধতা দেয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—সাংস্কৃতিক সহিংসতার জায়গায় কোনো ছাড় নেই।
৩. নাগরিক সমাজ, শিক্ষাঙ্গন ও মিডিয়ার ভূমিকা
বাউল–ফকিরদের মানবতাবাদী দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
মিডিয়াকে দায়িত্বশীল হতে হবে; উসকানি ঠেকাতে তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রচার করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লোকসংগীত ও বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য নিয়ে কোর্স ও সেমিনার হতে পারে।
৪. সামাজিক সংহতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংলাপ
মৌলবাদ মোকাবিলা করতে হলে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে। উন্মুক্ততা, সম্মান, সংলাপ—এই তিনটি মূল্যবোধ ছাড়া কোনো বহুত্ববাদী সমাজ টিকে না।
পরিশেষে আমরা বুঝা উচিত বাউল–ফকিরদের রক্ষা মানে বাংলার আত্মাকে রক্ষা আজ আবুল সরকারের গ্রেপ্তার কিংবা কয়েকজন বাউলের ওপর হামলা—এগুলো কেবল কয়েকটি ঘটনার বিবরণ নয়। এগুলো বাংলার মানবিক চেতনার ওপর আঘাত। এগুলো স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে প্রতারণা। এগুলো এক নতুন প্রজন্মকে ভয় দেখানোর প্রচেষ্টা—যেন তারা মুক্তচিন্তা না করে, প্রশ্ন না করে, বৈচিত্র্যকে ভয় পায়।
কিন্তু বাউল–ফকিরদের ইতিহাসই বলে—সংস্কৃতিকে দমন করা যায় না। দমন বাড়লে প্রতিরোধও বাড়ে। মানুষের ভেতরে মানবিকতার আগুন কখনো নিভে না।
আজ রাষ্ট্রের সামনে পরিষ্কার প্রশ্ন— সে কি বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে দাঁড়াবে, নাকি প্রেশার গ্রুপের ইচ্ছায় বাংলার সাংস্কৃতিক হৃদয়কে অপমান হতে দেবে?
বাউল–ফকিরদের রক্ষা মানে কেবল একটি সম্প্রদায়কে বাঁচানো নয়— এটি বাংলার আত্মাকে বাঁচানো।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











