বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 12:49 am
January 16, 2026 12:49 am

মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার আজ সংকটে: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা এখন মানবাধিকারের লড়াই

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে একদিনে নয়; ক্ষয় শুরু হয় নীরবে, অদৃশ্য একটি বিন্দু থেকে। আর সেই ক্ষয় যদি শুরু হয় বিচার বিভাগ থেকে, তবে পুরো রাষ্ট্রকাঠামোই ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে—গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা সবই তখন কাগজে লেখা শব্দমাত্র হয়ে থাকে। আজ বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ঠিক সেই পর্বতধসের কিনারায় দাঁড়িয়ে। শব্দ করে ধস নেমে পড়েনি এখনো, কিন্তু ফাটল অনেক আগেই তৈরি হয়েছে। এবং এই ফাটলের ভয়াবহতা সাধারণ নাগরিকের চোখেও আজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিটার শুধু আদালতের কার্যক্রম নয়—এটি মানুষের মর্যাদার শেষ আশ্রয়। যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হয়, যখন নাগরিক স্বাধীনতা পদদলিত হয়, যখন ক্ষমতা মানুষের ওপর চেপে বসে—তখন মানুষ শেষ ভরসা নিয়ে দাঁড়ায় আদালতের দরজায়। আর সেই দরজাই যদি ক্ষমতাসীনদের চাপের কাছে নুইয়ে পড়ে, তবে মানুষের অধিকার আর রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার—দুটোই নিঃশব্দে মৃত্যুবরণ করে।

আজ বাংলাদেশ এমন এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা শুধু রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্ন নয়—এটি মানবাধিকার রক্ষার মৌলিক শর্ত। আদালত স্বাধীন না হলে মানুষের অধিকার টিকে না; অধিকার টিকে না হলে গণতন্ত্রও টিকে না। আমাদের বর্তমান বাস্তবতা এই সত্যকে নির্মমভাবে উন্মোচন করছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এর সংবিধান যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল—জেলা জজদের নিয়োগ হবে সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশে, নিম্ন আদালতের বদলি–পদোন্নতির ক্ষমতা থাকবে শুধু উচ্চ আদালতের হাতে—সেই স্বপ্ন তিন বছরের মাথায় সরকারের হাতেই খণ্ডিত হয়। চতুর্থ সংশোধনী বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর প্রথম রাষ্ট্রীয় আঘাত, কিন্তু শেষটি নয়। এরপর প্রতিটি সরকারই এই নিয়ন্ত্রণকে আরও চূড়ান্ত করেছে। মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকারকে তারা দেখেছে রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে।

আজ পুলিশের তদন্ত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়; প্রসিকিউশন দলীয়; বিচারকরা নির্বাহী বিভাগের অধীন। তিন স্তরের এই জালে ন্যায়বিচার উৎপীড়নের অস্ত্রে রূপ নেয়। মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়, কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ অবরুদ্ধ থাকে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে—আমাদের বিচারব্যবস্থার সংকট এখন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, মানবাধিকারের জন্য অস্তিত্বগত হুমকি।

একজন বিশ্বনন্দিত অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস—যিনি দেশের বাইরে আমাদের গৌরব, কিন্তু দেশের ভিতরে টানা মামলার অভিযুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোর গতি, তদন্তের অস্বাভাবিক তৎপরতা, আদালতে চাপ—সবই আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই উদ্বেগ শুধু ড. ইউনূসের নয়; এটি আমাদের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন। যখন রাষ্ট্র ‘অপছন্দের’ মানুষকে নিশানা বানায়, তখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদিজার মামলা আবার উল্টো চিত্র দেখায়—প্রভাবহীন একজন নারী ন্যায়বিচারের জন্য ঘুরে বেড়ান, কিন্তু তার জামিন পান না; পাওয়ার আগেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একজন নির্যাতিত নারীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কি এতই তুচ্ছ? একজন নারীর কান্না কি এতই মূল্যহীন?

অন্যদিকে বিশাল কর্পোরেট স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে তদন্ত স্থগিত থাকে সহজেই। প্রশ্ন উঠতেই পারে—বিচার কি প্রভাবশালীদের জন্য আলাদা, আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা?

 

এই তিনটি ঘটনা—একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, একজন নিপীড়িত নারী, আর একটি শক্তিশালী কর্পোরেট—এসবই মিলিয়ে আমাদের বিচারিক বাস্তবতার নির্মম দ্বৈত চরিত্র দেখায়। এটি দুর্বলদের ওপর শক্তির নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামোগত নকশা।

মানবাধিকার লঙ্ঘন একদিনে ঘটে না; এর শুরু হয় বিচার বিভাগের দুর্বলতা দিয়ে।

  • যখন আদালত স্বাধীন থাকে না—
  • মানুষ হয়রানিমূলক মামলার শিকার হয়।
  • নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ভয় পায়।
  • পুলিশ জবাবদিহিহীন হয়ে ওঠে।
  • ক্ষমতাসীনরা আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়।
  • আর রাষ্ট্র হয়ে ওঠে দমনের সরঞ্জাম।

 

এই সংকট নতুন নয়। আমরা দেখেছি প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়েছে; দেখেছি উচ্চ আদালতের বিচারকদের স্থায়ীকরণ আটকে রাখা হয়েছে; দেখেছি রাজনৈতিক রায়ের পর বিচারকদের বিরুদ্ধে রাস্তায় ঝাড়ুমিছিল হয়েছে। বিচার বিভাগের শীর্ষে যখন স্বাধীনতা টিকে না, তখন নিম্ন আদালতের অসহায়ত্ব অনুমেয়।

বিচারকেরা যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারব্যবস্থায় আসেন, সেটি তাদের পেশাদার দক্ষতার প্রমাণ। কিন্তু এরপর তাদের বদলি–পদায়ন–শৃঙ্খলা—সবই সরকারের হাতে। একজন বিচারক জানেন, তার রায় ক্ষমতাসীনদের অপছন্দ হলে বিপদ অনিবার্য। এমন পরিস্থিতিতে কি তিনি ভয়, লোভ বা চাপ—এসবের ঊর্ধ্বে থেকে রায় দিতে পারবেন?

মানুষের মৌলিক মানবাধিকার—ন্যায়বিচারের অধিকার—আজ তাই সবচেয়ে বেশিক্ষত। একটি রাষ্ট্রের নাগরিককে নিরাপদ রাখার প্রথম শর্তই হলো, সে যেন ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আজ সেই আস্থাই সবচেয়ে বেশি ক্ষয়প্রাপ্ত। আদালতের আদেশ যদি মানুষ বিশ্বাস না করে, যদি আদালতকে স্বাধীন মনে না করে—তবে রাষ্ট্রের ওপর তার বিশ্বাসও ভেঙে যায়।

এই অবস্থায় রাষ্ট্র যে বারবার মানুষকে বলে—‘বিচার বিভাগ স্বাধীন’—তা নাগরিকদের কাছে আজ পরিহাস ছাড়া আর কিছু নয়। কারণ মানুষের জীবনই বলে দিচ্ছে—স্বাধীনতার ঘোষণা আছে, বাস্তবতা নেই।

তদন্ত, প্রসিকিউশন ও বিচার—তিন অঙ্গের কোনোটিই আজ সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়। শুধু বিচারকের টেবিলে বসে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, যদি তদন্ত বিকৃত হয়, যদি প্রসিকিউশন দলীয় হয়, যদি বিচারক রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ভয়ে কাজ করেন। এই সংকট পুরো বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের হতাশা তৈরি করছে; আর হতাশার সমাজ শেষ পর্যন্ত সহিংস হয়ে উঠতে বাধ্য।

মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমার আশঙ্কা—এই পথ যদি না বদলানো যায়, তবে একদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আরও বিপজ্জনক দিকে ঠেলে দেবে। আইনের শাসন ভেঙে পড়লে পরিণতি কখনোই শুভ হয় না। ইতিহাস আমাদের বহুবার দেখিয়েছে—বিচার-বহির্ভূত সমাজ কখনোই শান্তি ধরে রাখতে পারে না।

রাষ্ট্র যদি সত্যিই মানবাধিকার রক্ষা করতে চায়, যদি নাগরিকদের মর্যাদা দিতে চায়, যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে চায়—তবে প্রথমেই যা করতে হবে তা হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা।

  • স্বাধীন তদন্ত কমিশন
  • স্বাধীন প্রসিকিউশন সার্ভিস
  • বিচারকদের বদলি–পদোন্নতিতে নির্বাহী হস্তক্ষেপ বন্ধ
  • বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা

—এসব সংস্কার বছরের পর বছর ধরে আলোচনায় আছে, কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থে একটিও বাস্তবায়ন হয়নি।

 

মানুষের ন্যায়বিচারের অধিকার কোনো সরকারের দয়া নয়—এটি সংবিধানের অঙ্গীকার। এই অঙ্গীকার রক্ষা করতে না পারলে একটি রাষ্ট্র মানবাধিকার রক্ষার ন্যূনতম যোগ্যতাও হারায়।

আমরা ভুলে গেলে চলবে না—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্রের কোনও অস্তিত্ব নেই। স্বাধীন বিচারই পারে রাষ্ট্রকে ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে বাঁচাতে। পার্লামেন্ট নয়, প্রেস ব্রিফিং নয়—মানুষের অধিকার বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো স্বাধীন আদালত।

আজ তাই প্রশ্নটি আর আইনি নয়; প্রশ্নটি মানবাধিকার ও মানবমর্যাদার— মানুষ কি এই রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রাখবে, নাকি সেই অধিকারও রাজনৈতিক আনুগত্যের মতো হয়ে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের বাংলাদেশের মানচিত্র নির্ধারণ করবে।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *