সম্প্রতি দেশে কিছু তথাকথিত আলেম ও তাওহীদি জনতা ইসকন নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন। তাদের অভিযোগ—ইসকনের সদস্যরা নাকি মুসলিম মেয়েদের ধর্ষণ করছে, মুসলমানদের হত্যা করছে, তারা নাকি ভারতের এজেন্ট! এই অভিযোগগুলো এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে সমাজকে অস্থির করে তোলা যায়।
কিন্তু তারা কি ভুলে গেছেন—বাংলাদেশ কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র নয়? বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার গণতান্ত্রিক চেতনায়, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার নিজের ধর্ম পালন, প্রচার ও সংগঠিত হওয়ার অধিকার রাখে। সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে—“প্রত্যেক নাগরিক ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনার স্বাধীনতা ভোগ করবেন।” অতএব, কোনো ধর্মীয় সংগঠনকে কেবল ‘অভিযোগ’ বা ‘অভিমত’-এর ভিত্তিতে নিষিদ্ধ করা সংবিধানবিরোধী ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
ধর্মের নামে রাজনীতি, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ
————————————————-
ইসকনের বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চলছে, তা ধর্মীয় যুক্তি নয়—এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানি। এই দেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই যুগের পর যুগ একসাথে বাস করছে, একসাথে উৎসব পালন করছে। “আগে কি সুন্দর দিন কাটাতাম, হিন্দু-মুসলিম মিলে গান গাইতাম”— এই গান কেবল স্মৃতি নয়, আমাদের সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।
আজ যারা মৌলবাদের নামে সম্প্রীতি ভাঙতে চাইছে, তারা মূলত বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। যদি কেউ অপরাধ করে—সে হিন্দু হোক, মুসলমান হোক বা অন্য কোনো ধর্মের—তার বিচার হবে আইনের মাধ্যমে, ধর্মীয় আবেগ দিয়ে নয়। অন্যথায় একই যুক্তিতে বলা যায়, মাদ্রাসার কোনো শিক্ষক অপরাধ করলে সব মাদ্রাসা বন্ধ করতে হবে। এভাবে বিচার নয়, বরং ন্যায়বিচারের পথেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে।
মানবাধিকার সবার, কোনো ধর্মের নয়
——————————–
বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র এবং Universal Declaration of Human Rights (UDHR)-এর স্বাক্ষরকারী। সেই ঘোষণার ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে—“প্রত্যেক মানুষের চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।” অতএব, ধর্মীয় স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকারেরও বাধ্যবাধকতা। কেউ তার ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য ভয় পাবে না—এটাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রথম শর্ত।
কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো—দেশে আইনের শাসন দুর্বল, বিচারহীনতা বেড়েছে, মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। ধর্ষণ, খুন, সংখ্যালঘু নির্যাতন, নিপীড়ন—সবই চলছে অবাধে।
অপরাধীরা রাজনৈতিক ছায়ায় নিরাপদে থাকে, নিরপরাধ মানুষ ভয় নিয়ে বাঁচে।
এ দায় শুধু মৌলবাদীদের নয়—রাষ্ট্র ও সরকারেরও সমান দায় আছে। মানবাধিকার রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সরকার আজ নিজেই সেই অধিকারের সবচেয়ে বড় লঙ্ঘনকারী।
সমাধানের পথ: আইনের শাসন ও জাতীয় ঐক্য
——————————————
বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে এখনই তিনটি পথে হাঁটতে হবে—
- আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাঃ অপরাধী যেই হোক, তার বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, কোনো ধর্মের ভিত্তিতে নয়।
- ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করাঃ সব ধর্মের মানুষ যেন ভয় ছাড়া, নিরাপদে তার বিশ্বাস পালন করতে পারে—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
- জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাঃ এই দেশ আমাদের সবার—হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই মিলে বাংলাদেশ।
কেউ কারও শত্রু নয়, শত্রু হলো ঘৃণা, উগ্রতা ও অন্যায়ের রাজনীতি।
শেষকথা
——–
বাংলাদেশের পরিচয় কোনো ধর্ম নয়—মানবতা। যারা ইসকন নিষিদ্ধের মতো উগ্র দাবিতে দেশকে বিভক্ত করতে চায়, তারা ভুলে যাক— এই দেশ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গঠিত, যেখানে মানুষই ছিল মূল শক্তি, ধর্ম নয়। আজ আমাদের বলতে হবে—
না, আমরা উগ্রতার বাংলাদেশ চাই না। আমরা এমন বাংলাদেশ চাই যেখানে সব মানুষ সমান মর্যাদায়, সমান নিরাপত্তায় বাঁচবে। যেখানে কেউ ভয় পাবে না নিজের ধর্ম বা চিন্তার কারণে।
কারণ ধর্ম নয়—মানুষই এই দেশের আসল মূল্যবোধ।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











