বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 2:26 am
January 16, 2026 2:26 am

অপব্যবহারে পুলিশ, ক্ষুণ্ণ গণতন্ত্র: মানবাধিকার হুমকির মুখে

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

বাংলাদেশ পুলিশ—যে বাহিনীকে মানুষের সুরক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা নিশ্চিত করার জন্য গঠিত—সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক ও সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অভাব, মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ—এসব বিষয় নিয়ে সামাজিক ও আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশ প্রশাসন কখনো কখনো নাগরিকের রক্ষাকারীর বদলে নিজের ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও আইনের শাসন লঙ্ঘনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

গোলাম রাব্বী, একজন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং সাংবাদিক, মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ ও আনসারের হাতে যে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন, তা শুধু ব্যক্তিগত নিপীড়ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি স্পষ্ট প্রমাণ। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন, এবং এই ঘটনার প্রকাশ্যে আসার পরও বিচারের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে বেধড়ক মারধরের ঘটনা, যেখানে পুলিশ সদস্যরা অহংকারপূর্ণ ভঙ্গিতে বলেছিলেন, “মাছের রাজা ইলিশ, দেশের রাজা পুলিশ,”—এই ধরনের উদ্ভট প্রকাশ্য নির্যাতন দেশের জনগণের মনে গভীর আতঙ্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি করছে।

এই ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের নিদর্শন নয়; এটি প্রকাশ করে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকট। যখন পুলিশ নিজেই আইন লঙ্ঘন করে, তখন নাগরিকের অধিকার, মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর গুরুতর প্রভাব পড়ে। এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক অতি সতর্কবার্তা, যা অবহেলা করা যায় না।

মানবাধিকার লঙ্ঘন: বিচারহীনতার সংস্কৃতি

মানবাধিকার হলো নাগরিক জীবনের মৌলিক ভিত্তি। এটি নাগরিককে তার জীবন, স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং নিরাপত্তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু যখন পুলিশ নিজেই এই অধিকার লঙ্ঘন করে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

গোলাম রাব্বী ও বিকাশ চন্দ্র দাসের ঘটনার মাধ্যমে আমরা দেখছি, পুলিশ প্রশাসনের কিছু সদস্য কতটা ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্যাতনের জন্য প্রস্তুত। তাদের এই কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। যদিও বাংলাদেশ পুলিশের অধিকাংশ সদস্য পেশাদার ও মানবিকভাবে কাজ করেন, সামান্য কয়েকজনের অসদাচরণও সমগ্র বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয়।

বিচারহীনতা এখানে সবচেয়ে বড় সমস্যা। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক পদক্ষেপ যেমন বদলি, সাময়িক বরখাস্ত বা ক্লোজড—এসব আদেশ কার্যকর শাস্তি নয়। এই ধরনের ব্যবস্থা অপরাধীকে সাহস দেয় এবং বাহিনীর মধ্যে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতি অবহেলা ও বিচারহীনতা শুধু পুলিশকে দোষী বানায় না, বরং নাগরিকদের মনে ভয় সৃষ্টি করে। যখন নাগরিকরা জানে যে পুলিশ আইন লঙ্ঘন করতে পারে, এবং শাস্তি প্রায়শই এড়ানো যায়, তখন গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি—নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থা—দুর্বল হয়।

বেনামি মামলা ও রাজনৈতিক প্রভাব

বাংলাদেশে পুলিশি ব্যবহার রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যা। সরকারের পক্ষের রাজনৈতিক দল প্রায়ই পুলিশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার, সমাবেশে বাধা, রাজনৈতিক দমন—all these are becoming routine.

বেনামি মামলা বা অজ্ঞাতনামা মামলা এই ব্যবস্থার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ। কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বা সংঘর্ষের পর শতাধিক মানুষকে “অজ্ঞাত” দেখিয়ে মামলা করা হয়। এতে নাগরিকরা আইনশৃঙ্খলার প্রতি ভয় পায়, বিচারহীনতা বেড়ে যায়, এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ দুর্বল হয়।

পুলিশ যদি রাজনৈতিক বাহিনীর মতো ব্যবহার হয়, তখন তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে যায়। এটি নাগরিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং সমাবেশের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে। গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা অপরিহার্য। পুলিশ যদি রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিত্তি ভেঙে যায়।

দায়মুক্তির সংস্কৃতি: অপরাধকে উৎসাহ

পুলিশের কিছু অংশের মধ্যে দায়মুক্তি সংস্কৃতি বিরাট সমস্যা। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা প্রায়শই দায়মুক্ত থাকে। সাময়িক বরখাস্ত, বদলি বা ক্লোজড—এসব শাস্তি নয়, বরং অপরাধীকে সাহস দেয়।

দায়মুক্তির সংস্কৃতি শুধু পুলিশের মনোভাব পরিবর্তন করে না; এটি জনগণের মনে ভয় ও অবিশ্বাস তৈরি করে। যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইন লঙ্ঘন করে, তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও নাগরিক নিরাপত্তা বিপন্ন হয়।

এই সংস্কৃতি সমাজে একটি “হামবড়া” আচরণকে উৎসাহিত করে। পুলিশ যখন প্রকাশ্যে অপরাধ চালায় এবং তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, তখন জনগণ আইনশৃঙ্খলার প্রতি আস্থা হারায়। এটি একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যা রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ

বাংলাদেশের পুলিশি আচরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারহীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত দেশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—মানবাধিকার লঙ্ঘন চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে সহায়তা সীমিত বা বন্ধ হতে পারে।

এই সতর্কতা শুধু পুলিশ নয়, রাষ্ট্রের জন্যও। মানবাধিকার মানদণ্ড অমান্য করলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন সাহায্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করে।

মানবাধিকারের ভিত্তিতে পুনর্গঠন অপরিহার্য

পুলিশকে জনগণের বন্ধু হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আজকাল একটি অপরিহার্য কর্তব্য। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

  • স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কমিশন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, নাগরিক ও বিচার বিভাগের প্রতিনিধিত্ব সহ।
  • টর্চার বিরোধী আইন কঠোর প্রয়োগ: পুলিশ সদস্যদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।
  • বেনামি মামলা বন্ধ: নাগরিকদের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র প্রমাণভিত্তিক মামলা।
  • মানবাধিকারের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ: পুলিশ সদস্যদের নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার শেখানো।
  • রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন: পুলিশ রাষ্ট্রের, কোনো দলের নয়।
  • স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচার: প্রতিটি অভিযোগের সমাধান নিশ্চিত করা।

এই পদক্ষেপ না নিলে নাগরিক নিরাপত্তা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা সবই হুমকির মুখে থাকবে।

উপসংহার

পুলিশ যদি জনগণের সেবক না হয়ে অন্যায়ের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারায়। নাগরিক অধিকার রক্ষা না হলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়।

বাংলাদেশ আজ সেই সংকটময় পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানবাধিকার, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পুলিশ প্রশাসন পুনর্গঠন না করলে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে বিচার নিশ্চিত করা, পুলিশের জবাবদিহি বৃদ্ধি করা, এবং নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করা—এসবই আজকের বাংলাদেশের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়। রাষ্ট্র যদি সত্যিই জনগণের হয়ে কাজ করতে চায়, তবে পুলিশকে মানুষের সেবক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

শুধু তখনই বাংলাদেশের নাগরিকরা নিরাপদে বাঁচবে, গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, এবং পুলিশ আবার সমাজের রক্ষাকবচ হিসেবে আস্থা অর্জন করতে পারবে।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *