বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 16, 2026 1:10 am
January 16, 2026 1:10 am

নীরব সমাজ, পেডোফাইলরা সক্রিয়: শিশু অধিকার এখন ঝুঁকিতে

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি স্কুলের ভিডিও দেশের মানবাধিকার চেতনায় গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জন্মদিনে কেক খাওয়ানোর অজুহাত দিয়ে একজন শিক্ষক যখন ছাত্রের গালে নিজের জিহ্বা দিয়ে কেক মুছছেন, সেই দৃশ্য কেবল শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি, বরং আমাদের নাগরিক ও মানবাধিকারের দায়বোধের পরিধিও পরীক্ষা করেছে। এই একক ঘটনা নিছক বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের সেই গভীর ফাঁক উন্মোচন করেছে, যেখানে পেডোফাইলরা আস্তে আস্তে অবস্থান তৈরি করছে।

শিশু নির্যাতন আজ আর অচেনা বিষয় নয়। ২০২১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র ১০ মাসে দেশে ছেলেশিশুরা ধর্ষণসহ যৌন হয়রানির অন্তত ৭৫টি ঘটনায় শিকার হয়েছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—প্রতিটি ঘটনা সমাজের অন্ধকার ফাঁককে উন্মোচন করে, যেখানে অপরাধীরা স্বচ্ছন্দে শিশুর কাছে পৌঁছাতে পারে। বেসরকারি সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ৬ জন ছেলেশিশুর মধ্যে কমপক্ষে একজন এবং প্রতি ৪ জন মেয়েশিশুর মধ্যে একজন যৌন নির্যাতনের শিকার। এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যা নয়; এটি প্রমাণ করে আমাদের সমাজের দীর্ঘস্থায়ী অসুরক্ষা যা শিশুদের জীবনের ওপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলে।

পেডোফাইলরা সাধারণত পরিচিত এবং বিশ্বাসযোগ্য মানুষের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। শিক্ষক, আত্মীয়, কোচ বা পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে শিশুর নিকটস্থ হয়। তারা ‘বিশেষ স্নেহ’ দেখানো, উপহার দেওয়া, আলাদা সময় কাটানো, এবং ছোট ছোট স্পর্শের মাধ্যমে শিশুর আস্থা অর্জন করে। এরপর ধীরে ধীরে তারা শিশুর সীমা অতিক্রম করে, ভয় দেখায়, লজ্জা জাগায়, এমনকি শিশুকে নিজের দোষী মনে করাতে বাধ্য করে। এখানে সমাজ, পরিবার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নীরবতা অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দেয়। শিশুর পাশে দাঁড়ানো না হলে তাদের মানসিক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা সারাজীবন বহন করতে হয়।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক শিশু নিকটাত্মীয়ের হাতে বারবার ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ঢাকার একটি পরিবারে গৃহকর্মী দীর্ঘ সময় ধরে একটি শিশুকে ধর্ষণ করেছে। স্কুল, কোচিং সেন্টার বা মাদ্রাসাতেও শিক্ষকের দ্বারা একই ধরনের অভিযোগ উঠে এসেছে। প্রতিটি ঘটনা স্পষ্ট করে দেখায়, পেডোফাইলরা আমাদের চারপাশেই আছে। আমাদের ভুল ধারণা—“অপরাধী মানেই অচেনা ব্যক্তি”—সমাজকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বাস্তবতা হলো, ৮০–৯০ শতাংশ শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিচিত বা বিশ্বাসযোগ্য কারও দ্বারা।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা কাঠামো এখনও দুর্বল। স্কুলে কার্যকর শিশু-সুরক্ষা নীতি নেই, শিক্ষক নিয়োগে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই নেই, এবং শিশুবান্ধব তদন্ত প্রক্রিয়া অনুপস্থিত। পুলিশ বা আদালতে শিশুর মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো নিশ্চিত ব্যবস্থা নেই। ফলে, শিশুরা অভিযোগ করতে ভয় পায়, অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, এবং সমাজে এই প্রবণতা ক্রমবর্ধমান হয়।

পেডোফাইলদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো গ্রুমিং। ধীরে ধীরে শিশুর আস্থা অর্জন, “খেলাধুলা” বা “মজা” বলে হালকা স্পর্শ, ছবি তোলা এবং “এটি কাউকে বলবে না” বলে নির্দেশ—এগুলো শিশুকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে। শিশুরা বুঝতে পারে না, এবং পরিবারও প্রাথমিকভাবে বিষয়টি হালকা মনে করে। এই নীরব অনুমোদন অপরাধীদের সাহসী করে তোলে।

নাগরিক সমাজের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমি বারবার বলি—শিশুর কথা বিশ্বাস করা, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করা, এবং সমাজকে সচেতন করা ছাড়া কোনো ব্যবস্থা কার্যকর হবে না। কিন্তু আমাদের দেশে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব এখনও অর্ধেকের বেশি অমীমাংসিত। শিশুর নিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, এবং সমাজের নীরবতা—সব মিলিয়ে অপরাধীরা সহজে শিশুদের কাছে পৌঁছাচ্ছে।

পরিসংখ্যান এবং ঘটনার প্রমাণ থেকে স্পষ্ট—আমাদের চারপাশে পেডোফাইলরা কিলবিল করছে। কিন্তু সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের উদাসীনতার কারণে তাদের আড়ালেই রাখা হচ্ছে। আমরা অপরাধীদের লুকিয়ে রাখছি না, বরং শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তাকে ছিন্নভিন্ন করছি। এটি শুধু শিশুদের নয়, আমাদের সমাজের নাগরিক স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকারকেও হুমকির মুখে ফেলে।

সমাধান অবশ্য রয়েছে।

  • প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু-সুরক্ষা নীতি থাকা উচিত।
  • শিক্ষক ও স্টাফ নিয়োগে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই বাধ্যতামূলক।
  • শিশুবান্ধব তদন্ত ইউনিট তৈরি করতে হবে।
  • শিশুদের জন্য বয়স-উপযোগী সচেতনতা শিক্ষা দিতে হবে।
  • পরিবারকে সচেতন করা জরুরি—শিশুর অভিযোগকে গুরুত্ব দেওয়া হলো প্রথম প্রতিরোধ।
  • বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত ও কঠোর হওয়া উচিত।

 

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা শুধু একটি শিশুকে নয়, আমাদের সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও ব্যর্থ হচ্ছি। সভ্য সমাজের পরিচয় হলো তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শিশুরা সমাজের সবচেয়ে ভঙ্গুর এবং নির্ভরশীল।

আজ আমাদের সামনে দুটি পথ—শিশুর অধিকার ও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, অথবা সমাজের নীরবতায় অপরাধীর সাহস আরও দৃঢ় করা। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার—সবাইকে এখনই দায়শীল হতে হবে। শিশুদের অধিকার, নাগরিক অধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।

শেষ কথা: পেডোফাইলরা শুধু শিশুর দেহে নয়, সমাজের নীরবতার আড়ালে প্রতিনিয়ত কিলবিল করছে। আমরা যদি সচেতন না হই, তাদের প্রভাব থেকে শিশুদের নিরাপত্তা রক্ষা করা অসম্ভব হবে। নাগরিক সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র—সবাইকে এখনই দায়িত্ব নিতে হবে।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *