আমাদের সমাজে নারীর নীরবতাকে দীর্ঘদিন ধরে “ভদ্রতা”, “শালীনতা” কিংবা “সম্মান” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই মেয়েদের শেখানো হয়—কম কথা বলাই ভালো, প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি খারাপ হয়, বেশি প্রশ্ন করলে মানুষ ভালো চোখে দেখে না। এই শিক্ষা এতটাই স্বাভাবিক করে তোলা হয়েছে যে, একসময় নারী নিজেও বিশ্বাস করতে শুরু করে—চুপ থাকাই তার নিরাপত্তা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নীরবতা কি সত্যিই সম্মান রক্ষা করে, নাকি এটি একটি সুপরিকল্পিত সামাজিক ভয়?
নারীর নীরবতা কোনো স্বাভাবিক প্রবণতা নয়; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক প্রশিক্ষণের ফল। পরিবার, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, সামাজিক নিয়ম—সব মিলিয়ে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নারীর কণ্ঠকে বিপজ্জনক হিসেবে দেখা হয়। একজন নারী যখন কথা বলে, তখন সেটিকে ‘বাড়াবাড়ি’ বলা হয়। আর যখন সে চুপ থাকে, তখন বলা হয়—“দেখো, কত ভদ্র মেয়ে।” এই ভদ্রতার সংজ্ঞাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
কারণ, এই ভদ্রতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়। ভয়—সমাজ কী বলবে, পরিবার কী ভাববে, ধর্মীয় গোষ্ঠী কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কিংবা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কীভাবে শাস্তি দেবে। নারীর নীরবতা তাই কখনোই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নয়; এটি টিকে থাকার কৌশল।
একজন নারী যখন হয়রানির শিকার হয়, তখনও তাকে নীরব থাকতে বলা হয়। বলা হয়—“বড় কথা বানিয়ো না”, “মান-সম্মান থাকবে না”, “তোমারই ক্ষতি হবে।” এই উপদেশগুলো আসলে অপরাধীকে নয়, ভুক্তভোগীকেই শাস্তি দেয়। সমাজ এখানে অপরাধকে নয়, শব্দকে ভয় পায়। নারীর মুখ খুলে ফেলা যেন অপরাধের চেয়েও বড় অপরাধ।
এই নীরবতা ধর্মের সাথেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। ধর্মীয় বক্তৃতায় নারীর আদর্শ চরিত্র হিসেবে যাকে তুলে ধরা হয়, সে সাধারণত নীরব, সহনশীল এবং আত্মত্যাগী। তাকে শেখানো হয়—সব সহ্য করাই নাকি মহত্ত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্যায় সহ্য করা কি সত্যিই মহৎ? নাকি এটি অন্যায়কে দীর্ঘস্থায়ী করে?
ধর্মের নামে নারীর নীরবতাকে গৌরবান্বিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে—নারী যদি সহ্য করে, সে উত্তম; যদি প্রতিবাদ করে, সে উদ্ধত। এই ধারণা নারীর আত্মসম্মানকে ধীরে ধীরে ভেঙে দেয়। কারণ, আত্মসম্মান টিকে থাকে কণ্ঠে, নীরবতায় নয়।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হলো—এই নীরবতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। একজন মা, যিনি নিজে নীরব থাকতে শিখেছেন, তিনিও মেয়েকে বলেন—“সব কথা বলতে নেই।” এইভাবে নীরবতা হয়ে ওঠে উত্তরাধিকার। আর এই উত্তরাধিকারই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের বলে—যেখানেই নারীরা নীরব থেকেছে, সেখানেই নির্যাতন বেড়েছে। কারণ নীরবতা কখনো অন্যায় কমায় না; বরং অন্যায়কে সাহস দেয়। অপরাধী জানে—এই নারী চুপ থাকবে, পরিবার তাকে থামাবে, সমাজ তার পাশে দাঁড়াবে না। এই নিশ্চিত আশ্রয়ই অপরাধের জন্ম দেয়।
ডিজিটাল যুগেও এই নীরবতার চাপ কমেনি, বরং বেড়েছে। অনলাইনে নারীরা যখন কথা বলে, তখন তাদের ওপর নেমে আসে ট্রল, হুমকি, চরিত্রহনন। ফলাফল—অনেক নারী নিজেকে গুটিয়ে নেয়, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়, লেখা বন্ধ করে দেয়। আবারও জয়ী হয় নীরবতা। কিন্তু এবার এটি প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
সমাজ আসলে নারীর কণ্ঠকে ভয় পায়। কারণ, কণ্ঠ মানে প্রশ্ন, কণ্ঠ মানে পরিবর্তন। একজন নারী যখন বলে—“আমি এই নিয়ম মানি না”, তখন সে শুধু নিজের জন্য কথা বলে না; সে পুরো কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। এই চ্যালেঞ্জই পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
নারীর নীরবতা ভাঙা তাই ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক। এটি সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের প্রশ্ন। যে সমাজ নারীর কণ্ঠকে স্বাগত জানায়, সেই সমাজে সহিংসতা কমে, ন্যায়বিচার বাড়ে, মানবিকতা শক্ত হয়। আর যে সমাজ নারীর কণ্ঠ চেপে ধরে, সেই সমাজ ভেতরে ভেতরে পচে যায়।
আমাদের ভুল ধারণা আছে—নারী বেশি কথা বললে নাকি সমাজ অশান্ত হয়। বাস্তবে ঠিক উল্টোটা। নারীর নীরবতা সমাজকে শান্ত দেখালেও, সেই শান্তির নিচে জমে থাকে অবিচার, ক্ষোভ আর অদৃশ্য রক্তক্ষরণ। একসময় সেই চাপ বিস্ফোরিত হয়—আর তখন আর কিছুই নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
এখন সময় এসেছে নীরবতাকে গুণ হিসেবে দেখার ধারণা ভাঙার। একটি মেয়ে যদি প্রশ্ন করে, সেটি অসম্মান নয়। একটি নারী যদি প্রতিবাদ করে, সেটি অশালীনতা নয়। বরং সেটিই তার নাগরিক অধিকার। সমাজ যদি সত্যিই নৈতিক হতে চায়, তবে তাকে প্রথমেই নারীর কণ্ঠকে স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
কারণ, নারীর নীরবতা কোনো সম্মান নয়।
এটি একটি শেখানো ভয়।
আর ভয় দিয়ে কোনো সুস্থ সমাজ টিকে থাকতে পারে না।
লিখেছেন- Rafia Akhter










