বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীন স্বাধীনতার সংকট
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে তার জন্মলগ্ন থেকেই নারীর অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ ও নেতৃত্বের গল্প বহন করে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, শ্রম আন্দোলন কিংবা সাম্প্রতিক সামাজিক রূপান্তর—প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা শুধু উপস্থিত ছিলেন না, বরং নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবুও স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও প্রশ্ন থেকে যায়: বাংলাদেশে নারী কি সত্যিকার অর্থে নিরাপদ? নারী কি স্বাধীন? নারী কি রাজনৈতিকভাবে মুক্ত?
এই প্রশ্নগুলো আবার নতুন করে সামনে এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর এক তরুণ নারী নেত্রীর গ্রেপ্তার ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে। একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও জামিন—এই ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে এটি একটি আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিষয় বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেখলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই ঘটনা আসলে বাংলাদেশের নারীর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
এখানে প্রশ্ন কেবল একটি মামলার সত্য-মিথ্যা নয়; প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি নারীর ক্ষেত্রে কতটা ন্যায়সঙ্গত ও সংবেদনশীলভাবে কাজ করছে।
নারী ও ক্ষমতার সংঘর্ষ
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার চর্চা নয়; এটি সমাজের বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামোকে টিকিয়ে রাখার কিংবা ভাঙার একটি প্রক্রিয়া। বাংলাদেশে এই ক্ষমতার কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক। ফলে একজন নারী যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করেন, বিশেষ করে যখন তিনি প্রচলিত ধারা বা ক্ষমতার কেন্দ্রকে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হন না—তিনি মুখোমুখি হন সমাজের গভীরভাবে প্রোথিত মানসিকতার।
এখানেই নারী রাজনীতিকদের অবস্থান আলাদা। পুরুষ রাজনীতিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি সাধারণত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারীর ক্ষেত্রে অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত হয় নৈতিকতা, চরিত্র, ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। রাষ্ট্র, সমাজ এবং গণমাধ্যম—এই তিনটি স্তরেই নারীকে অতিরিক্তভাবে পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়।
এনসিপি নেত্রীর গ্রেপ্তার-পরবর্তী আলোচনায়ও সেই পুরনো প্রবণতাই লক্ষ করা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে শুধু মামলার আইনগত ভিত্তি নিয়ে নয়, বরং আড়ালে-আবডালে নারীর রাজনীতিতে থাকা “উচিত কি না”—এমন এক অঘোষিত বিচারও সক্রিয় হয়েছে।
নিরাপত্তা: নারীর জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত সত্য
বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা একটি কাঠামোগত সংকট। নারীর প্রতি সহিংসতা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক নির্যাতন, অনলাইন হুমকি—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার নারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ দায়ের হয়; কিন্তু সঠিক বিচার পায় খুব কমই। শহুরে নারীরাও নিরাপদ নয়—বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মসূচিতে সক্রিয়।
রাজনীতিতে যুক্ত নারীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও তীব্র। কারণ এখানে যুক্ত হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি—বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা। সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর প্রমাণ দেখায়, অনেক সময় পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত না করে রাজনৈতিক চাপ, প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের কারণে মামলা পরিচালনা করে, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবচেয়ে দুর্বল ও প্রতিবাদী অংশ।
একজন নারী রাজনৈতিক কর্মীর গ্রেপ্তার তাই কেবল তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি নাগরিক হিসেবে তার আইনি সুরক্ষার প্রশ্নও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি নিরপেক্ষতা হারায়, তবে নারীর ক্ষেত্রে ক্ষতি দ্বিগুণ হয়।
অর্থনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীনতার সংযোগ
নারীর স্বাধীনতা কেবল আইন বা সংবিধানে লেখা অধিকার দিয়ে নিশ্চিত হয় না; অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ছাড়া স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশে নারীর শ্রম অংশগ্রহণ বেড়েছে, কিন্তু সেই শ্রমের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার অভাব তাকে সহজেই প্রভাবিত করে। অধিকাংশ নারী রাজনীতিকই পরিবার, দল বা পৃষ্ঠপোষকের ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক অসুরক্ষা তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ও অবস্থানকে দুর্বল করে।
রাষ্ট্র, আদালত ও বিচারের সীমাবদ্ধতা
আইনের শাসন রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। কিন্তু আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন আদালত ও বিচার প্রক্রিয়া নাগরিকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়। বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা দীর্ঘসূত্রিতা, তদন্তের দুর্বলতা ও মামলার জটিলতার কারণে প্রায়ই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে নারী ও রাজনৈতিক মামলার ক্ষেত্রে—এই চ্যালেঞ্জ আরও তীব্র।
রিমান্ড, জামিন ও মামলার পরিচালনায় নারীর উপর অতিরিক্ত মানসিক ও সামাজিক চাপ থাকে। বিচারিক প্রক্রিয়া প্রায়ই রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আপস করে চলে। এতে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়।
রাজনৈতিক দলগুলোর দেউলিয়াত্ব
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মুখে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলে, কিন্তু সংকটের সময় তাদের ভূমিকা হতাশাজনক। নারী নেত্রী গ্রেপ্তার হলে দলগুলো প্রায়ই বিষয়টিকে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির দৃষ্টিতে দেখেন, মানবাধিকার বা ন্যায়বিচারের দিক কম গুরুত্ব পায়। দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল হওয়ায় নারীর স্বাধীন নেতৃত্ব কমে আসে।
মৌলবাদী শক্তি: নারীর স্বাধীনতার বড় বাধা
মৌলবাদী শক্তি সমাজে নারীর স্বাধীনতা সীমিত করতে চায়। তারা নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে ধর্ম ও সামাজিক নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ করে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নারী তাদের কাছে হুমকি। তারা দাবি করে—নারীর স্বাধীনতা সমাজ ও ধর্মের নৈতিক ভারসাম্য ভেঙে দেয়।
তাদের কার্যক্রম কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ নয়; তারা সমাজে সক্রিয়ভাবে কাজ করে—নারীর চলাচল নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ, অনলাইনে হুমকি, রাজনৈতিক চরিত্রহনন। সাম্প্রতিক ঘটনা দেখায়, তারা নারীদের ধর্মের নামে বন্দী করতে চায়, নারীর স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।
মৌলবাদ বনাম সংবিধান ও রাষ্ট্র
এই শক্তিগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধান নারী-পুরুষের সমান অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা দেয়। মৌলবাদী ধারণা সেই সাংবিধানিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে সরিয়ে দিতে চায়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে এই সংঘাত নারীর ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
উপসংহার
এনসিপি নেত্রীর গ্রেপ্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের নারীর অধিকার, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন। এখানে দায় শুধু ব্যক্তির নয়—রাষ্ট্রযন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল এবং সমাজ—সবাই এই বাস্তবতার অংশ।
নারী যদি নিরাপদ না হন, সমাজ নিরাপদ নয়। নারী যদি স্বাধীন না হন, গণতন্ত্র অসম্পূর্ণ।
আর নারী যদি রাষ্ট্রের কাছেই ভয় পান, রাষ্ট্রের মানবিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বাংলাদেশের সামনে সিদ্ধান্তের প্রশ্ন এখন নৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার—রাষ্ট্র কি নারীর পাশে দাঁড়াবে, নাকি নীরব থেকে সংকটকে আরও গভীর করবে?
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।










