বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

February 5, 2026 7:50 am
February 5, 2026 7:50 am

শিরোনাম: নীরব চুক্তির দেয়াল—নারীর শ্রম, মর্যাদা আর অদৃশ্য শোষণের গল্প

সকালের বাসে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে আমি প্রায়ই দেখি। বয়স তিরিশের কাছাকাছি, পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে একটা ছোট ব্যাগ। প্রতিদিন একই রুটে, একই ভিড়, একই ক্লান্ত মুখ। সে কোনো পরিচিত মুখ নয়, তবু তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, এই শহরের হাজারো নারীর মতো তারও একটা অদৃশ্য গল্প আছে—যে গল্পের কোনো শিরোনাম নেই, কোনো সাক্ষাৎকার নেই, কোনো খবরের কাগজে জায়গা নেই। এই লেখাটা সেই অদৃশ্য গল্পগুলোর জন্য।

আমাদের সমাজে নারীর শ্রমকে অনেক সময়ই শ্রম হিসেবে ধরা হয় না। ঘরের ভেতরের কাজ, যত্ন, আবেগ, সহানুভূতি—সব মিলিয়ে যে নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম, তাকে বলা হয় “স্বাভাবিক দায়িত্ব”। অথচ এই দায়িত্বের কোনো ছুটি নেই, কোনো ওভারটাইম নেই, কোনো প্রোমোশন নেই। একজন নারী সকালে উঠে রান্না করেন, সন্তানকে স্কুলে পাঠান, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধ মনে করিয়ে দেন, নিজের অফিসের কাজ সামলান, ফিরে এসে আবার ঘরের কাজ করেন—এই পুরো দিনের পরিশ্রমের কোনো অর্থমূল্য নেই, কোনো হিসাব নেই। সমাজ যেন নীরবে তার সঙ্গে একটা চুক্তি করে নিয়েছে: তুমি কাজ করবে, আমরা সেটাকে কাজ বলে স্বীকার করব না।

এই নীরব চুক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি প্রশ্নহীনভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকে। ছোটবেলায় মেয়েদের শেখানো হয়—ভালো মেয়ে মানে সহনশীল, চুপচাপ, দায়িত্ববান। ভালো ছেলে মানে স্বাধীন, সাহসী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন। এই বিভাজন খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু গভীর। মেয়েরা বড় হয় অপরাধবোধ নিয়ে—যদি তারা নিজের জন্য কিছু চায়, যদি তারা ক্লান্ত হয়, যদি তারা না বলতে চায়। এই অপরাধবোধই পরে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।

শহরের করপোরেট অফিসগুলোতে কাজ করা বহু নারী আছেন, যাদের বেতন কাগজে-কলমে সমান, কিন্তু বাস্তবে তাদের দায়িত্ব দ্বিগুণ। অফিসে আট ঘণ্টা কাজের পর বাড়িতে আরেকটি শিফট শুরু হয়। সেখানে কোনো সহকর্মী নেই, কোনো এইচআর নেই, কোনো লেবার ল’ নেই। যদি তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, সেটাকে অলসতা বলা হয়। যদি তারা অসুস্থ হয়, সেটাকে দুর্বলতা বলা হয়। এই ভাষাই শোষণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।

শুধু মধ্যবিত্ত নয়, শ্রমজীবী নারীদের গল্প আরও কঠিন। গার্মেন্টসের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি দিনে দশ ঘণ্টা কাজ করে, তারপর বস্তিতে ফিরে আবার রান্না করে, পানি আনে, সন্তানকে সামলায়। তার মজুরি দিয়ে পুরো পরিবার চলে, তবু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সে প্রায়ই অদৃশ্য। স্বামী বেকার হলে সমাজ তাকে “দুর্ভাগা” বলে, কিন্তু স্বামী কাজ না করেও ঘরের কাজে হাত না দিলে কেউ প্রশ্ন তোলে না। যেন পুরুষের কাজ না করা দুর্ভাগ্য, আর নারীর কাজ করা নিয়তি।

এই অসমতার শিকড় খুব পুরোনো। ধর্ম, সংস্কৃতি, রীতি—সব মিলিয়ে এমন এক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে নারীর শ্রমকে ভালোবাসার নামে বিনা মূল্যে নেওয়া যায়। মা তার সন্তানকে লালন করেন ভালোবাসায়, স্ত্রী স্বামীকে সহায়তা করেন ভালোবাসায়, মেয়ে বাবা-মাকে দেখাশোনা করেন ভালোবাসায়। ভালোবাসা এখানে পবিত্র, কিন্তু তার আড়ালে যে শ্রম লুকিয়ে থাকে, তাকে কেউ দেখতে চায় না। যেন ভালোবাসা মানেই আত্মত্যাগ, আর আত্মত্যাগ মানেই নীরবতা।

এই নীরবতার ফল শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানসিকও। বহু নারী ধীরে ধীরে নিজের পরিচয় হারান। তারা হয়ে ওঠেন কারও মা, কারও স্ত্রী, কারও মেয়ে—কিন্তু নিজের মানুষ হয়ে ওঠার জায়গা খুব সংকুচিত হয়ে যায়। তাদের ইচ্ছা, স্বপ্ন, ক্লান্তি—সবকিছু চাপা পড়ে “মানিয়ে নেওয়া” শব্দটার নিচে। মানিয়ে নেওয়াকে আমরা গুণ বলি, কিন্তু অনেক সময় এই মানিয়ে নেওয়াই নারীর আত্মসম্মানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়।

অন্যদিকে, নতুন প্রজন্মের কিছু নারী এই চুক্তিকে প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন। তারা জানতে চান—ঘরের কাজ কেন শুধু আমার? সন্তানের দায়িত্ব কেন শুধু আমার? ক্যারিয়ারের মূল্য কেন কম? এই প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু সমাজের কাছে এগুলো বিপজ্জনক। কারণ প্রশ্ন মানেই কাঠামো নড়বড়ে হওয়া। তাই অনেক সময় এই নারীদের বলা হয় স্বার্থপর, আধুনিকতার দোষে নষ্ট, পরিবারের শত্রু।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সমতা পরিবার ভাঙে না, বরং পরিবারকে টেকসই করে। যেখানে দায়িত্ব ভাগাভাগি হয়, সেখানে ভালোবাসা টেকে। যেখানে একপক্ষ শুধু দেয়, আরেকপক্ষ শুধু নেয়, সেখানে সম্পর্ক ধীরে ধীরে শোষণে রূপ নেয়। এই শোষণ কখনো চিৎকার করে না, কখনো মারধর করে না—এটা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস খেয়ে ফেলে।

রাষ্ট্রের নীতিতেও এই অদৃশ্য শ্রমের স্বীকৃতি খুব সীমিত। গৃহস্থালি কাজের কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই, মাতৃত্বকে অনেক সময় বোঝা হিসেবে দেখা হয়, শিশু যত্নকে ব্যক্তিগত সমস্যা ধরা হয়। অথচ একটি দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক তৈরির কাজটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শ্রম। এই শ্রম যদি অবমূল্যায়িত হয়, তাহলে সেই রাষ্ট্রের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে।

ধর্মীয় ভাষ্যেও অনেক সময় নারীর ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়—সে হবে সহনশীল, ধৈর্যশীলা, ত্যাগী। কিন্তু খুব কম সময়ই বলা হয়, পুরুষেরও দায়িত্ব আছে যত্ন নেওয়ার, শুনবার, ভাগাভাগি করার। ধর্মের ব্যাখ্যা যখন ক্ষমতার ভাষায় রূপ নেয়, তখন তা সমতার বদলে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

এই লেখাটি কোনো একক ঘটনার প্রতিবেদন নয়, কোনো নির্দিষ্ট নারীর গল্পও নয়। এটি একটি কাঠামোর গল্প—যেখানে নারীর শ্রমকে ভালোবাসার নামে অদৃশ্য করা হয়, দায়িত্বের নামে বিনামূল্যে নেওয়া হয়, আর নৈতিকতার নামে প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ করা হয়। এই কাঠামো ভাঙা সহজ নয়, কারণ এটি শুধু আইন দিয়ে নয়, মানসিকতা দিয়ে টিকে থাকে।

পরিবর্তন শুরু হতে পারে ছোট জায়গা থেকে। একটি পরিবারে যদি একজন পুরুষ বলেন, “ঘরের কাজ আমাদের সবার”, একটি অফিসে যদি বলা হয়, “মাতৃত্ব শাস্তি নয়, অধিকার”, একটি স্কুলে যদি ছেলেদের শেখানো হয়, “যত্ন নেওয়া দুর্বলতা নয়”—তাহলেই এই নীরব চুক্তির দেয়ালে ফাটল ধরে।

আমরা প্রায়ই বড় বড় স্লোগানের কথা বলি—নারীর ক্ষমতায়ন, সমতা, মানবাধিকার। কিন্তু ক্ষমতায়ন শুরু হয় রান্নাঘরের দরজা থেকে, বেডরুমের আলো থেকে, অফিসের মিটিং রুম থেকে। শুরু হয় সেই জায়গা থেকে, যেখানে একজন নারী আরেকটু জোরে বলতে পারে—আমি ক্লান্ত, আমি চাই, আমি না বলছি।

সকালের বাসের সেই মেয়েটিকে আবার দেখি। হয়তো তার নাম আমি জানি না, তার গল্পও পুরো জানি না। কিন্তু আমি জানি, তার ক্লান্ত চোখে এই সমাজের এক দীর্ঘ ইতিহাস লেখা আছে। যে ইতিহাস আমাদের শেখায়—শোষণ সব সময় চিৎকার করে না, কখনো কখনো সেটা খুব ভদ্র, খুব ধর্মীয়, খুব পারিবারিক ভাষায় কথা বলে।

এই লেখার শেষ কোনো উপসংহার দিয়ে শেষ করতে চাই না। কারণ এই গল্প শেষ হয়নি। প্রতিদিন নতুন নতুন নারী এই নীরব চুক্তির মধ্যে ঢুকছেন, আবার কেউ কেউ সাহস করে বেরিয়ে আসছেন। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা কি এই অদৃশ্য শ্রমকে দেখতে শিখব? নাকি ভালোবাসার নামে শোষণকে আরও সুন্দর করে ঢেকে রাখব?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, আমাদের সমাজ ভবিষ্যতে কেমন হবে—সমতার দিকে এগোনো এক মানবিক সমাজ, নাকি সুন্দর শব্দে মোড়া এক বৈষম্যময় কাঠামো।

লিখেছেন- Sadia Sharmin Aysha

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *