বাংলাদেশে নতুন বছর আসে ঠিকই, কিন্তু পুরোনো প্রশ্নগুলো যায় না। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা আবারও একই অনিশ্চয়তার মুখোমুখি—এই রাষ্ট্র কি নাগরিকের জন্য, নাকি নাগরিকই এখানে সবচেয়ে সহজে বিসর্জনযোগ্য? বছরের শুরুতে শুভেচ্ছা বিনিময়ের আনুষ্ঠানিকতার আড়ালে যে বাস্তবতা ঢাকা পড়ে না, তা হলো—বাংলাদেশে গণতন্ত্র আজও একটি অসমাপ্ত, ভঙ্গুর এবং গভীরভাবে বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি।
২০২৫ সাল আমাদের সামনে যে ছবি তুলে ধরেছে, তা কোনো একটি সরকারের ব্যর্থতার গল্প নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিফলন। মব সহিংসতা, প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘু নিপীড়ন—সব মিলিয়ে নাগরিক নিরাপত্তা যেন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকার বাইরে চলে গেছে। এই বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণায় আশার পাশাপাশি গভীর সংশয়ও তৈরি হয়েছে। কারণ বাংলাদেশে নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই নাগরিক ক্ষমতায়নের উৎস নয়, বরং রাজনৈতিক সংঘাত ও আস্থাহীনতার প্রতীক।
এই সংকটের সবচেয়ে নির্মম ও প্রতীকী উদাহরণ উসমান হাদির হত্যা। একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী, যিনি কোনো ক্ষমতার কেন্দ্রের অংশ ছিলেন না, যিনি প্রচলিত দলীয় রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলছিলেন—তাঁকে প্রকাশ্যে, নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি সম্ভাবনাকেও হত্যা করেছে। প্রশ্ন হলো—উসমান হাদির অপরাধ কী ছিল? তিনি ক্ষমতা চাননি, চাঁদাবাজি করেননি, অস্ত্রের রাজনীতি করেননি; তিনি কেবল এই রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন।
উসমান হাদির হত্যার পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা, দায় এড়ানো বক্তব্য এবং রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা। কোনো দলই স্পষ্টভাবে বলেনি—এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একটি আঘাত। কেউ বলেনি—এ ধরনের কণ্ঠ রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বরং আমরা দেখেছি পরিচিত দৃশ্য: তদন্তের আশ্বাস, দায় এড়ানোর চেষ্টা এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাটিকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গণতন্ত্র মানে মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়া; গণতান্ত্রিক চেতনা বা ভিন্নমতের নিরাপত্তা তাদের প্রকৃত অগ্রাধিকার নয়।
গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়, তাদের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ ছিল—রাষ্ট্রকে নাগরিকের দিকে ফেরানোর। সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, জুলাই সনদ—এই উদ্যোগগুলো কাগজে-কলমে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলো আবারও প্রমাণ করেছে, তারা সংস্কার চায় যতক্ষণ তা তাদের ক্ষমতার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ, গণভোট প্রশ্নে অচলাবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত একতরফা সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে এটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঐকমত্য এখনো একটি কৌশল, মূল্যবোধ নয়। উন্নত গণতন্ত্রগুলোতে—যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা, চিলি বা স্পেন—স্বৈরতন্ত্রের পর রাজনৈতিক দলগুলো অন্তত একটি বিষয়ে একমত হয়েছিল: গণতান্ত্রিক নিয়ম ভাঙা যাবে না। বাংলাদেশে সেই ন্যূনতম রাজনৈতিক পরিপক্বতাও অনুপস্থিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ব্যর্থতার দায় কেউ নিতে চায় না। ক্ষমতায় থাকা দল অতীতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে, বিরোধী দলগুলো ক্ষমতার বাইরে থেকে গণতন্ত্রের কথা বললেও ক্ষমতায় গিয়ে একই দমনমূলক চর্চা অনুসরণ করেছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য যে দলই হোক—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো দলই টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবই বারবার দলীয় স্বার্থের অধীন হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ যেমন আছে, তেমনি গভীর অনাস্থাও রয়েছে। কারণ ভোটের আগে ও পরে সহিংসতা, প্রার্থী হত্যা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এটি এখনও একটি ভয়ভিত্তিক রাজনীতি। যেখানে নাগরিকের মতপ্রকাশ নিরাপদ নয়, সেখানে ভোট কতটা স্বাধীন হতে পারে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি এই সংকটকে আরও প্রকট করেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে মব সহিংসতায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যা, হেফাজতে মৃত্যু—এসব কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি ধারাবাহিক চর্চা। রাষ্ট্র এখানে নাগরিকের রক্ষক নয়, অনেক সময় ভয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে—যেমন জার্মানি বা কানাডা—রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগ উঠলেই স্বাধীন তদন্ত হয়, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশে তা এখনও ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে বিবেচিত।
৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে। তাঁর জানাজায় মানুষের ঢল প্রমাণ করে—এই সমাজ এখনও রাজনীতিতে নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা খোঁজে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি দেখিয়েছে, আমাদের রাজনীতি এখনও ব্যক্তিনির্ভর, প্রতিষ্ঠাননির্ভর নয়। ব্যক্তি চলে গেলে শূন্যতা তৈরি হয়, কারণ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
উসমান হাদির মৃত্যু, খালেদা জিয়ার বিদায়, অব্যাহত সহিংসতা—সব মিলিয়ে ২০২৬ আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রাখে: আমরা কি আবারও একই ব্যর্থ রাজনৈতিক চক্রে ঘুরপাক খাব, নাকি নাগরিক হিসেবে এই ব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন দাবি করব?
এই লেখার অবস্থান স্পষ্ট—এটি কোনো দলের পক্ষে নয়, কোনো জোটের পক্ষেও নয়। এটি বাংলাদেশের পক্ষে। একটি এমন রাষ্ট্রের পক্ষে, যেখানে নাগরিকের জীবন রাজনৈতিক সুবিধার চেয়ে মূল্যবান। যেখানে উসমান হাদির মতো কণ্ঠগুলো হত্যা নয়, সুরক্ষা পাবে। যেখানে গণতন্ত্র মানে শুধু ক্ষমতা বদল নয়, বরং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ।
নতুন বছরে আমাদের প্রত্যাশা কোনো রাজনৈতিক দলের ওপর নয়। প্রত্যাশা রাষ্ট্রের প্রতি—সে কি নাগরিকের পাশে দাঁড়াবে, নাকি আবারও রাজনৈতিক সমঝোতার নামে নাগরিকের রক্ত ভুলে যাবে? ২০২৬ সেই পরীক্ষার বছর। ইতিহাস এই সময়টিকে ক্ষমতার পালাবদলের জন্য নয়, বরং নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মনে রাখুক—এই কামনাই।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











