বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

June 27, 2026 12:15 am
June 27, 2026 12:15 am

ঘাতকের আঘাতে ফুসফুস বেরিয়ে যায় এক মেয়ের, প্রতিবেশীর মুখে নৃশংসতার বর্ণনা

লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায়। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এমন ভয়াবহতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তাদের প্রতিবেশী আফরোজা বেগম রানী। তীব্র আক্ষেপ আর বুকফাটা আর্তনাদ নিয়ে তিনি বলছিলেন, একে একে চারটি তাজা প্রাণ চোখের সামনে চলে গেল, অথচ তিনি পাশের বাড়ির একটা মানুষকেও রক্ষা করতে পারলেন না। এই ব্যর্থতার গ্লানি তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

ঘটনার সময়কার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে রানী জানান, হঠাৎ করেই পাশের বাসা থেকে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার শুনতে পান তিনি। চিৎকার শুনে আর ঘরে স্থির থাকতে না পেরে দ্রুত সেই বাসার দিকে ছুটে যান। সেখানে গিয়েই তিনি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে গৃহকর্ত্রী শাহিনুর বেগমকে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। কিন্তু ততক্ষণে ওপাশ থেকে আর কোনো সাড়াশব্দ মিলছিল না, কান্নার আওয়াজও ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়। চারদিক এক নিঝুম স্তব্ধতায় রূপ নেয়।

খানিকক্ষণ ওই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার পর রানী লক্ষ্য করেন, ঘরের ভেতর থেকে কেউ একজন রান্নাঘরের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন শাহীনুরের একমাত্র ছেলে সিফাত হয়তো ঘরে ফিরেছে। সেই ধারণা থেকে তিনি সিফাতের নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডাকলেও ওপাশ থেকে কোনো জবাব আসেনি। এরপর রানী কিছুটা আড়ালে সরে যেতেই ঘরের জানালাটি ভেতর থেকে আটকে দেওয়ার শব্দ পান।

জানালা বন্ধের শব্দ পেয়ে রানী আবারও জানালার দিকে এগিয়ে যান এবং সেখানে এক যুবককে প্যান্ট হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। অচেনা ওই যুবকের কাছে রায়পুরে আসার কারণ জানতে চাইলে সে জানায়, সে মূলত বাসার পাইপলাইন মেরামত করার কাজের জন্য এসেছে। তবে যুবকের পরনের প্যান্টটি তার নিজের হাতে থাকায় রানীর মনে তীব্র সন্দেহের দানা বাঁধে। তিনি ভাবেন, হয়তো শাহিনুর বেগম ঘরে নেই আর পাইপলাইনের মিস্ত্রি পরিচয় দেওয়া এই যুবকটি সুযোগ বুঝে তার মেয়েদের সঙ্গে কিছু করেছে। এই আশঙ্কায় তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বাইরে থেকে প্রধান ফটকটি আটকে দেন এবং চিৎকার করে অন্য প্রতিবেশীদের খবর দেন।

প্রত্যেকের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাত, ফুসফুস বের হয়ে ছিল মেজো মেয়ের

রানীর ডাক-চিৎকারে আশেপাশের মানুষজন জড়ো হয়ে শাহীনুরের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতেই এক বীভৎস দৃশ্য দেখতে পান। পুরো ঘরের মেঝে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। প্রতিবেশীদের ঘরে ঢুকতে দেখে অভিযুক্ত ওই যুবকটি বেগতিক বুঝে চটজলদি বাসার ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে ততক্ষণে সেখানে বিপুলসংখ্যক উত্তেজিত জনতা জড়ো হয়ে যায় এবং তারা ছাদে উঠে ওই যুবককে ধরে গণপিটুনি দেয়। গণপিটুনির শিকার হয়ে পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহিনুর বেগমের পরিবারের স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে রানী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, শাহীনুর অত্যন্ত সজ্জন ও ভালো মনের মানুষ ছিলেন এবং তার সন্তানরাও প্রত্যেকেই বেশ মেধাবী ছিল। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি শাহিনুরের স্বামী কামাল হোসেন মূলত সিলভারের হাঁড়ি-পাতিল ফেরি করে বিক্রি করতেন। তবে ২০১৯ সালের দিকে রায়পুরের মোল্লারহাট এলাকায় কাজ করতে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে তিনি মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন এবং মারা যান। এরপর থেকে এই পরিবারটিকে সবাই ভীষণ ভালোবাসত ও বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করত।

দুর্ভাগা এই পরিবারের সন্তানেরা পড়াশোনায় বেশ ভালো ছিল উল্লেখ করে রানী জানান, বড় মেয়ে সায়মা আক্তার ঐতিহ্যবাহী আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে সফলভাবে এইচএসসি পাস করেছিল। একমাত্র ছেলে সিফাত রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি ‘হায়দার এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে পরিবারের হাল ধরেছিল। মেজো মেয়ে ইকরা আক্তার লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে এবং সবার ছোট মেয়ে শিফা আক্তার মার্চেন্টস একাডেমিতে পড়াশোনা করত।

গণপিটুনিতে নিহত হওয়া ঘাতক অন্তর মজুমদারের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে রানী স্পষ্ট জানান, এই লোকটিকে তিনি এর আগে কখনো এলাকায় দেখেননি এবং তার চেনার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে এই রোমহর্ষক ঘটনার পর তিনি লোকমুখে শুনেছেন যে, হত্যাকারী যুবকটি নাকি কোনো এক সময় এই ভবনেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করত।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নদীর পাড় সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত আমির হোসেন মাস্টারের ভাড়া বাড়িতে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহত শাহীনুর ও তার তিন মেয়ের আদি বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। অন্যদিকে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত ঘাতক অন্তর মজুমদার, যে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে, তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। রায়পুরে থাকাকালীন সে একসময় ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা হিসেবে কাজ করত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *