বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

January 15, 2026 11:13 pm
January 15, 2026 11:13 pm

মৌলবাদী শক্তির উত্থান: মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের জন্য অশনিসংকেত

Md. Emdadul Hoque Chowdhury

ঢাকার কেরানীগঞ্জে একটি মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ এবং রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে ককটেল হামলায় এক তরুণের নিহত হওয়ার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই দুটি ঘটনা মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত হলেও এর মধ্য দিয়ে নির্বাচনপূর্ব বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনকভাবে—মৌলবাদী ও উগ্রপন্থী শক্তির পুনরুত্থানের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবাধিকারের জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।

কেরানীগঞ্জের উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় নারী ও শিশুসহ চারজন আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ককটেল, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম প্রমাণ করে যে এটি কোনো দুর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণ নয়, বরং পরিকল্পিত নাশকতারই অংশ। বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের ইট ২০০ ফুট দূরে গিয়ে পড়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। শুক্রবার ছুটির দিন না হলে হতাহতের সংখ্যা যে আরও বাড়ত, তা সহজেই অনুমেয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মাদ্রাসার পরিচালক আল-আমিন একজন তালিকাভুক্ত আসামি। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত সাতটি মামলা রয়েছে এবং তিনি ২০১৭ ও ২০২০ সালে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণও করেছেন। ২০২৩ সালে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কীভাবে আবার প্রকাশ্যে এমন বিপজ্জনক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন—এই প্রশ্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করে। একজন পরিচিত উগ্রপন্থী কীভাবে দীর্ঘদিন নজরদারির বাইরে থাকতে পারেন, তার জবাব রাষ্ট্রকে দিতেই হবে।

এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মৌলবাদী শক্তির উত্থান কেবল নিরাপত্তাজনিত সমস্যা নয়; এটি সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, যেখানে উগ্র ধর্মীয় বা আদর্শিক শক্তি প্রভাব বিস্তার করেছে, সেখানে প্রথমেই আঘাত এসেছে নারীর অধিকার, শিশুদের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর। কেরানীগঞ্জের ঘটনায় নারী ও শিশুর আহত হওয়া সেই নির্মম বাস্তবতারই প্রতিফলন।

অন্যদিকে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে উড়ালসড়ক থেকে ছোড়া ককটেলের বিস্ফোরণে সিয়াম মজুমদার নামের এক তরুণের মৃত্যু আমাদের নিরাপত্তাহীন নগরজীবনের করুণ চিত্র তুলে ধরে। ঋণের দায়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা একটি পরিবারের স্বপ্ন মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে গেছে। ছেলেকে হারিয়ে মায়ের আর্তনাদ—‘ঢাকায় আইস্যা সব শ্যাষ হইয়া গেল’—শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, এটি আজকের নগরবাসীর গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রতিধ্বনি।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ককটেল হামলার মতো নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের অনেককেই এখন পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা যায়নি। এর ফলে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ব্যর্থতা মৌলবাদী ও সহিংস গোষ্ঠীগুলোর জন্য কার্যত একটি নিরাপদ ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। চব্বিশের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে ও পরে বিভিন্ন কারাগার থেকে যে কয়েদি ও আসামিরা পালিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীরাও ছিলেন। তাঁদের অনেককে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সুযোগে কেউ কেউ জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার সহিংসতা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।

মৌলবাদী শক্তির উত্থানকে আরও জটিল করে তুলেছে রাষ্ট্রীয় নীতিগত দ্বিচারিতা। অতীত সরকারের আমলে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রপন্থার অভিযোগ অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত সন্ত্রাসী ও মৌলবাদীরা আড়ালে থেকে গেছে, আবার বহু নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উগ্রবাদকে খাটো করে দেখার প্রবণতাও সমানভাবে বিপজ্জনক। সন্ত্রাসবাদকে কখনোই রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা প্রশাসনিক উদাসীনতার চোখে দেখা যায় না।

নির্বাচনপূর্ব সময়ে এই ধরনের সহিংসতা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্যও বড় হুমকি। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই সম্ভব নয়; এর জন্য নাগরিকের জীবন, চলাচল ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সুরক্ষিত থাকতে হয়। সহিংসতা ও নাশকতার আশঙ্কা থাকলে সাধারণ মানুষ ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পায়, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।

এখানেই মৌলবাদী শক্তির প্রকৃত ক্ষতিকর দিকটি স্পষ্ট হয়। তারা কেবল বোমা বা ককটেল ছুড়ে মানুষ হত্যা করে না; তারা সমাজে ভয় সৃষ্টি করে, বিভাজন বাড়ায় এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষয় করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্রকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীল করে তোলে।

এই বাস্তবতায় সরকারের দায়িত্ব কেবল ঘটনার পর তদন্ত বা বিবৃতি দেওয়া নয়। প্রয়োজন একটি সুসংহত, দীর্ঘমেয়াদি ও মানবাধিকারসম্মত কৌশল। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও উগ্রপন্থীদের নিয়মিত নজরদারিতে আনতে হবে, জামিন ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ করতে হবে এবং গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে আইনগত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ধর্মের আড়ালে সহিংসতা ও ঘৃণার রাজনীতি বিস্তার লাভ করতে না পারে।

মৌলবাদ ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই মানে ধর্ম বা মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি মানবাধিকার, আইনের শাসন ও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো রক্ষার লড়াই। রাষ্ট্র যদি এখনই স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থান না নেয়, তবে এর মূল্য দিতে হবে নিরপরাধ মানুষের জীবন দিয়ে, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পাবে একটি অনিরাপদ ও সহিংস সমাজ।

রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে—নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব। আর মৌলবাদী শক্তির উত্থান রোধ করতে ব্যর্থ হলে সেই দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ বলেই বিবেচিত হবে।

 

লেখক পরিচিতি:

লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury

মানবাধিকার কর্মী  লেখক

Emdad.chowdhury@gmail.com

তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *