মানবাধিকার শব্দটি আমাদের সমাজে যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবে তার চর্চা ততটাই সংকুচিত। আমরা সংবিধানের কথা বলি, আন্তর্জাতিক চুক্তির কথা বলি, দিবস পালন করি, পোস্টার বানাই—কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি সত্যিই নিরাপদ? মানুষ কি নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারে, নিজের শরীর ও জীবনের উপর সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই ভয়ংকরভাবে জটিল।
আমাদের সমাজে মানবাধিকার লঙ্ঘন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। এখানে নিপীড়ন আসে কখনো আইনের নামে, কখনো ধর্মের ব্যাখ্যার আড়ালে, কখনো সংখ্যাগরিষ্ঠতার নৈতিকতার দোহাই দিয়ে। এই নিপীড়নের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি প্রায়ই “স্বাভাবিক” বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ ধীরে ধীরে শিখে যায়, কিছু অধিকার চাওয়া বিপজ্জনক, কিছু প্রশ্ন করা বেয়াদবি, আর কিছু পরিচয় প্রকাশ করা অপরাধের সমান।
মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি সামনে আসে, তা হলো ক্ষমতা। কার হাতে ক্ষমতা, কে সিদ্ধান্ত নেয়, কে কথা বলতে পারে—এই প্রশ্নগুলোই নির্ধারণ করে কার অধিকার সুরক্ষিত হবে আর কারটা হবে না। আমাদের সমাজে ক্ষমতা খুব অল্প কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত, এবং সেই ক্ষমতা প্রায়শই ধর্ম, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির মিশ্রণে আরও ভয়ংকর রূপ নেয়। ফলাফল হিসেবে মানবাধিকার আর সার্বজনীন থাকে না; তা হয়ে ওঠে শর্তসাপেক্ষ।
ধর্ম এখানে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। ধর্ম ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা থেকে উঠে এসে যখন রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। ভিন্নমত, ভিন্ন ব্যাখ্যা, কিংবা ভিন্ন জীবনধারা তখন আর শুধু মতভেদ থাকে না—তা হয়ে ওঠে “হুমকি”। এই হুমকির ভাষা কখনো সরাসরি সহিংস, কখনো নীরব বর্জনের, আবার কখনো আইনি হয়রানির মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
বিশেষ করে যৌনতা ও লিঙ্গ পরিচয় সংক্রান্ত অধিকার নিয়ে কথা বলাটা আমাদের সমাজে প্রায় নিষিদ্ধ। এখানে যৌনতা মানেই লজ্জা, নৈতিক অবক্ষয় কিংবা বিদেশি ষড়যন্ত্র—এই ধারণাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে লালন করা হয়। ফলে যৌন অধিকার নিয়ে আলোচনা করা মানেই নিজেকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। অথচ যৌন অধিকার মানে কেবল যৌন আচরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সম্মতি, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পরিচয় ও মর্যাদার প্রশ্ন।
যখন কোনো মানুষ তার যৌন পরিচয়ের কারণে পরিবারে, সমাজে কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নিপীড়নের শিকার হয়, তখন সেটি নিছক সামাজিক সমস্যা নয়—এটি একটি মানবাধিকার সংকট। কিন্তু এই সংকটকে আমরা প্রায়ই অস্বীকার করি এই বলে যে, “এটা আমাদের সংস্কৃতিতে মানানসই না।” প্রশ্ন হলো, সংস্কৃতি কি মানুষের জীবনের চেয়েও বড়? সংস্কৃতি কি পরিবর্তনশীল নয়? নাকি সংস্কৃতির নামে আমরা কেবল ক্ষমতাশালীদের স্বার্থ রক্ষা করছি?
মানবাধিকার কর্মী বা লেখক হিসেবে সবচেয়ে কঠিন অভিজ্ঞতা হলো—যখন আপনি সত্য বলার কারণে একা হয়ে যান। হুমকি আসে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে। কখনো বলা হয় আপনি দেশবিরোধী, কখনো ধর্মবিরোধী, আবার কখনো আপনাকে “অশালীন” বা “নৈতিকভাবে বিকৃত” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই লেবেলিং প্রক্রিয়াটাই আসলে নিপীড়নের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। কারণ এতে সরাসরি হামলা ছাড়াই একজন মানুষকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যায়।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মানবাধিকার মানে কেবল বড় বড় ঘটনার কথা নয়। এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের সাথেও জড়িত। একজন নারী রাতে নিরাপদে রাস্তায় হাঁটতে পারছে কি না, একজন শ্রমিক ন্যায্য মজুরি পাচ্ছে কি না, একজন সংখ্যালঘু নিজের বিশ্বাস নিয়ে কথা বলতে পারছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরেই মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র ফুটে ওঠে।
রাষ্ট্র এখানে নিরপেক্ষ দর্শক হতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি, রাষ্ট্র অনেক সময়ই নিপীড়নের নীরব অংশীদার হয়ে ওঠে। আইন প্রয়োগ হয় নির্বাচিতভাবে, বিচার হয় দীর্ঘসূত্রতায় আটকে, আর ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে প্রায়ই দায়মুক্তি নিশ্চিত হয়। এই বাস্তবতায় মানবাধিকার কাগজে-কলমে থাকলেও জীবনে তার প্রতিফলন ঘটে না।
মানবাধিকার নিয়ে কথা বলা তাই শুধুই নৈতিক অবস্থান নয়, এটি রাজনৈতিকও। কারণ অধিকার প্রশ্ন মানেই ক্ষমতার প্রশ্ন। কে সিদ্ধান্ত নেবে কোন জীবন গ্রহণযোগ্য, কোনটা নয়—এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করে দেয় সমাজের ভবিষ্যৎ। যদি আমরা এই প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাই, তাহলে নিপীড়ন নিজে থেকেই বন্ধ হবে না; বরং আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে।
এই জায়গায় লেখালেখি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। কলাম, প্রবন্ধ, ব্লগ—এসব কেবল মত প্রকাশের মাধ্যম নয়; এগুলো সাক্ষ্য। ভবিষ্যতে কেউ যখন প্রশ্ন করবে, “তখন কি কেউ কথা বলেছিল?”—এই লেখাগুলোই হবে তার উত্তর। তাই লেখক হিসেবে দায়িত্ব দ্বিগুণ। সত্যকে নরম করে বলা নয়, আবার অযৌক্তিক উসকানিও নয়—বরং তথ্য, যুক্তি ও মানবিক অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে কথা বলা।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই লেখালেখি কি আদৌ কোনো পরিবর্তন আনে? হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে না। কিন্তু ইতিহাস বলে, পরিবর্তন সবসময় শুরু হয় অস্বস্তিকর প্রশ্ন দিয়ে। আজ যে কথাগুলো বিতর্কিত, কাল সেগুলোই হয়তো স্বীকৃত সত্য হবে। নারী ভোটাধিকার, শ্রমিক অধিকার, এমনকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও একসময় বিতর্কিত ছিল।
মানবাধিকার রক্ষা মানে নিখুঁত সমাজ গড়া নয়; মানে এমন একটি সমাজের দিকে এগোনো, যেখানে প্রশ্ন করার জায়গা থাকবে, ভিন্নমত বেঁচে থাকবে, আর মানুষ ভয় ছাড়া নিজের পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে পারবে। এই পথ সহজ নয়, নিরাপদও নয়। কিন্তু নীরবতার চেয়ে ঝুঁকি নেওয়াই বেশি মানবিক।
আমি বিশ্বাস করি, মানবাধিকার নিয়ে লেখা মানে কেবল অন্যায়ের সমালোচনা নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক নথি তৈরি করা। হয়তো আজ এই লেখা পড়েই কেউ রাগ করবে, কেউ হুমকি দেবে, কেউ বিকৃত উদ্দেশ্য আরোপ করবে। তবুও লেখা থামানো যায় না। কারণ লেখা থেমে গেলে ইতিহাসও একপাক্ষিক হয়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। এটি মানুষের মুখ, নাম, শরীর ও জীবনের গল্প। এই গল্পগুলো বলা না হলে, নিপীড়নই একমাত্র বর্ণনা হয়ে থাকবে। আর সেই নীরবতার দায় আমাদের সবার।











