গ্রামবাংলার জীবনধারায় একসময় পানির প্রধান উৎস ছিল ইঁদারা—কুয়া। আধুনিক প্রযুক্তির আগমনের বহু আগে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড খরতাপে যখন পুকুর-খাল-বিল পানিশূন্য হয়ে যেত, তখন এসব কুয়া হয়ে উঠত মানুষের একমাত্র ভরসা। কালের পরিবর্তনে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে কুয়া বিলুপ্ত হয়ে গেলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রাম আজও ধরে রেখেছে এমন এক ঐতিহ্যের স্মারক—একটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো কুয়া, যা এখনো সচল এবং সমানভাবে ব্যবহৃত।
রাধানগর গ্রামের বাসিন্দা শামসুল আলম বাবু, যাঁর পরিবার চার প্রজন্ম ধরে এই কুয়ার রক্ষণাবেক্ষণ করছে, জানালেন তাঁদের প্রাচীন ঐতিহ্যের গল্প। তিনি বলেন, তাঁর প্রপিতামহের পিতামহ—প্রায় আড়াই থেকে তিন শতাব্দী আগে—এই কুয়া নির্মাণ করেন। ক্ষণেক্ষণে পাল্টে যাওয়া সময়, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জনবসতির বিস্তারের ভিড়েও কুয়ার অবস্থান ও গুরুত্ব আজও টিকে আছে। পরিবারটির প্রতিটি প্রজন্মই কুয়ার পরিচর্যায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। ফলে আজও এর পানি পরিষ্কার, শীতল ও পানযোগ্য।
নব্বই বছর বয়সী আসগর মিয়া জানান, তাঁর শৈশবের স্মৃতিতেও কুয়ার জলে ছিল অপরূপ স্বচ্ছতা। তিনি বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছুই বদলে যাচ্ছে—নলকূপ, গভীর নলকূপ, মোটরচালিত পানির ব্যবস্থা মানুষের জীবন অনেক সহজ করেছে ঠিকই; কিন্তু কুয়ার মতো নির্মল ও প্রাকৃতিক স্বাদের পানি আর মেলে না। তাঁর ভাষায়, “এগুলো হারিয়ে গেলে গ্রামবাংলার এক বিশাল ঐতিহ্যই যেন হারিয়ে যাবে।”
রাধানগরের তরুণ বাসিন্দা মোহাম্মদ মিয়া জানান, গরমের দিনে কুয়ার পানি যেন এক অপূর্ব প্রশান্তি নিয়ে আসে। গোসলের সময় পানির শীতলতার অনুভূতি শহরের সরঞ্জামনির্ভর যেকোনো পানির উৎসের তুলনায় ভিন্ন। তিনি বলেন, ঢেকে রাখলে পানি দীর্ঘসময় স্বচ্ছ থাকে, এবং কুয়ার পানির স্বাদ কৃত্রিম উৎসের জলের থেকে আলাদা।
এলাকার আরেক বাসিন্দা সেলিম মাস্টার বললেন, নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আশপাশের অনেক পরিবার সুপেয় পানির প্রায় পুরো চাহিদাই মেটাত এমন কুয়া থেকে। তখন নদী, খাল, বিল বা পুকুরের পানি ব্যবহার করা হতো শুধু রান্নাবান্না বা ঘরোয়া কাজের জন্য। কিন্তু পরিবারের পান করার জন্য কুয়ার পানিকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করা হতো। তাঁর মতে, এই কুয়াগুলো ছিল গ্রামের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন এবং সামাজিক জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।
আজও রাধানগরের এই ঐতিহাসিক কুয়ার পানি একইভাবে স্বচ্ছ ও সুস্বাস্থ্যকর। দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত ব্যবহারের পরও কুয়ার দেয়াল, গভীরতা ও পানির গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে অটুট রয়েছে। গ্রামের অনেকের বিশ্বাস, কুয়ার অবস্থান ও নির্মাণ পদ্ধতি এমন ছিল যে এটি প্রকৃতির সঙ্গে এক বিশেষ সামঞ্জস্য তৈরি করেছে। সেই কারণেই হয়তো শত শত বছর পরও এর জল কখনোই ব্যবহার অযোগ্য হয়ে ওঠেনি।
গ্রামবাংলার অধিকাংশ কুয়া আজ অতীতের ইতিহাসে পরিণত হলেও রাধানগরের এই কুয়া সময়ের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক পানিব্যবস্থার যুগে এটি শুধু একটি পানির উৎস নয়—এটি গ্রাম্য ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং প্রজন্মের গল্প বহনকারী একটি জীবন্ত নিদর্শন।











