বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা আর কোনো ব্যতিক্রম নয়। এটি দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম হয়ে উঠেছে। উসমান হাদীর ওপর হামলা সেই দীর্ঘমেয়াদি ব্যর্থতারও প্রতিফলন। একজন নাগরিক তার রাজনৈতিক মত প্রকাশ করেছে—এটাই গণতন্ত্রের অধিকার। কিন্তু সেই মতের জবাব যদি হয় লাঠি, ছুরি বা বন্দুক, তাহলে সেটি আর রাজনীতি নয়। সেটি সন্ত্রাস।
এই ঘটনার দায় শুধু হামলাকারীর নয়। রাষ্ট্র ও প্রশাসনও সরাসরি দায়ী। কারণ রাষ্ট্র যদি একজন সক্রিয় এমপি প্রার্থীকে, যারা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে রয়েছেন, নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কোথায়? এটি আর কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের বাস্তবতা।
উসমান হাদী ও তার পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার প্রশ্নাতীত।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র কেবল কাগজে আছে। প্রকৃত গণতন্ত্র মানে হলো—মত প্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণের নিরাপত্তা, আইনের শাসন, মানবাধিকারের সুরক্ষা, ভিন্নমত ও ধর্মের প্রতি সহনশীলতা, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং নিরাপদ সামাজিক অবস্থান নিশ্চিত করা।
এই মৌলিক ভিত্তিগুলো বাস্তবে নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই ঝুঁকি, রাজনৈতিক পরিচয় মানেই ভয়। প্রতিটি নির্বাচন, মিছিল ও সভা সহিংসতার আশঙ্কার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। জন স্টুয়ার্ট মিলের ভাষায়,“যে সমাজে ভিন্নমত প্রকাশের শাস্তি ভয়ের মাধ্যমে হয়, সে সমাজ গণতান্ত্রিক হতে পারে না।”
তিনটি বড় দল: সমানভাবে দায়ী
এই সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির দায় কোনো একক দলের ওপর চাপানো যায় না। দেশের তিনটি বড় রাজনৈতিক দলই সমানভাবে দায়ী। প্রত্যেকেরই আছে ক্যাডার বাহিনী, পেশিশক্তি ব্যবহার এবং সহিংসতার ইতিহাস।
ক্ষমতায় থাকলে প্রশাসনের সুবিধা নেওয়া হয়, ক্ষমতার বাইরে থাকলে রাজপথে শক্তি প্রদর্শন। গণতন্ত্র এখানে চর্চার বিষয় নয়; এটি ক্ষমতার হাতিয়ার।
উসমান হাদীর ওপর হামলার পর জনগণ এক দলের নেতা-কর্মীদের প্রশ্ন করেছিল। কিন্তু এর ইতিহাস নতুন নয়। প্রতিটি বড় দল বহু ঘটনার মাধ্যমে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে।
হান্না আরেন্ট বলেছিলেন,“সহিংসতা যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়, রাজনীতি তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।”বাংলাদেশে সেই নৈতিক পতন বহু আগেই ঘটেছে।
উন্নত গণতন্ত্রের উদাহরণ
উন্নত গণতন্ত্রের দেশে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তীব্র হলেও সহিংসতা খুব সীমিত। যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদল একে অপরকে তীব্র সমালোচনা করে, কিন্তু একে অপরের ওপর হামলা হয় না। জার্মানি ও কানাডার মতো দেশে রাজনৈতিক মতবিরোধ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনের আওতায় সীমাবদ্ধ।
নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন—“গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, ভয়ের বাইরে বাঁচার অধিকার।”এই ভয়মুক্ত পরিবেশেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত হয়। বাংলাদেশে এই পরিবেশ নেই। এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ই ঝুঁকি, রাজনৈতিক কর্মসূচি মানেই সহিংসতার আশঙ্কা।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের ব্যর্থতা: সরাসরি অভিযুক্ত
উসমান হাদীর ওপর হামলার সময় সরকার ও প্রশাসন প্রমাণসাপেক্ষভাবে ব্যর্থ ছিল। গোয়েন্দা নজরদারি না থাকা, ঝুঁকি পূর্বাভাসের অভাব, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের অনুপস্থিতি—সবই নির্দেশ করে যে রাষ্ট্র নিজ দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ।
এখানে উদাসীনতার চেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের শিকার। সরকার যদি প্রার্থীকে রক্ষা করতে অক্ষম হয়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে কিভাবে কথা বলা সম্ভব? এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং জনগণের প্রতি অবহেলার পরিচয়।
এখনো পর্যন্ত সরকার সরাসরি জবাব দেয়নি, প্রশাসন নীরব। এই উদাসীনতা ও অক্ষমতা সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর সহিংস রাজনীতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।
বিচারহীনতা ও সহিংসতার চক্র
বিচারহীনতা দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতার পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করছে। রাজনৈতিক অপরাধীরা জানে—দলীয় পরিচয় থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
ম্যাক্স ওয়েবারের সংজ্ঞায়, রাষ্ট্র হলো সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের বৈধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে সেই ক্ষমতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। বিচারহীনতা এবং প্রশাসনের অক্ষমতা রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতিকে দৃঢ় করে দিয়েছে।
রাজনৈতিক কনসেপ্ট: গণতন্ত্রের অভাব
বাংলাদেশে প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রাজনীতি আদর্শ বা নীতির ওপর নয়; ক্ষমতার ওপর নির্ভর। দলগুলো গণতন্ত্র চায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, চর্চার জন্য নয়। পেশিশক্তি, দুর্বৃত্তায়ন এবং সহিংসতার সংস্কৃতি রাজনৈতিক নিয়ম হয়ে গেছে।
যতদিন রাজনীতি সহিংসতা ও ভয় ব্যবহার করবে, ততদিন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কেবল কাগজে থাকবে। দেশের নাগরিকেরা ভয়ে অংশ নেবে, আর গণতন্ত্র নামমাত্রই থাকবে।
শেষ কথা: রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখে দাঁড়াতে হবে
উসমান হাদীর ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের প্রতিফলন।
সরকার ও প্রশাসন যদি এখনো জবাবদিহি, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে গণতন্ত্র কেবল শব্দে থাকবে—বাস্তবে নয়।
এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রকে সরাসরি দায় স্বীকার করে পদক্ষেপ নিতে হবে। নাগরিককে রক্ষা করতে হবে, সহিংস রাজনীতিকে আর সহ্য করা যাবে না।
লেখক পরিচিতি:
লিখেছেনঃ Md. Emdadul Hoque Chowdhury
মানবাধিকার কর্মী ও লেখক
Emdad.chowdhury@gmail.com
তিনি মানবাধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন।











