বাংলাদেশে যখনই কোনো নারী রাজনীতি, ধর্ম, সমাজ কিংবা মৌলবাদের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেন, তখন একটি পরিচিত দৃশ্য বারবার সামনে আসে। তার বক্তব্যের জবাব যুক্তি দিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে শুরু হয় ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান এবং হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা। সম্প্রতি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের মন্তব্য ও কটূক্তি ছড়িয়ে পড়ছে, তা সেই পুরোনো মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
গণতান্ত্রিক সমাজে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কেউ রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেন, আবার কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু মতের বিরোধিতা করতে গিয়ে একজন নারীকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা, তার মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা কিংবা তাকে অপমান করার চেষ্টা কখনোই সুস্থ রাজনৈতিক বা সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। কারণ এতে প্রকৃত বিতর্ক হারিয়ে যায়, আর জায়গা করে নেয় বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা।
ইতিহাস সাক্ষী, নারীরা যখনই প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামো, ধর্মীয় গোঁড়ামি কিংবা সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, তখনই তাদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য নানা কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। কখনো তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কখনো তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে টেনে আনা হয়েছে, আবার কখনো তাদের যোগ্যতাকেই অস্বীকার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য একটাই—নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং অন্য নারীদের জন্য ভয় ও নীরবতার পরিবেশ তৈরি করা।
একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো নারীর বক্তব্যের জবাব হওয়া উচিত তথ্য, যুক্তি ও পাল্টা বিশ্লেষণের মাধ্যমে। কিন্তু যখন তার পরিচয় বা ব্যক্তিগত জীবনকে আক্রমণের হাতিয়ার বানানো হয়, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যায় নয়; বরং নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সমঅধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার শামিল। এটি সেই পিতৃতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যা এখনো বিশ্বাস করে যে নারীরা কথা বলবে, তবে পুরুষতন্ত্রের নির্ধারিত সীমার ভেতরে থেকে।
আজ প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং নারীর প্রতি সম্মানবোধকে আরও শক্তিশালী করা। আমরা যদি সত্যিই একটি গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে চাই, তাহলে ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনীতি পরিহার করে যুক্তি ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
কারণ কোনো নারীর কণ্ঠস্বরকে অপমানের মাধ্যমে স্তব্ধ করার চেষ্টা শুধু একজন নারীর বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়—এটি সমগ্র নারী সমাজের সমান অধিকার ও মর্যাদার বিরুদ্ধে আঘাত।
লিখেছেন- Sadia Sharmin Ayesha











