পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ম্রাউক-ইউ টাউনশিপের একটি হাসপাতালে সামরিক সরকারের বিমান হামলায় রোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বজনসহ অন্তত ৩৩ জন নিহত এবং প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছেন। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা এ হামলার নিন্দা জানিয়ে সতর্ক করেছেন, এটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
সোমবার গভীর রাতে ম্রাউক-ইউ জেনারেল হাসপাতালে সামরিক বিমানের ফেলা বোমা আঘাত হানে। আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইন থু খা জানান, হামলায় হাসপাতালটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। হাসপাতালে সরাসরি বোমা আঘাত করায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঘটনার তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তুর্কের কার্যালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের। তবে মিয়ানমারে বিদ্যমান ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র কারণে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আদালত বা ‘ইউনিভার্সাল জুরিসডিকশন’-এর মতো ব্যবস্থার সহায়তা নেওয়া হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেডরস আধানম গেব্রেইয়েসুসও হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ওই এলাকায় জরুরি চিকিৎসা, প্রসূতি সেবা ও অস্ত্রোপচারের প্রধান কেন্দ্র ছিল হাসপাতালটি। হামলায় এর অপারেশন থিয়েটার ও রোগীদের প্রধান ওয়ার্ড পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে।
টেডরস জানান, এ বছর মিয়ানমারে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র বা কর্মীদের ওপর এটি ৬৭তম নিশ্চিত হামলা। স্বাস্থ্যসেবার ওপর প্রতিটি হামলা মানেই মানবতার ওপর হামলা।
ত্রাণকর্মী ওয়াই হুন অং জানান, হামলার সময় ৩০০ শয্যার হাসপাতালটি রোগীতে পূর্ণ ছিল। চলমান সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় অধিকাংশ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ ছিল বেশি। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে ৩১ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং ৬৮ জন আহত হয়েছিলেন। পরে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৩৩ জনে দাঁড়ায়।
হামলার পর হাসপাতালটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ছাদ ধসে পড়ে এবং স্তম্ভ ও বিম ভেঙে যায়। ঘটনাস্থলে হতাহতদের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব ছবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ম্রাউক-ইউয়ের ২৩ বছর বয়সী এক বাসিন্দা জানান, সোমবার রাতে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, সেখানে গিয়ে হাসপাতালটিতে আগুন জ্বলতে এবং অনেক মরদেহ ও আহত মানুষ পড়ে থাকতে দেখেছেন।
মিয়ানমারে সামরিক সরকার বিদ্রোহী-নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা বাড়িয়েছে। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত সরকার ২ হাজার ১৬৫টি বিমান হামলা চালিয়েছে। ২০২৪ সালে এ ধরনের হামলার সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭১৬টি।
২০২১ সালে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমারে সংঘাত চলছে। অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো আরাকান আর্মিসহ বড় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে জোট বেঁধে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
সিঙ্গাপুরের আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি থেকে সামরিক বাহিনীকে হটিয়ে দিয়েছে এবং বেলজিয়ামের চেয়েও বড় একটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।
আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইন থু খা জানিয়েছেন, রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের ম্রাউক-ইউ টাউনশিপ গত বছর থেকেই আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ওই এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে কোনো লড়াই হয়নি।











