বিশ্বজুড়ে খবর, এক ক্লিকেই

December 1, 2025 3:34 am
December 1, 2025 3:34 am

ডিজিটাল স্পেসে নারীর নিরাপত্তা: নতুন যুদ্ধক্ষেত্র

Rafia Akther

বাংলাদেশে নারীর সংগ্রাম শুধু রাস্তায়, কর্মক্ষেতে বা ঘরের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই—এখন যুদ্ধক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হয়েছে। নতুন শত্রু একেবারে নীরব, অদৃশ্য, কিন্তু নির্মম। এই শত্রুর নাম—ডিজিটাল সহিংসতা। আমরা যখন প্রযুক্তিকে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে উদযাপন করছি, তখন একই প্রযুক্তি হয়ে উঠছে নারীর বিরুদ্ধে এক নির্মম অস্ত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীর উপস্থিতি বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই উপস্থিতি যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে হুমকি, হয়রানি, অপমান, ব্ল্যাকমেইল, স্টকিং, ডিপফেক, ট্রলিং এবং চরিত্রহননের নতুন নতুন কৌশল।

ডিজিটাল স্পেস এখন আর কেবল তথ্য আদান-প্রদানের জায়গা নয়, এটি এক বিশাল সামাজিক ক্ষেত্র, যেখানে নারীর নিরাপত্তা প্রতিদিন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। আগের যুগে নারীর চলাফেরা রাস্তায় সীমাবদ্ধ ছিল; এখন তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয় ফেসবুক পোস্টে, ইউটিউব কমেন্টে, ইনস্টাগ্রাম ছবিতে কিংবা মেসেঞ্জার ইনবক্সে।

যখন কোনো নারী তার মতামত দেয়, তখন তাকে বলা হয়—“তোকে কে এসব বলার অনুমতি দিয়েছে?” যখন সে নিজের ছবি পোস্ট করে, তখন তাকে বলা হয়—“লাইক চাইছিস?” আর যখন সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন একটি সংগঠিত অনলাইন বাহিনী তার ওপর হামলে পড়ে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই—নারীকে চুপ করিয়ে রাখা।

ডিজিটাল সহিংসতা—অদৃশ্য কিন্তু প্রবল

ডিজিটাল সহিংসতা এমনভাবে কাজ করে, যেটি অনেক সময় চোখে পড়ে না, কিন্তু ধীরে ধীরে ভেতরটা ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। একজন নারী যখন প্রতিদিন অশ্লীল বার্তা, হুমকি কিংবা ট্রলের মুখোমুখি হয়, তখন সে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। এর মানসিক চাপ বোঝা যায় না তাদের, যারা কখনো এসব সহিংসতার শিকার হয়নি।

অনেক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছেড়ে দেয়, নিজের মত প্রকাশ বন্ধ করে দেয়, এমনকি অনেকে মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হয়। অথচ সমাজ বলে—“ব্লক দাও, হয়ে গেল।” কিন্তু ব্লক দেওয়াই কি সমাধান? যদি কেউ বারবার নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে একই হয়রানি চালায়, তাহলে কী? যদি একজন নারীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে অপমান করে লাইভে বসে একদল মানুষ?

ডিজিটাল স্পেসে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো ডিপফেক পর্ন। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীর মুখ অন্য কোনো ভিডিওতে বসিয়ে তাকে হেয় করা—এটি এখন অপরাধীদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। কারণ এতে পুলিশে গেলে সন্দেহ থাকে, সমাজে আলোচনা হয়, ভুক্তভোগীর পরিবার লজ্জা পায়, আর অপরাধী হাসতে থাকে।

অনলাইন ধর্মীয় উগ্রবাদ—নারীবিদ্বেষের নতুন কারখানা

সোশ্যাল মিডিয়ায় যেসব ধর্মীয় বক্তা লাইভে এসে নারীদের পোশাক, আচরণ, জীবনযাপন নিয়ে ভাষণ দেন—তাদের কথায় অনেক পুরুষ বৈধতা পায় নারীদের ট্রল করতে। একজন হুজুর যখন বলেন, “নারীরা নিজেরাই ফিতনা,” তখন সেই বাক্য হয়ে ওঠে হাজারো অনলাইন হামলার নীরব অনুমতি।

এরা শুধু ধর্ম শেখায় না—নারীকে দোষারোপ করাকে ধর্মের অংশ বানিয়ে ফেলে। ফলে যখন কোনো নারী যৌন হয়রানির অভিযোগ করে, তখন অনলাইনে একটি দল তাকে আক্রমণ করে—
“এটা নাটক।”
“ধর্ম না মানলে এমনই হয়।”
“ওই মেয়েই ভুল করেছে।”

এই মনোভাব ধর্ষণের ক্ষেত্রেও কার্যকর হয়। এবং এই মানসিকতা ডিজিটালে সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। উগ্রবাদীরা বোঝে—নারীকে ভয় দেখানো হলে সে চুপ হয়ে যাবে।

পরিবার ও সমাজ এখনও ডিজিটাল বাস্তবতা বোঝে না

নারী যখন ডিপফেক, হুমকি বা সাইবার স্টকিংয়ের শিকার হয়, তখন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয় নিজের পরিবার।
বলা হয়—
“এইসব অনলাইনে থাকতে হয় কেন?”
“ছবি পোস্ট করছো কেন?”
“ফেসবুক থাকলে তো এসব হবেই।”

অপরাধী নয়—ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার এই সংস্কৃতি ডিজিটাল স্পেসকে আরও বিষাক্ত করে তোলে।

তরুণীরা তাই অনেক অপরাধ পুলিশের কাছেও জানায় না। কারণ তারা ভয় পায়—
• অভিযোগ করলে পরিবার লজ্জা পাবে
• সমাজ কথা বলবে
• পুলিশ সাহায্য করার বদলে ‘উপদেশ’ দেবে
• অপরাধী আরও ক্ষতি করবে

এই ভয় ডিজিটাল সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঢাল। অপরাধী জানে—নারীদের ভয় আছে, নীরবতা আছে, সমাজের তিরস্কার আছে। তাই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আছে, সাইবার ট্রাইবুনাল আছে। কিন্তু বাস্তবে বিচার পাওয়া কতটা সহজ?
অনেক নারী অভিযোগ করতে গেলেই শোনে—
“এটা বড় কিছু নয়।”
“ব্লক করে দেন।”
“স্ক্রিনশট আছে?”
“প্রমাণ দেন।”

যেন একজন নারীকে অপমান করা প্রমাণ ছাড়া অপরাধই নয়।
অপরদিকে অপরাধীরা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে, VPN ব্যবহার করে, অন্যের ছবি ব্যবহার করে—সব মিলিয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অনেক সময় অপরাধীকে ধরতে পারে না অথবা চেষ্টাই করে না।

ডিজিটাল স্পেস কেন নতুন যুদ্ধক্ষেত্র?

কারণ এখানে—
• আক্রমণ অদৃশ্য
• অপমানের গতি দ্রুত
• জনসম্মুখে হেয় করা বেশি ক্ষতিকর
• ভয় দেখানো সহজ
• প্রতিটি নারী সম্ভাব্য লক্ষ্য

ডিজিটাল স্পেসে নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতা সমাজকে বদলে দিচ্ছে। আজ একজন নারী অনলাইনে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে না। নিজের ছবি পোস্ট করতে পারে না। নিজের কণ্ঠ প্রকাশ করতে পারে না—কারণ সাইবার হামলা তাকে থামিয়ে দেবে।

এভাবে পুরো সমাজের নারীদের চুপ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক অদৃশ্য যুদ্ধে।

সমাধান কী?

১. ডিপফেক অপরাধের বিরুদ্ধে আলাদা আইন থাকা জরুরি।
২. সাইবার হুমকির জন্য দ্রুত প্রতিকার ও বিশেষায়িত ইউনিট দরকার।
৩. নারীর ডিজিটাল অধিকার সম্পর্কে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে শিক্ষা দরকার।
৪. ধর্মীয় বক্তাদের অনলাইন নারীবিদ্বেষী বক্তব্য মনিটরিং প্রয়োজন।
৫. পরিবারকে বোঝাতে হবে—অপরাধী নয়, ভুক্তভোগী কখনো দোষী নয়।
৬. সাইবার নিরাপত্তায় নারীদের টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

শেষ কথা

ডিজিটাল স্পেস নারীর জন্য মুক্তির জায়গা হওয়ার কথা ছিল—চিন্তা, মত প্রকাশ, শেখা, কাজ, যোগাযোগ—সবকিছুই এখানে সহজতর হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে এই জায়গাটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এখানে শত্রু অদৃশ্য, কিন্তু আঘাত বাস্তব।

এখন সময় হয়েছে সমাজ, আইন, পরিবার এবং রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে—
নারীর নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় নয়, অনলাইনেও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ নারীর কণ্ঠ যদি অনলাইন থেকে মুছে যায়—তাহলে ভবিষ্যতও অন্ধকার হবে।

লিখেছেন- Rafia Akhter

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *